হজের মূল স্তম্ভ ‘উকুফে আরাফা’ (আরাফাতে অবস্থান)। মহানবী (স.) বলেছেন, ‘আরাফাতই হলো হজ।’ প্রতি বছর ৯ জিলহজ, মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত আরাফাত প্রান্তরে সমবেত হন বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিম। সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই সময়টুকুতে সেখানে এক গভীর আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়- যেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র সবাই ভেদাভেদ ভুলে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
কেন এই কান্না? এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি, হাজার বছরের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব।
বিজ্ঞাপন
আধ্যাত্মিক ‘ঘরে ফেরা’: স্রষ্টার দরবারে বান্দার হাজিরা
‘আরাফাত’ শব্দের একটি অর্থ হলো- চিনে নেওয়া বা পরিচয় হওয়া। ইসলামি ঐতিহ্যের কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আসার পর এই ময়দানেই আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.) পুনর্মিলিত হয়েছিলেন। এই ঐতিহ্যিক স্মৃতি হাজিদের মনে এক গভীর ‘ঘরে ফেরার অনুভূতি’ জাগায়। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও ভুলত্রুটির পর বান্দা যখন তার রবের কাছে ফিরে আসে, তখন নিজের বিচ্যুতি ও স্রষ্টার অসীম করুণার দোলাচলে অশ্রু ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: আরাফার দিন দোয়া করার উত্তম সময়, যে দোয়া পড়তে ভুলবেন না
ক্ষমার আশ্বাস ও পরম পাওয়ার তৃপ্তি
হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা আরাফার দিনে বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাজিল করেন এবং এই দিনে সর্বাধিক মানুষকে ক্ষমা করা হয় (সহিহ মুসলিম)। এই বিশ্বাস একজন মানুষের মনে তীব্র আবেগের সৃষ্টি করে। একদিকে জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার আশা, অন্যদিকে রবের কাছে কবুল হওয়ার ব্যাকুলতা- এই দুইয়ের চাপে মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ে। এটি মূলত কৃতজ্ঞতা ও আশার কান্না।
মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: অহংবোধের বিনাশ ও ক্যাথারসিস
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্যাথারসিস’ অর্থাৎ অবদমিত তীব্র আবেগের নিঃসরণ। ইহরামের সাদা কাপড়ে যখন সবাই একাকার হয়ে যায়, তখন মানুষের জাগতিক পদ-পদবী বা অহংকার ধূলিসাৎ হয়। এই অবস্থায় মানুষ নিজের সামাজিক আবরণের বাইরে এসে প্রকৃত সত্তার মুখোমুখি হয়, নিজেকে রিক্ত ও অসহায় অনুভব করেন। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলো যাকে ‘পিক এক্সপেরিয়েন্স’ বলেছিলেন, সেই অহং-বিলুপ্তির মুহূর্তে মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন ও সেরোটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন, যা গভীর আবেগের প্রকাশকে ত্বরান্বিত করে। তবে আরাফাতের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এর সরাসরি প্রমাণ সীমিত; এটি একটি সম্ভাব্য মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
আরও পড়ুন: আরাফার ময়দানে কতক্ষণ থাকতে হবে, কী দোয়া পড়বেন- সম্পূর্ণ গাইড
সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুরখেইম এই সমষ্টিগত অবস্থাকে বলেছেন ‘কালেক্টিভ এফারভেসেন্স’- যেখানে বিশাল জনসমষ্টির একই ধরনের আবেগ ও আর্তি ব্যক্তিকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। একে অপরের কান্না ও প্রার্থনা কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও বিগলিত করে তোলে।
শেষ বিচারের মহড়া ও কেয়ামতের প্রতিচ্ছবি
উত্তপ্ত মরুপ্রান্তর, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, তীব্র রোদ আর চারদিকে কোটি মানুষের হাহাকার- এই দৃশ্যটি হাজিদের মনে করিয়ে দেয় পরকালের কঠিন ময়দানের কথা। ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, আরাফাতের ময়দান আসলে হাশরের (কেয়ামতের) ময়দানের একটি জীবন্ত রূপক। নিজের কৃতকর্মের ভয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা মানুষকে ডুকরে কাঁদতে বাধ্য করে।
আরও পড়ুন: হাদিসের আলোকে আরাফাতের ময়দানের বিশেষত্ব
ঐতিহাসিক স্মৃতি: জাবালে রহমত ও বিদায় হজের ভাষণ
আরাফাতের একটি অংশ ‘জাবালে রহমত'’ বা করুণার পাহাড়। এই পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়েই নবীজি (স.) তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, যা মানবতার সার্বজনীন সাম্য ও ন্যায়বিচারের এক অনন্য ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত। হাজিরা যখন সেই পাহাড়ের দিকে তাকান, তখন তাঁদের মনে পড়ে প্রিয় নবীর সেই বিদায়ী আহ্বান, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার গ্লানি অনেককে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
অশ্রু যখন আত্মার ভাষা
আরাফাতের কান্না কোনো জাগতিক দুঃখের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি মূলত আত্মার জাগরণ। এখানে কান্না মানে নিজের ভুলের স্বীকারোক্তি, স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং নতুন জীবনের অঙ্গীকার। পৃথিবীর আর কোনো প্রান্তরে একইসঙ্গে এত অশ্রু এবং এত প্রশান্তি অনুভব হয় না। হয়তো এ কারণেই বলা হয়- আরাফাতের সেই অশ্রু, মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল ও সত্য অশ্রু।
তথ্যসূত্র: বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইমাম গাজালি (রহ.)-এহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ইমিল ডুরখেইম- Collective Effervescence তত্ত্ব, আব্রাহাম মাসলো— Peak Experience তত্ত্ব




