Dhaka Mail Logo

লাইফস্টাইল

বিড়াল কেন কিবোর্ড ভালোবাসে, কুকুর কেন পত্রিকা চুরি করে? জানুন রহস্য

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক

০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:২৭ এএম

জরুরি কোনো কাজের জন্য মাত্র ল্যাপটপ নিয়ে বসেছেন, হয়তো অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ই-মেইল লিখবেন। ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন হাজির আপনার আদরের বিড়ালটি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিবোর্ডটাকে নিজের সিংহাসন বানিয়ে বসে পড়ল সে। কিংবা হয়তো সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজটা সবে পড়তে বসেছেন, অমনি আপনার পোষা কুকুরটি কাগজটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বা সেটা মুখে নিয়ে ছুট লাগাল। পোষা প্রাণী আছে এমন প্রায় প্রতিটি পরিবারের জন্যই এই দৃশ্য বেশ পরিচিত। 

আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে নিছক দুষ্টুমি বা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা মনে হলেও, প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভিন্ন গল্প। হাজার বছর ধরে টিকে থাকা আদিম সহজাত প্রবৃত্তি, ভালোবাসা এবং নিজের এলাকা দখলের এক অদ্ভুত রসায়ন কাজ করে তাদের এই আচরণের পেছনে।

প্রাণী মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণায় এই মজার আচরণের বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাপটপের প্রতি বিড়ালের এই তীব্র আকর্ষণের প্রধান কারণ হলো ঘ্রাণ। আমরা হয়তো বুঝতে পারি না, কিন্তু প্রতিদিন ব্যবহারের ফলে ল্যাপটপের কিবোর্ডে আমাদের শরীরের নিজস্ব একটি গন্ধ লেগে থাকে। 

cat

প্রাণী মনস্তত্ত্ববিদের মতে, বিড়াল তার মালিকের সেই পরিচিত গন্ধ খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হলো, তারা শুধু মালিকের গন্ধ পেয়েই শান্ত থাকে না, বরং সেখানে নিজের গন্ধ রেখে মালিকের গন্ধকে ঢেকে দেওয়ার এক কৌশলগত পরিকল্পনা করে। সহজ কথায়, কিবোর্ডে গা ঘষে বা বসে বিড়াল মূলত নিজের গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দিতে চায় যে, এই ডিভাইসটি এবং এর মালিক উভয়ের ওপরই তার একচেটিয়া অধিকার রয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে গন্ধ ছড়িয়ে নিজের সীমানা বা এলাকা নির্ধারণ করার এই আদিম প্রবৃত্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও পরিচিত একটি বিষয়।

আরও পড়ুন: বিড়াল অতিরিক্ত ‘মিঁয়াও’ করে কেন? 

সীমানা দখলের পাশাপাশি এখানে তীব্র ভালোবাসার আবদার এবং ঈর্ষার বিষয়টিও জড়িত। রিডার্স ডাইজেস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিড়াল আচরণবিদ মেরিলিন ক্রিগার জানান, পোষা বিড়ালের কাছে তার মালিকই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যখন মালিক ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকেন, তখন বিড়াল মনে করে যন্ত্রটি তার মনোযোগের ভাগ বসিয়ে দিচ্ছে। তাই নিজের পছন্দের মানুষের একদম কাছে থাকতে এবং তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতেই তারা কিবোর্ডের ওপর এসে বসে পড়ে। 

আমরাও অনেক সময় অজান্তেই তাদের এই আচরণকে উসকে দিই। কিবোর্ডে বসামাত্রই যখন আমরা তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিই বা আদর করে কথা বলি, তখন তারা খুব দ্রুত শিখে নেয় যে এই কাজটি করলেই মালিকের মনোযোগ পাওয়া সম্ভব। এছাড়া বিড়াল খুব ভালোভাবেই মানুষের শরীরের শক্তি বা মনোযোগের গভীরতা বুঝতে পারে। 

cat_1

পেটএমডি-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে একজন পশুচিকিৎসক উল্লেখ করেছেন, মানুষ যখন একমনে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন তার চোখ-মুখ স্থির ও শান্ত হয়ে যায়, যা দেখতে অনেকটা শিকারির মনোযোগের মতো লাগে। বিড়ালের চোখে এই ভঙ্গিটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মালিক কোন বস্তুটির দিকে এতটা মনোযোগ দিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখতেই তারা ডিভাইসটির কাছে ছুটে আসে।

মনস্তাত্ত্বিক কারণের পাশাপাশি ল্যাপটপ দখলের পেছনে একটি অতি বাস্তবসম্মত শারীরিক আরামের বিষয়ও রয়েছে। বিড়ালের শরীরের জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা সাধারণত ৮৫ থেকে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, যা মানুষের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। এ কারণেই তাদের প্রায়ই রোদের আলোয় বা গরম কোনো স্থানে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।

আরও পড়ুন: বিলুপ্তির পথে সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর

কম্পিউটার বা ল্যাপটপ কিছুক্ষণ চলার পর এর প্রসেসর গরম হয়ে ওঠে এবং ডিভাইসটি থেকে মৃদু তাপ বের হতে থাকে। বিড়ালের কাছে এই হালকা গরম কিবোর্ড যেন এক আরামদায়ক উষ্ণ বিছানা। ক্যাটস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাপটপের এই আরামদায়ক উষ্ণতার সঙ্গে স্ক্রিনের চলমান দৃশ্য এবং মাউসের নড়াচড়া বিড়ালের কাছে এক ভীষণ আকর্ষণে পরিণত হয়।

dog_1

অন্যদিকে কুকুরের খবরের কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি বা ছিঁড়ে ফেলার আচরণটিও সমান কৌতূহলোদ্দীপক। কুকুর বা কুকুরছানা স্বভাবতই মুখ দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তু পরখ করে দেখতে পছন্দ করে। কিনশিপ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রাণী আচরণবিদ এবং প্রশিক্ষক সিয়ান ললি-রাড জানান, কোনো কিছু ছিঁড়ে ফেলা বা তার ওপর বসে পড়া কুকুরের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক সহজাত প্রবৃত্তি। 

বন্য জীবনে খাবার খোঁজা, শিকার করা এবং বিভিন্ন বস্তুর গঠন বোঝার যে আদিম প্রবৃত্তি তাদের মধ্যে থাকে, খবরের কাগজ যেন সেই চাহিদাই পূরণ করে। কাগজের মচমচে শব্দ এবং খুব সহজেই সেটি ছিঁড়ে ফেলার অনুভূতি কুকুরকে এক ধরনের তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। কাগজটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করার পর তাদের মনে হয়, তারা বুঝি অনেক বড় কোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

আরও পড়ুন: কালো বিড়াল কি সত্যিই অশুভ?

তাছাড়া মেঝেতে বা টেবিলে রাখা নতুন একটি খবরের কাগজ কুকুরের কাছে ত্রিমুখী আকর্ষণ তৈরি করে। প্রথমত, মালিকের হাতের স্পর্শ থাকায় এতে পরিচিত গন্ধ থাকে। দ্বিতীয়ত, এটি তাদের পরিচিত পরিবেশে একটি নতুন ও চমৎকার আওয়াজ তোলা বস্তু হিসেবে হাজির হয়। এবং তৃতীয়ত, এটি তাদের চলাফেরার জায়গায় কিছুটা জায়গা দখল করে রাখে। 

dog_2

ক্যানাইন কাউন্সেলিংয়ের বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্কি জ্যাকসনের মতে, কুকুরছানাদের এই কৌতূহল একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়, বিশেষ করে যখন তারা এর মাধ্যমে মালিকের সাড়া পায়। কাগজ মুখে নেওয়ার পর মালিক যখন পিছু নেয়, চিৎকার করে কিংবা আদর করে কোলে তুলে নেয়, তখন কুকুর সেটিকে পুরস্কার হিসেবে ধরে নেয়। আমরা হয়তো তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু কুকুরের কাছে সেই চিৎকার বা পিছু নেওয়াটাও এক ধরনের মনোযোগ, যা তাকে পরবর্তীতে একই কাজ করতে আরও উৎসাহিত করে।

আরও পড়ুন: কুকুর কোন দেশের জাতীয় পশু?

পোষা প্রাণীদের এই আপাত অদ্ভুত আচরণগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রতিটি প্রাণীপ্রেমীর জন্যই অত্যন্ত জরুরি। তাদের এই কাজগুলোকে নিছক উপদ্রব বা অবাধ্যতা মনে না করে, এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারলে তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর ও সুন্দর হয়ে ওঠে।

যখন আমরা বুঝতে পারি যে ল্যাপটপে বসে পড়া বা কাগজ নিয়ে খেলার পেছনে রয়েছে ভালোবাসার আবদার, উষ্ণতার খোঁজ কিংবা আদিম সহজাত প্রবৃত্তি, তখন তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। বকাঝকা বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বিকল্প খেলনা দিয়ে কিংবা কাজের ফাঁকে তাদের কিছুটা সময় ও মনোযোগ দিয়ে খুব সহজেই এই আচরণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ দিনশেষে, অবলা এই প্রাণীগুলোর পৃথিবীতে আমরাই তো তাদের সবকিছু।

এনএম