মদিনার মসজিদে নববীর খোলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ছাতাগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এগুলো শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। বাস্তবে এগুলো আধুনিক প্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি একটি বড় ছায়া ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা। তীব্র রোদ, গরম ও বৃষ্টির মধ্যে মুসল্লিদের স্বস্তি দেওয়াই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
২৫০টি বিশাল ছাতা
মসজিদে নববীর প্রাঙ্গণে মোট ২৫০টি স্বয়ংক্রিয় ছাতা স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ছাতার বিস্তার প্রায় ২৫ দশমিক ৫ মিটার × ২৫ দশমিক ৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ৪০ টন। খোলা অবস্থায় একেকটি ছাতা ৯০০-এর বেশি মুসল্লিকে ছায়া দিতে পারে। সব ছাতা মিলিয়ে একসঙ্গে ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি মুসল্লি ছায়ার সুবিধা পান।
ছাতাগুলো দুটি ভিন্ন উচ্চতায় সাজানো, যাতে খোলা অবস্থায় একটির ছায়ার সঙ্গে অন্যটির ছায়া সমন্বিতভাবে মিলে যায়। বন্ধ অবস্থায় প্রতিটির উচ্চতা প্রায় ২১ দশমিক ৭ মিটার।
আরও পড়ুন: গ্রিসের পাহাড় থেকে মসজিদে নববীর শীতল মেঝে এবং মিশরীয় স্থপতির গল্প

কীভাবে তৈরি
এগুলো সাধারণ কাপড়ের ছাতা নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ছাতার কাঠামো ও বাহুতে কার্বন-ফাইবারভিত্তিক উপকরণসহ আধুনিক প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব উপকরণ দীর্ঘদিন রোদ, বাতাস ও বৃষ্টির মতো পরিবেশগত চাপ সহ্য করার উপযোগী।
ছাতার বাহুতে রয়েছে ইসলামি জ্যামিতিক নকশা ও মোজাইক অলংকরণ। উপরের অংশে রয়েছে সোনার প্রলেপ দেওয়া তামার অলংকরণ। ফলে প্রকৌশল কাঠামোর সঙ্গে মসজিদে নববীর স্থাপত্যেরও সামঞ্জস্য রাখা হয়েছে।

সূর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খোলে-বন্ধ হয়
ছাতাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। সাধারণত সূর্যোদয়ের সময় এগুলো খুলে যায় এবং সূর্যাস্তের আগে বন্ধ হয়ে যায়। পুরো ব্যবস্থা একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করা হয়। আবহাওয়া ও মুসল্লিদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছাতাগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
আরও পড়ুন: মসজিদে হারাম ও নববিতে নামাজ পড়ার ফজিলত
গরমে শীতল রাখে মিস্টিং ফ্যান
ছাতাগুলোর সঙ্গে রয়েছে ৪৩৬টি মিস্টিং ফ্যান। প্রতিটি ফ্যানে ১৬টি করে পানির স্প্রে মুখ রয়েছে। এসব ফ্যান পরিশোধিত পানি সূক্ষ্ম কণার আকারে ছড়িয়ে বাতাস শীতল করতে সহায়তা করে। মিস্টিংয়ের পানি পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন
প্রতিটি ছাতায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি পরিকল্পিতভাবে সরে যেতে পারে এবং প্রাঙ্গণে পানি জমার ঝুঁকি কমে। একইসঙ্গে ছাতাগুলো মুসল্লিদের বৃষ্টির পানি থেকে সুরক্ষা দেয়।

রাতেও আলোকিত প্রাঙ্গণ
ছাতাগুলোর সঙ্গে ১ হাজারের বেশি আলোকব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে। এতে রাতে প্রাঙ্গণ আলোকিত থাকে এবং ছাতাগুলোর নকশাও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
প্রযুক্তি ও স্থাপত্যের সমন্বয়
রমজান ও হজের মৌসুমে মসজিদে নববীতে মুসল্লি ও জিয়ারতকারীর সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যায়। তখন এই ছাতাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছাতাগুলোর নকশায় ছায়া, আবহাওয়া, পানি নিষ্কাশন, শীতলীকরণ, আলোকসজ্জা, স্বয়ংক্রিয় পরিচালনা ও মুসল্লিদের চলাচলের সুবিধা সবকিছুই বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
২৫০টি ছাতা, ৪৩৬টি মিস্টিং ফ্যান ও আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবস্থা পবিত্র স্থানের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য বজায় রেখে মুসল্লিদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এবং মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর বিষয়ক সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য




