নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজ্ঞান ইউনিটের অবকাঠামো, গবেষণা, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের সুবিধা নিশ্চিতে আটটি পর্বে বিন্যস্ত ৪৪টি প্রস্তাব নিয়ে ‘বিজ্ঞান ইউনিট সংস্কারের রূপরেখা’ উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বিজ্ঞান শাখা ঢাবি সংসদের আহ্বায়ক অনিন্দ্য বিশ্বাস সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা জানান, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীর স্মৃতিবিজড়িত এই ইউনিটে শিক্ষা ও গবেষণার অপার সম্ভাবনা থাকলেও শিক্ষার্থীরা বর্তমানে খাদ্য, নিরাপত্তা, ল্যাব-লাইব্রেরি, গবেষণা সহায়তা ও পাঠ্যক্রমের নানামুখী সংকটে জর্জরিত। এসব সংকট উত্তরণেই এই রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ছাত্র ইউনিয়নের ৪৪ দফা দাবিসমূহের মধ্যে রয়েছে—
অবকাঠামো, খাদ্য ও নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধা
শিক্ষার্থীদের জন্য কার্জন হলে ক্যাফেটেরিয়া এবং মোকাররম ও মোতাহের হোসেন ভবনে ক্যান্টিন স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া CARS ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের দাম কমানো এবং বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। কার্জন-মোকাররম এলাকায় বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, সাইকেল স্ট্যান্ড, সিসিটিভি, ফটোকপির দোকান ও ইনডোর স্পোর্টস রুম স্থাপনের দাবিও রয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে পৃথক কমনরুম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীকে ‘মুনাফার পণ্য’ বা ‘Pink Tax’ এর বোঝা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে কার্জন-মোকাররম এলাকায় ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তুকিতে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড সরবরাহের দাবি জানানো হয়েছে।
ইয়ার সিস্টেম পর্যালোচনা ও একাডেমিক কাঠামো
বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদে প্রচলিত পুরোনো ‘ইয়ার সিস্টেম’ পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন। তারা জানায়, একটিমাত্র চূড়ান্ত পরীক্ষার (৭০ নম্বর) ওপর অযৌক্তিক চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে এই পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে।
এ ছাড়া সিলেবাস যুগোপযোগী করা, পর্যাপ্ত ঐচ্ছিক কোর্স যুক্ত করা এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও বায়োমেডিকেল ফিজিক্স বিভাগে স্নাতক (সম্মান) প্রোগ্রাম চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা, থিসিস ও ল্যাব সুবিধা
গবেষণায় ডিজিটাল ও আর্থিক বৈষম্য দূর করতে থিসিস শিক্ষার্থীদের ভাতা ও গবেষণা উপকরণ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন। শুধু সিজিপিএ-র ভিত্তিতে নয়, বরং শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সুপারভাইজার নির্বাচনের সুযোগ চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের খরচ বহনে ‘পাবলিকেশন সাপোর্ট ফান্ড’ গঠন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় RA/TA নিয়োগ, সফটওয়্যার ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন এবং ল্যাপটপ ক্রয়ে বিশেষ ‘টেকনোলজি গ্রান্ট’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণার স্বার্থে বিজ্ঞান ইউনিটের প্রতিটি ল্যাব ও বিজ্ঞান লাইব্রেরি ২৪ ঘণ্টা (২৪/৭) খোলা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চিকিৎসা ও পরিবেশ
সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাদুঘর, কাজী জাকের হোসেন জুওলজিক্যাল মিউজিয়াম এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনের গ্রিনহাউসের আধুনিকায়ন ও অর্থায়ন বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঢাবি টেলিমেডিসিন কার্যক্রমকে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্যাম্পাসে সম্প্রসারিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞান ইউনিটের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ‘বিজ্ঞান মেলা’ আয়োজনেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান রক্ষায় কার্জন হল এলাকায় অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধন ও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেশীয় বৃক্ষ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের পথকুকুর ও বিড়ালদের জন্য নিয়মিত খাদ্য, চিকিৎসা এবং TNR (Trap-Neuter-Return) কর্মসূচি চালুর দাবিও রূপরেখায় স্থান পেয়েছে।
সংবাদ সস্মেলনে ছাত্র ইউনিয়ন ঢাবির সহ-সভাপতি ফাতিন ইশরাক জানান, উত্থাপিত এসব দাবি বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বিজ্ঞান ইউনিটের সব সচেতন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
আরএনবি/এফএ