নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুন ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হবে বিকেলে। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এবারের বাজেটকে দেখা হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে। সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, কর সংস্কার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
ঢাকা মেইল: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ‘আমরা শুরু থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছি, সেটি হলো কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই কৃষক, মৎস্যজীবী ও খামারিদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এর মধ্যেই আমাদের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি প্রতিফলন রয়েছে। আমরা মনে করি, যে অর্থনীতি আমরা পেয়েছি সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা, অস্বীকার করার সংস্কৃতি ছিল, লুটপাটনির্ভর একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এবং জনগণের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
‘আমাদের লক্ষ্য একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, তিনি এমন একটি রাষ্ট্র চান যেখানে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। এবারের বাজেট সেই দর্শনের ধারাবাহিকতা বহন করবে। আমরা পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে চাই, যাতে একজন নাগরিক জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রের সহায়তা পেতে পারেন।’
ঢাকা মেইল: সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি আপনি বারবার বলছেন। বাজেটে এর প্রতিফলন কীভাবে থাকবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের ধারণা, কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে রক্ষা করবে। সেখানে প্রসূতি মা আছেন, শিশু আছে, কিশোর আছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, প্রবীণ নাগরিক আছেন, বিধবা নারী আছেন। যে কোনো অর্থনৈতিক বা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় এই সুরক্ষা বলয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আমরা এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা কমে আসে এবং তারা নিরাপত্তাবোধ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। নতুন বাজেটে সেই পথরেখা স্পষ্টভাবে থাকবে।
ঢাকা মেইল: প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটের আলোচনা চলছে। এত বড় বাজেটের অর্থসংস্থান কীভাবে হবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। অর্থসংস্থানের প্রধান দুটি উৎস রয়েছে। প্রথমত, অর্থনীতির আকার বড় করতে হবে। উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে, তখন স্বাভাবিকভাবেই কর আহরণও বাড়বে। দ্বিতীয়ত, কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতির সংস্কৃতি কমাতে হবে।
আমরা অর্থনীতিকে তিনটি ধাপে এগিয়ে নিতে চাই। প্রথম ধাপ পুনরুদ্ধার, দ্বিতীয় ধাপ স্থিতিশীলতা এবং তৃতীয় ধাপ দ্রুত অগ্রগতি। ২০৩৪ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এই ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
ঢাকা মেইল: বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান কৌশল কী?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীকে জানতে হবে আগামী কয়েক বছরে নীতিগত পরিবেশ কেমন থাকবে। দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা কমাতে হবে। তৃতীয়ত, সহজলভ্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ থাকতে হবে।
আমরা ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি অর্থায়ন প্যাকেজ নিয়েছি। তবে এটি আগের মতো নির্বিচারে বিতরণ করা হবে না। প্রকৃত উদ্যোক্তা, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প, নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ঢাকা মেইল: রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কী ধরনের পরিবর্তন আসবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমাদের বিশ্বাস, রাজস্ব নীতি এবং রাজস্ব প্রশাসনকে আলাদা করতে হবে। নীতি নির্ধারণ করবেন পেশাদাররা, আর বাস্তবায়ন হবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে। আমরা দেখেছি, অতীতে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের কারণে হয়রানি বেড়েছে। যত বেশি ডিসক্রিশন বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকবে, তত বেশি দুর্নীতি ও হয়রানির ঝুঁকি থাকবে। তাই আমরা ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দিচ্ছি। ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।
ঢাকা মেইল: করদাতাদের মধ্যে একটি অভিযোগ রয়েছে, তারা জানেন না তাদের করের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা চাই এই সংস্কৃতি বদলাতে। একজন করদাতা জানতে পারবেন তার দেওয়া অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা বা নাগরিক সেবায় তার করের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সে সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকবে। মানুষ তখনই কর দিতে আগ্রহী হবে, যখন তারা দেখবে তাদের অর্থ অপচয় বা লুটপাট হচ্ছে না এবং তা জনকল্যাণে ব্যয় হচ্ছে।
ঢাকা মেইল: কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করা সম্ভব?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, করজাল সম্প্রসারণ করতে হবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক খাতে আনতে হবে। আমরা ধীরে ধীরে ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে যাচ্ছি। ডিজিটাল পেমেন্ট, ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড এবং সবার জন্য ব্যাংক হিসাবের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বিপুল অর্থ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এই অর্থকে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ঢাকা মেইল: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক করতে চাই। প্রাথমিক শিক্ষা আরও আনন্দময় করা, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগ থাকবে।
স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সেবার মান উন্নত করা হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডায়ালাইসিস সেন্টার, ট্রমা সেন্টার এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা একটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করতে চাই।
ঢাকা মেইল: জ্বালানি ও পরিবেশ খাতে কী ধরনের সংস্কার আসবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রয়োজন। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে চাই। একই সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুদ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিবেশের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা মোকাবিলা এবং বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
ঢাকা মেইল: সাধারণ মানুষের জন্য এবারের বাজেট কতটা স্বস্তির হবে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমাদের মূল দর্শন হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’। অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণই আমাদের লক্ষ্য। বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, কুটির, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বয়ে আমরা এমন একটি বাজেট দিতে চাই, যা শুধু একটি অর্থবছরের হিসাব নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে। নতুন বাজেটে সেই পথরেখা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।
এএইচ/এমআর