শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ভোটের আগে বাড়ছে উদ্বেগ

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

lead
ছিবি- ঢাকা মেইল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে রোষানলে পড়ে পুলিশ বাহিনী। ব্যাপক হামলার শিকার হয় দেশের থানা ও পুলিশ ফাঁড়িগুলো। সে সময় থানা থেকে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়। যা চলে যায় সাধারণ মানুষের হাতে। তবে অন্তর্র্বতী সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অনেকে স্বেচ্ছায় লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ থানায় ফেরত দেয়। এরপরও পুলিশের অনেক অস্ত্র খোয়া যায়।  

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিলেই মোটা অংকের পুরস্কার মিলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এজন্য মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ঘোষণা ও বিজ্ঞাপন তেমন কোনো কাজে আসেনি। এখনো প্রায় দেড় হাজারের মতো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। যদিও পুলিশ বলছে, তারা বাকি অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে। কবে নাগাদ সেই অস্ত্র উদ্ধার শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 


বিজ্ঞাপন


গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা, মিরপুরে দোকানে ঢুকে বিএনপি নেতাকে হত্যা এবং সর্বশেষ কারওয়ানাজারের বসুন্ধরা মার্কেটের পেছনে প্রকাশে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তারা মনে করছে, সারাদেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। অপরাধমূলক কাজে সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে। 

ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনার পর আতঙ্ক ছড়ায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হ‌ওয়া পর্যন্ত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করাও হয়েছিল। যদিও সেই রিট টেকেনি। তবে রিটের পরপরই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, কোনো প্রার্থী চাইলে তার নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের আবেদন করে অস্ত্র বা গানম্যান নিতে পারবেন।  

সেই রিটের আবেদনে বলা হয়, এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থীদের জীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফ উসমান হাদি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে এই নির্বাচন রক্তক্ষয়ী হবে। 


বিজ্ঞাপন


গত বছরের ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, একটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধার করতে পারলে সন্ধানদাতা পাবেন ৫ লাখ টাকা। এছাড়া সাব মেশিনগানের (এসএমজি) জন্য দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের জন্য এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। আর প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য মিলবে ৫০০ টাকা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১,৩৭৫টি এবং গোলাবারুদ ছিল ২,৫৭,৮৪৯টি।

এদিকে পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৭৬৩টি লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪৩১টি। এখনো ১ হাজার ৩৩২টি অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি। পাশাপাশি ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি লুণ্ঠিত গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪। এখনো আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদের হদিস নেই। পাশাপাশি চলতি মাসের অর্থাৎ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরও কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের কোনোটিই সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়নি জানা গেছে। 

দেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সহিংসতাকে কেন্দ্র করে, কোথাও পূর্ব শত্রুতার জেরে গুলির ঘটনা ঘটছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারও তেমন হচ্ছে না। অস্ত্রের উৎসও তেমন বের হচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের আগে ও পরে লুট হওয়া অস্ত্রে হত্যাকাণ্ড বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। 

আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন।

পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি সাহাদাত হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে বাংলাদেশ পুলিশ সারাদেশে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছে। থানা ও ফাঁড়ি পর্যায়ের তথ্যের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম চলমান। এ লক্ষ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনসহ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একটি কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। যেগুলো টার্গেট কিলিং হয়েছে, সেগুলোতে এই ধরনের লুট অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা। পাশাপাশি সে গোলাবারুদ কী পরিমাণে উদ্ধার হয়েছে সেই তথ্য কিন্তু নির্দিষ্ট করে জানা নেই। এটা খুবই ভয়াবহ যে, ৩০ শতাংশের বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধারের বাইরে আছে।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা আছে, তারা অভিযানসহ বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। যারা অপরাধ বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে পারে বলে গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের বড়সংখ্যক গ্রেফতার হলে অপরাধ পরিস্থিতি এরকম থাকার কথা না। এর মধ্য দিয়ে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো প্রায় পরিপূর্ণ না হলেও বড়সংখ্যক উদ্ধার করার কথা। কিন্তু এই জায়গাতে আমরা চাই যে, অভিযানের মাধ্যমে এটাই উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু যেভাবে উদ্ধার করার জন্য ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা দরকার সেই ব্যবস্থায় একটা ঘাটতি আমরা লক্ষ্য করি। বিশেষ করে খুব জোরালোভাবে, কার্যকরভাবে এই অভিযানগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে।’ 

সরকারের পক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা তেমন কাজ দিচ্ছে না। বিষয়টির সমাধান তাহলে কী-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পুরস্কারের ঘোষণায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশে খুব একটা বেশি অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে কাজে আসবে, সেই বাস্তবতা আমরা দেখছি না। কারণ সে অস্ত্রগুলো তো সাধারণ মানুষের কাছে নেই। এটি আছে অপরাধীদের কাছে। এমন সব ব্যক্তির কাছে যারা তার প্রয়োজনে, ব্যক্তি প্রয়োজন অথবা রাজনৈতিক প্রয়োজন কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রয়োজনে এ অস্ত্রগুলো ব্যবহার করবেন। এজন্য অভিযানের মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে, কঠোরতা অবলম্বন করেই অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি মনে করেন, ‘তাদেরকে পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে এই অস্ত্র উদ্ধার করাটা খুব কঠিন। সেক্ষেত্রে অভিযান অত্যন্ত কার্যকরীভাবে পূর্ব ম্যাপিং নির্ধারণ করা। এছাড়াও সেই এলাকার যে অপরাধ পরিস্থিতি কিংবা সেখানে কারা যাদের ক্রিমিনাল রেকর্ডগুলো আছে, তা খুঁজে বের করা, সেগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করা। এরপর এক ধরনের অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা নির্ধারণ করা। সেটা করার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে তথ্য দরকার পাশাপাশি আমাদের পুলিশের যে সোর্সগুলো আছে তাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দরকার।’

এমআইকে/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর