মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে কবরের জগত বা আলমে বরজখ। কবর আজাব সত্য। ‘কবরে ফেরেশতাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ভিত্তিতে জাহান্নামের গর্ত কিংবা জান্নাতের টুকরোয় পরিণত হবে কবর।’ (তাবিয়াতুল হায়াত ফিল কবর; আল-ইসলাম সুওয়ালুন ওয়া জওয়াব: ০৪-১১-২০১৮)
কিন্তু আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে কিছু মানুষ কবরে সওয়াল জওয়াবের সম্মুখীন হবেন না এবং কবরে তাদের আজাব দেওয়া হবে না। তারা কারা? নিচে তাদের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
বিজ্ঞাপন
১) সীমান্ত পাহারাদার
ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারাদাররা কবরে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা অবস্থায় মারা যায়, তাহলে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল মরার পরও তা তার জন্য সওয়াব জারি থাকবে, তার রিজিকও জারি থাকবে, কবরের পরীক্ষা থেকে সে থাকবে নিরাপদ এবং আল্লাহ তাআলা কেয়ামতে তাকে ভয় থেকে মুক্ত অবস্থায় ওঠাবেন।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৩৪)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মৃত্যুর পর প্রত্যেক মৃতের কর্মের ধারা শেষ করে দেওয়া হয়। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয় তার আমল কেয়ামত পর্যন্ত বাড়তে থাকবে এবং কবরের ফেতনা থেকেও সে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৬২৪)
আরও পড়ুন: তিন মানুষের চোখ জাহান্নামের আগুন দেখবে না
২) শহীদ
শহীদরা কবরে প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন না এবং কবরের যাবতীয় ফিতনা থেকে রক্ষা পাবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘..তার মাথার উপর তরবারির ঝলকই তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখবে (নাসায়ি: ২০৫৩; সহিহুল জামে: ৪৪৯৩; সহিহুত তারগিব: ১৩৮০)
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, শহীদের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট ৬টি পুরস্কার রয়েছে। ক) শহীদের রক্তের প্রথম ফোঁটা জমিনে পড়তেই তাকে মাফ করে দেওয়া হয় এবং জান বের হওয়ার প্রাক্কালেই তাকে জান্নাতের ঠিকানা দেখানো হয় খ) তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করা হয় গ) কেয়ামত দিবসের ভয়াবহতা হতে তাকে নিরাপদ রাখা হয় ঘ) সেদিন তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরানো হবে। যার একটি মুক্তা দুনিয়া ও তার মধ্যেকার সবকিছু হতে উত্তম ঙ) তাকে ৭২ জন সুন্দর চক্ষুবিশিষ্ট হুরের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে এবং চ) ৭০ জন নিকটাত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৬৩; মেশকাত: ৩৮৩৪; সহিহাহ: ৩২১৩)
৩) পেটের পীড়ায় মারা যাওয়া ব্যক্তি
পেটের রোগে মৃত্যু হলেও কবরে প্রশ্ন করা হবে না এবং কবরের আজাব হবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যাকে তার পেটের কোনো রোগ হত্যা করে তাকে কখনো কবরে ‘আজাব দেওয়া হবে না।’ (তিরমিজি: ১০৬৪; সুনানে নাসায়ি: ৪/৯৮)
উল্লেখ্য, শহিদের মর্যাদা পাবে—এমন আরও কিছু মৃত্যু সম্পর্কে নবীজি (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় নিহত (শহীদ) হওয়া ছাড়াও আরও সাত ধরনের শহীদ আছে— ১. মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ২. পানিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ৩. পক্ষাঘাতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ৪. পেটের রোগের কারণে (কলেরা, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে) মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ৫. অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ৬. কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ এবং ৭. যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যাবে সেও শহীদ।’ (আবু দাউদ: ৩১১১)
তবে এসব মৃত্যুর মধ্যে পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারীকে নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ এ রোগটি মানুষকে তিলে তিলে সহ্য করতে হয়। যারা দীর্ঘদিন এ রোগে ভুগে ধৈর্যধারণ করে মারা যান তাদের জন্য এ সৌভাগ্য ঘোষণা করেছেন বিশ্বনবী (স.)।
আরও পড়ুন: শহীদের মৃত্যুযন্ত্রণা হয় কি?
৪) সুরা মুলক পাঠকারী
নিয়মিত সুরা মুলক পাঠকারীর ব্যাপারে নবীজি (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে যে ব্যক্তি সুরা তাবারাকাল্লাজি, অর্থাৎ সুরা মুলক তেলাওয়াত করবে, তার মৃত্যুর পর কবরের আজাব মাফ করে দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি: ২৮৯০, মুসতাদরাকে হাকেম)
আরও পড়ুন: কঠিন সময়ের বন্ধু ‘সুরা মুলক’
৫) জুমার দিন মৃত্যুবরণকারী
জুমাবারে কেউ মারা গেলে তার কবর আজাব হয় না বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে মুসলমান জুমার দিনে কিংবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। (তিরমিজি: ১০৯৫; মেশকাত: ১৩৬৭; মুসনাদে আহমদ: ১১/১৪৭)
আরও পড়ুন: জুমার দিনে মৃত্যুবরণকারীর মর্যাদা
এছাড়াও নবী-রাসুলগণ, সিদ্দিক, নাবালেগ ও পাগলদের কবর আজাব নেই মর্মে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবর আজাব থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।