আগামী জুন মাসের শুরুতে পেশ করা হবে পরবর্তী অর্থবছরের বাজেট। তবে এই বাজেট ঘিরে দেশের ব্যবসা ও শিল্পখাতে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের উদ্বেগ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পে করের চাপ, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা, ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে উদ্যোক্তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, বর্তমান সময়ে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ নয়, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন।
ঢাকা মেইলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, বর্তমান করনীতি ব্যবসাবান্ধব নয়; বরং এটি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। অগ্রিম আয়কর (AIT) সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় ব্যবসায়ীরা কাগজে-কলমে কৃত্রিম মুনাফা দেখাতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে ব্যবসার প্রকৃত চিত্র বিকৃত হচ্ছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মতো প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে। বাজেট, করনীতি, এলডিসি উত্তরণ, জ্বালানি সংকট ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিকেএমইএ সভাপতি নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। করনীতি থেকে শুরু করে এলডিসি উত্তরণ, নারী শ্রমিক, শ্রমিকদের মজুরি, সোলার বিদ্যুৎ, শিল্পের ভবিষ্যৎ ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি। সঙ্গে ছিলেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মো. শামীম।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: আসন্ন বাজেটকে আপনি ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখছেন নাকি রাজস্বকেন্দ্রিক বাজেট হওয়ার আশঙ্কা আছে?
মোহাম্মদ হাতেম: আমরা অবশ্যই চাই ব্যবসা, শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, এখন ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের কথা চিন্তা করছেন না। সবাই টিকে থাকার সংগ্রামে নেমেছেন। বর্তমানে করনীতি ব্যবসা পরিপন্থী, বিনিয়োগ পরিপন্থী।
আমাদের প্রধান উদ্বেগ হচ্ছে, বর্তমান ট্যাক্সেশন পলিসি। আমি স্পষ্ট করে বলব, এই নীতিগুলো বিনিয়োগবিরোধী এবং ব্যবসাবিরোধী। আমি একটা উদাহরণ দিই। আমার একটি প্রতিষ্ঠানের গত বছর প্রায় ১৫০ কোটি টাকার রফতানি হয়েছে। সেখানে বিক্রির ওপর ১ শতাংশ হারে প্রায় দেড় কোটি টাকা কর কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ সাধারণভাবে কর হওয়ার কথা মুনাফার ওপর, বিক্রির ওপর নয়। এটাকে বলা হচ্ছে অগ্রিম আয়কর বা AIT। কিন্তু বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নিয়ম হলো, বছর শেষে প্রকৃত আয় হিসাব করে কর সমন্বয় করা হবে। বেশি কাটা হলে ফেরত দেওয়া হবে; কম হলে অতিরিক্ত কর নেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশে আইন করে সেই সমন্বয় বা ফেরতের সুযোগই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ী লাভ করুক বা লোকসান করুক, টাকা কেটে নেওয়া হবেই।
এখানেই শেষ নয়। রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় বিভিন্ন খরচ ডিসঅ্যালাও করে আবার সেই টাকার ওপর কর বসানো হচ্ছে। ব্যাংকের এফডিআরের ওপর ১০ শতাংশ সোর্স ট্যাক্স কাটা হলেও পরে আবার সেটাকে ‘অন্য আয়’ দেখিয়ে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, ব্যবসায়ীদের কাগজে-কলমে কৃত্রিম মুনাফা দেখাতে হচ্ছে। কারণ তারা ভাবছেন, যেহেতু AIT ফেরত পাওয়া যাবে না, তাই সেই টাকার সমপরিমাণ মুনাফা দেখিয়ে ফাইল তৈরি করি। কিন্তু পরে আবার প্রশ্ন উঠছে, আপনার এত মুনাফার টাকা কোথায়? তখন ব্যবসায়ীই অর্থ পাচারের অভিযোগের মুখে পড়ছে। আমি এনবিআর চেয়ারম্যানকেও বলেছি, এভাবে চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। ব্যবসায়ীরা ভয় পাবেন। সত্যি বলতে, এখন মনে হচ্ছে এনবিআর নীতির অস্ত্র ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে।
ঢাকা মেইল: বাজেটে নতুন কর আরোপ হলে শিল্পখাত কী ধরনের চাপে পড়বে?
মোহাম্মদ হাতেম: নতুন করে কর আরোপ করার আর জায়গা কোথায়? যারা কর দিচ্ছে, চাপটা বারবার তাদের ওপরই পড়ছে। বাংলাদেশে এক কোটির বেশি টিআইএনধারী থাকলেও রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৩২ লাখ মানুষ। অর্থাৎ বিশাল একটি জনগোষ্ঠী কর নেটের বাইরে। এনবিআরের উচিত করের আওতা বাড়ানো। কিন্তু সেটা না করে একই ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। এতে শিল্পখাত আরও দুর্বল হবে। সরকার সত্যিই রাজস্ব বাড়াতে চাইলে করের হার বাড়ানোর বদলে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: সরকার কি ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা করছে?
মোহাম্মদ হাতেম: প্রাক-বাজেট আলোচনায় আমাদের সঙ্গে ভালো আলোচনা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সমস্যার কথা লিখিতভাবে জানিয়েছি।
বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেছি। এখন অনেক শিল্পকারখানা সোলার বিদ্যুতের দিকে যাচ্ছে। আগে আমরা নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতাম। এখন আমরা বিদ্যুৎ স্টোরেজের কথাও ভাবছি। কারণ লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে তেল পাওয়া যায় না। তাই শিল্পকারখানাগুলো ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে বিকল্প ব্যাকআপ তৈরি করতে চাচ্ছে। কিন্তু এসব ব্যাটারি ও স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর এখনো শুল্ক ও কর আছে। আমরা বলেছি, সরকার যখন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, তখন শিল্পকারখানাগুলো নিজেদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সেখানে কর বসানো উচিত নয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, সোলার সিস্টেমের ওপর থাকা কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আমরা এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।
ঢাকা মেইল: আপনি কি মনে করেন, এই বাজেট রফতানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে?
মোহাম্মদ হাতেম: বাজেট সত্যিকারের বিনিয়োগবান্ধব হলে অবশ্যই রফতানি বাড়বে, কর্মসংস্থানও বাড়বে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। বরং একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছি। সরকার নতুন করে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু শিল্পকারখানা টিকিয়ে রাখতে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝে কাজ করার চেষ্টা করছেন। বন্ধ কারখানা চালু করা এবং শিল্পকে সচল রাখতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আমরা সেগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখি।
ঢাকা মেইল: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং শিল্প টিকিয়ে রাখার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে সম্ভব?
মোহাম্মদ হাতেম: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি অবশ্যই যৌক্তিক দাবি। মূল্যস্ফীতি বাড়লে শ্রমিকদেরও বাঁচতে হবে। কিন্তু শুধু মজুরি বাড়ালেই হবে না, শিল্পের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে, উৎপাদন ব্যয় কমালে, ব্যবসা সহজ করলে এবং দুর্নীতি কমাতে পারলে উৎপাদন বাড়বে। তখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোও সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের শিকার হচ্ছি। ‘Ease of Doing Business’ সহজ হওয়ার বদলে আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বলেন, ঘুষ দেন কেন? কিন্তু না দিলে যে কী পরিমাণ হয়রানির মুখে পড়তে হয়, সেটা যারা ভুক্তভোগী তারাই জানেন।
ঢাকা মেইল: নারী শ্রমিকদের জন্য বাজেটে বিশেষ কোনো উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ হাতেম: অবশ্যই প্রয়োজন। নারীদের আরও বেশি শিল্প ও ব্যবসায় যুক্ত করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প, প্রশিক্ষণ ও বিশেষ প্রণোদনা বাড়ানো দরকার। এতে নারীর ক্ষমতায়ন আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ঢাকা মেইল: এলডিসি উত্তরণের পর পোশাকখাত কতটা চাপে পড়বে বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ হাতেম: আমি আগেও বলেছি, বর্তমান বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা হারাব। এতে রফতানি খাত বিশেষ করে পোশাক শিল্প বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। আমি এটাও বলেছি, প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অনেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে বর্তমান সরকার এলডিসি উত্তরণ স্থগিতের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
ঢাকা মেইল: ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করতে কী ধরনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার?
মোহাম্মদ হাতেম: বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন বিশ্বব্যাপী গর্বের জায়গা তৈরি করেছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি, বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি ও কমপ্লায়েন্সে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে। বিশ্বের মোট গ্রিন ফ্যাক্টরির বড় একটি অংশই বাংলাদেশে। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বাজারে ‘Made in Bangladesh’ ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা। সরকার ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ব্রাজিলের মতো বাজারে ‘Made in Bangladesh’ শিরোনামে মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও বাংলাদেশের নিরাপদ ও নৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন করে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
এমআর/জেবি




