বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

লিজের নামে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব ভেঙে চলছে মার্কেট নির্মাণ!

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

CLUB
ক্লাব ভেঙে তৈরি হচ্ছে মার্কেট। ছবি: ঢাকা মেইল
  • হাসেম, সাইফুল ও মোরশেদের নামে লিজ
  • লিজ বাতিল হলেও থেমে নেই নির্মাণকাজ
  • সংশ্লিষ্টরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত
  • অকাঠামো ভেঙে বদলে ফেলা হয়েছে পুরো চেহারা
  • তড়িঘড়ি করে চলছে মার্কেটের নির্মাণকাজ

২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় গুলিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল নামের ক্লাবটিও সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে সেটি বন্ধই ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ক্লাবটি দখল করে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। হাসেম ওরফে হাসমত, সাইফুল ও মোরশেদ নামে তিন ব্যক্তি এই মার্কেট নির্মাণ করছেন বলে জানা গেছে। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।


বিজ্ঞাপন


তবে তাদের দাবি, তারা আগামী দুই বছরের জন্য জায়গাটি লিজ নিয়েছেন। এজন্য তারা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়কে লিজের শর্ত অনুযায়ী প্রতি মাসে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা ভাড়াও দিচ্ছেন। যা গত নভেম্বর থেকে শুরুও হয়েছে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুলিস্তানে গিয়ে সরেজমিনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

ক্লাবটির গেট ও সামনের ওয়ালের ওপরে সাঁটানো হয়েছে বড় বড় ব্যানার। তিনটি ব্যানারে বড় করে লেখা হয়েছে ‘শীগ্রই শুভ উদ্বোধন-১ লা ফেব্রুয়ারী ২০২৬’। বড় করে লেখা হয়েছে- ‘বাংলাদেশ এর বৃহত্তম স্পোর্টস মার্কেট’। ক্লাবের প্রধান গেট বন্ধ। তবে দক্ষিণ পাশের ওয়াল ভেঙে একটি প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। সেটার সামনে যেতেই চোখে পড়ল ভেতরে নির্মাণকাজ চলছে।

মার্কেটটি লিজ নেওয়া তিন ব্যক্তির একজন হাসেম। তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা বলে পরিচয় দেন। তিনি মূলত এই মার্কেট নির্মাণের যাবতীয় কাজ দেখভাল করছেন।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

বৃক্ষসেবার নামে ‘পার্ক দখল’

সোমবার দুপুরে সেখানে দাঁড়িয়ে হাসেম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা আগামী দুই বছরে জন্য জায়গাটি লিজ নিয়েছি। যেহেতু এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল, ভেতর মাদক সেবন ও জুয়া খেলা চলত, এতে ক্লাবটির কোনো লাভ হতো না। ফলে মার্কেট করলে তো প্রতি মাসে অন্তত ভাড়া পাবে। এই কথা ভেবে আমরা লিজ নিয়েছি।’

তিনি দাবি করেন, তারা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে আবেদনের দুই বছরের জন্য লিজ পেয়েছেন। নভেম্বর মাস থেকে মাসে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা করে ভাড়াও দিচ্ছেন। যদিও ইতোমধ্যে এই লিজ বাতিল করা হয়েছে, সেই বিষয়টি তিনি গোপন করেন এই প্রতিবেদকের কাছে।

Club3
জড়িতদের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছবি: সংগৃহীত

জানা গেছে, মার্কেট নির্মাণের এই কাজ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। এখনো চলছে সেই নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে সেখানে অর্ধশতাধিক ইটের তৈরি খুপড়ি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাতে ছাদ ঢালাইয়ের কাজও হয়েছে। যা সবটাই লিজের শর্তের বিপরীত। সপ্তাহখানেক পর সেই দোকানগুলো ভাড়া দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। 

সূত্রে জানা গেছে, গুলিস্তানের বিএনপি নেতা মোরশেদ এই ক্লাবটি লিজ নেওয়ার জন্য বাকি দুজনকে নিয়ে আবেদন করেন। এজন্য তারা মন্ত্রণালয়কে জামানত হিসেবে পাঁচ লাখ টাকাও দেন। কিন্তু লিজের আবেদন করার পরপরই তারা সেখানে স্থাপনা তৈরি করতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে লিজ পাওয়ার পাঁচ মাস চলে গেছে।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় ক্লাবটিতে জুয়ার আসর চলায় সিলগালা করে দেওয়া হয়। তখন থেকে এটি বন্ধই ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেটির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন হাসেম, মোরশেদ ও সাইফুল। এরপর তারা নিজেই ইট, সুরকি, সিমেন্ট, বাঁশ, কাঠ এনে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

অভিযোগ উঠেছে, এই মার্কেট নির্মাণের নেপথ্যে বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতা ছাড়াও শাহবাগ থানা বিএনপির কয়েকজন নেতা জড়িত। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই কাজের নেপথ্যে শাহবাগ থানার বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন মিন্টু, ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম স্বপন, ২নং যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম বাবু, ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক টিটু, ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সুফিয়ান, ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হাদি হক, ২০নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমজাদ হোসেন, বঙ্গবাজার ইউনিট বিএনপির সহ-সভাপতি হাজী জাহাঙ্গীর জড়িত।  

আরও পড়ুন

আয়ের সিংহভাগ ‘গিলে নিচ্ছে’ বাড়িভাড়া

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ক্লাবটি দখল ও আবেদন করে মার্কেট তৈরির নেপথ্যের আরও একজন কারিগর হলেন শাহবাগের বিএনপি নেতা আমজাদ হোসেন।

Club2
তৈরি হচ্ছে ৫০টি দোকান। ছবি: ঢাকা মেইল

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সেক্রেটারি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তারা প্রথম অস্থায়ী ভিত্তিতে আবেদন করেছিল। কিন্তু লিজ পাওয়ার পর তারা স্থায়ী ও ভারী স্থাপনা নির্মাণ করেছে। ফলে তাদের লিজ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’

আরও পড়ুন

‘রিকশা ট্র্যাপার’ এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা!

জানা গেছে, ২০১৯ সালে ক্লাবটিতে অভিযান চালানোর বেরিয়ে আসে ভয়ানক তথ্য। ক্লাবটিতে জুয়া চালাতেন যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তার লোকজন সারাক্ষণ মনিটরিংও করতো। ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, নড়াইলসহ ঢাকার অদূরবর্তী লোকজন বাস ভরে জুয়া খেলতে আসতো। প্রতিদিন সেই জুয়ার আসর থেকে কোটি টাকা তোলা হতো। গভীর রাতে সেই টাকার হিসাব হতো। এরপর তার পুরোটাই চলে যেত যুবলীগ নেতা সম্রাটের হাতে। পরে সম্রাট সেই টাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানাসহ কথিত গণমাধ্যম কর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ প্রশাসনের লোকজনকে ভাগ করে দিতেন।

তবে আলোচিত ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় ক্লাবটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। তখন থেকে বন্ধই ছিল ক্লাবের সব কার্যক্রম।

এমআইকে/জেবি 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর