কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। তবে বর্তমানে কোরবানির গোশত বিতরণে এক ধরনের অহমিকা ও অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভাবী মানুষকে লাইনে দাঁড় করানো বা প্রকৃত হকদারদের এড়িয়ে যাওয়ার কারণে ইবাদতের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
ইবাদত হিসেবে কোরবানির গোশত বিতরণ
কোরবানির গোশত আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে দরিদ্রদের জন্য আতিথেয়তা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তখন তার গোশত থেকে নিজেরাও খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে।’ (সুরা হজ: ৩৬) রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা খাও, জমা করে রাখ এবং দান-খয়রাত কর।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৬৯) ফকিহদের মতে, মাংস বিতরণ গরিবের প্রতি করুণা নয়; প্রকৃতপক্ষে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারি।
বিতরণে সাধারণ ভুল
অহংকার প্রকাশ: দাতা যেন মনে না করেন যে তিনি কাউকে দান করছেন। বরং ভাবা উচিত তিনি আল্লাহর হুকুম পালন করছেন।
হকদারকে বাদ দেওয়া: যারা আত্মসম্মানবোধের কারণে হাত পাতেন না, তারা অনেক সময় বঞ্চিত হন। অথচ কোরআনে অভাব প্রকাশকারী এবং ধৈর্যশীল- উভয়কেই দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: গরিবদের গোশত না দিলে কোরবানি শুদ্ধ হবে?
বিজ্ঞাপন
ঘরে পৌঁছে দেওয়া আর লাইনে দাঁড়ানো
ইসলাম শিক্ষা দেয় বিনয় ও ভ্রাতৃত্ব। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আর যারা যা দেওয়ার তা দেয় ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এজন্য যে, তাদেরকে নিজ প্রতিপালকের কাছে ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা মুমিনুন: ৬০) নিজের দ্বারপ্রান্তে দরিদ্রদের দাঁড় করানো ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে এবং তাকওয়ার মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত করে।
নবীজি ও সাহাবিদের আদর্শ
নবুয়তপ্রাপ্তির আগে ও পরে রাসুলুল্লাহ (স.) এবং পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম অভাবীদের ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য ও খাদ্য পৌঁছে দিতেন। এই ঐতিহাসিক ধারা অনুসরণ করলেই কোরবানির আসল শিক্ষা রক্ষা সম্ভব।
আরও পড়ুন: গরিবরা কি কোরবানির গোশত বিক্রি করতে পারবে?
সমাধান ও সুপারিশ
- তালিকা প্রস্তুত: এলাকার অভাবী পরিবারদের আগে থেকে চিহ্নিত করা।
- ঘরে ঘরে বিতরণ: গোশত সরাসরি পৌঁছে দেওয়া যাতে মানুষের ইজ্জত ও আত্মসম্মান রক্ষা হয়।
- অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়ানো: গেটের সামনে অভাবীদের ভিড় জমিয়ে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করা।
অবহেলার ফল
যদি কোরবানির পশু জবেহ করা হলেও অহংকার ও লোক দেখানোর মানসিকতা থাকে, তাহলে এটি ইবাদত না হয়ে শুধুই উৎসবে পরিণত হয়। এতে ইবাদতের মূল সওয়াব ও বরকত হারানোর আশঙ্কা থাকে।
কোরবানির গোশত বিতরণ একটি আমানত। প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব নিজের এলাকার অভাবীদের খুঁজে বের করে সসম্মানে তাদের ঘরে গোশত পৌঁছে দেওয়া। এটাই প্রকৃত তাকওয়া এবং ইবরাহিমি ত্যাগের শিক্ষা।
(সূত্র: সুরা হজ: ৩৬, ৩৭; সুরা মুমিনুন: ৬০; সহিহ বুখারি: ৫৫৬৯; জামে তিরমিজি: ১৫৬৭; ফতোয়া ও মাসায়েল: মাসিক আল-কাউসার)




