বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

চট্টগ্রামের ছেলের হাতের লেখায় সাজে কাবার গিলাফ

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

চট্টগ্রামের ছেলের হাতের লেখায় সাজে কাবার গিলাফ

পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ বা ‘কিসওয়া’ মুসলিম উম্মাহর কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক প্রতীক। কালো রঙের এই গিলাফের ওপর সোনালি ও রুপালি সুতোয় খচিত কোরআনের আয়াত এবং নান্দনিক আরবি ক্যালিগ্রাফি বিশ্বের সেরা ইসলামি শিল্পকর্মগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। আর সেই কিসওয়ার প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক নাম- মুখতার আলম শিকদার, যাঁর শিকড় বাংলাদেশের চট্টগ্রামে।

জন্ম ও শৈশব

মুখতার আলমের জন্ম ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নে। তাঁর বাবা মফিজুর রহমান বিন ইসমাঈল শিকদার পেশায় ছিলেন একজন ফার্মাসিস্ট, যিনি দীর্ঘ সময় সৌদি আরবের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত ছিলেন। বাবার কর্মসূত্রে মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মুখতার। মক্কার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এই তরুণ পবিত্র উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যালিগ্রাফিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে সেখানেই পিএইচডি গবেষণারত আছেন।

mukhtar-alim-02-20211114124835

কিসওয়া কারখানায় যোগদানের ইতিহাস

মুখতার আলমের এই সম্মানজনক যাত্রা শুরু হয় ১৪২২ হিজরিতে, যখন জেদ্দার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্যালিগ্রাফার মুহাম্মাদ সালেম বাজনাইদের নজরে আসে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। মুগ্ধ হয়ে বাজনাইদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। এরপর মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে ১৪২৩ হিজরিতে (২০০২ সালে) কাবার গিলাফ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর হোলি কাবা কিসওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যালিগ্রাফার হিসেবে যোগ দেন তিনি।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

কিসওয়ার বর্তমান নকশা মূলত বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার শাইখ আবদুর রহিম আমিন বুখারির তৈরি ‘সুলুস’ লিপির ওপর ভিত্তি করে রচিত, যাঁর উত্তরসূরি হিসেবেই দায়িত্ব পান মুখতার আলম। সেই শতবর্ষী ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেও তিনি কাজে যুক্ত করেছেন আধুনিকতার ছোঁয়া। ক্যালিগ্রাফি কাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

image_20260617_154853634

আরও পড়ুন: হজ শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে মক্কা ছাড়ছেন লাখো হাজি

বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান ও নাগরিকত্ব

২০২১ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবের ইতিহাসে এক বিরল সম্মানে ভূষিত হন মুখতার আলম। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন পেশার দক্ষ ও মেধাবী বিদেশি নাগরিকদের সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়ার রাজকীয় নির্দেশনায় অন্তর্ভুক্ত হয় তাঁর নাম। সেদিন নাগরিকত্ব পাওয়া পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন একজন ইতিহাসবিদ, একজন গবেষক ও একজন নাট্যশিল্পী; মুখতার আলমই ছিলেন একমাত্র ক্যালিগ্রাফার।
ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি মক্কার ‘ইনস্টিটিউট অব হলি মস্ক’ পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন মুখতার আলম। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান যখন কাবার দিকে তাকান, তখন সেই মহিমান্বিত কিসওয়ার সোনালি আয়াত ও নান্দনিক অলংকরণের পেছনে নীরবে কাজ করে এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিল্পীর সৃজনশীলতা। চট্টগ্রামের শিকড় থেকে পবিত্র কাবার গিলাফ পর্যন্ত মুখতার আলমের এই যাত্রা মুসলিম বিশ্বের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর