রমজান মাসে শরিয়তসম্মত কোনো ওজরের কারণে যেমন অসুস্থতা, সফর, ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা বা দুগ্ধদানকালীন সমস্যায় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তবে পরে সেই রোজাগুলো কাজা করা ফরজ। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, কাজা রোজা আদায়ে কত দিন দেরি করা যাবে? এক রমজানের কাজা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া যাবে কি? এভাবে দেরি হয়ে গেলে করণীয় কী?
কাজা রোজার মূল বিধান
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে সে এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, বৈধ কারণে ছুটে যাওয়া রোজা পরবর্তীতে কাজা করা আবশ্যক।
কত দিন পর্যন্ত কাজা করা যাবে?
শরিয়তে কাজা রোজা আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তাই রমজানশেষে বছরের যেকোনো সময়ে কাজা রোজা রাখা বৈধ। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের কিছু কাজা রোজা বাকি থাকত। আমি তা শাবান মাস ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৫০; সহিহ মুসলিম: ১১৪৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, পরবর্তী রমজানের আগ পর্যন্ত কাজা আদায়ের সুযোগ রয়েছে। তবে এটি বিলম্বের বৈধতার প্রমাণ নয়; বরং প্রয়োজনের কারণে দেরি হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত।
আরও পড়ুন: রমজানের কাজা রোজা কখন রাখা উচিত?
বিজ্ঞাপন
বিলম্বের কারণ থাকলে গুনাহ নেই
যদি কেউ অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা, দুগ্ধদান বা অন্য কোনো শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে কাজা রোজা আদায় করতে না পারেন এবং এ অবস্থায় পরবর্তী রমজান এসে যায়, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন না। ইমাম নববি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ওজরের কারণে বিলম্ব হলে আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী কেবল কাজা আদায় করলেই দায়িত্ব পূর্ণ হবে। (আল-মাজমু, ৬/৩৬৬)
বিনা কারণে বিলম্ব করলে কী হবে?
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ অলসতা বা অবহেলার কারণে কাজা রোজা আদায় না করে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত বিলম্ব করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। কারণ ফরজ ইবাদত অকারণে বিলম্ব করা বৈধ নয়। তবে এ বিলম্বের কারণে কাজা রোজার দায়িত্ব রহিত হবে না; বরং তাকে আল্লাহর কাছে তাওবা করে দ্রুত কাজা আদায় করতে হবে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে যে, বিলম্ব হলেও কাজা রোজা আদায় করা আবশ্যক। (আল-মাজমু: ৬/৩৬৪-৬৬)
আরও পড়ুন: কাজা রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারা দিতে হবে কি?
ফিদইয়া দিতে হবে কি?
এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হানাফি মাজহাবের মত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফকিহদের মতে, কেবল কাজা আদায় করাই যথেষ্ট; অতিরিক্ত কোনো ফিদইয়া বাধ্যতামূলক নয়। তাদের দলিল হলো, কোরআনে আল্লাহ কেবল সংখ্যা পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন, অতিরিক্ত দণ্ডের কথা বলেননি। (সুরা বাকারা: ১৮৫)
অন্য ইমামদের মত: ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ (রহ.)-এর মতে, বিনা ওজরে কাজা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত বিলম্ব করলে কাজার পাশাপাশি প্রতিটি রোজার জন্য একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে হবে। তারা এ বিষয়ে সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত কিছু বক্তব্যকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর মতে, কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশের আলোকে কাজা আদায়ই মূল দায়িত্ব। কেউ সতর্কতামূলকভাবে ফিদইয়া দিলে তা উত্তম, তবে কেবল কাজা আদায় করলেও দায়মুক্তি হবে। (আশ-শারহুল মুমতি: ৬/৪৪৫)
আরও পড়ুন: কাজা রোজার নিয়তে যে সতর্কতা জরুরি
গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর বিধান
গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নারী যদি নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কায় রোজা না রাখেন, তাহলে পরবর্তীতে রোজাগুলো কাজা করতে হবে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ফিদইয়া দিয়ে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মুসাফিরের জন্য রোজার বিধান শিথিল করেছেন এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর জন্যও রোজার বিধান শিথিল করেছেন।’ (জামে তিরমিজি: ৭১৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৬৮)
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ ও বৃদ্ধদের জন্য বিধান
যারা অতি বার্ধক্য বা এমন দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত যার সুস্থ হওয়ার আশা নেই, তাদের জন্য কাজা রোজা রাখা ফরজ নয়। তারা প্রতিটি রোজার বদলে একজন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়াবেন বা সমপরিমাণ ফিদইয়া প্রদান করবেন।
মোটকথা, রমজানের কাজা রোজা আদায়ের জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে পরবর্তী রমজান আসার আগেই তা আদায় করে নেওয়া উত্তম। ওজরের কারণে বিলম্ব হলে গুনাহ নেই; কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করলে গুনাহ হবে এবং দ্রুত তাওবা করে কাজা আদায় করতে হবে। তাই যাদের কাজা রোজা বাকি আছে, তাদের উচিত সুযোগমতো তা আদায় করে ফরজ দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া।




