মসজিদুল হারাম বা পবিত্র কাবা শরিফ পৃথিবীর সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ স্থান। এই পুণ্যভূমিতে করা প্রতিটি নেক আমল আল্লাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সাধারণ হাজিদের মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই জাগে- মসজিদুল হারামে কোরআন তেলাওয়াত করলে কি নামাজের মতো এক লক্ষ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়? শরিয়তের দলিল ও বিজ্ঞ আলেমদের গবেষণায় এর উত্তর ও বিশেষ মাহাত্ম্য উঠে এসেছে।
লক্ষ গুণের সমীকরণ: হাদিস ও আলেমদের মত
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর স্পষ্ট হাদিস অনুযায়ী, মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব ১ লক্ষ গুণ বেশি (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪০৬)। তবে কোরআন তেলাওয়াত বা অন্যান্য নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে ঠিক ‘এক লক্ষ গুণ’ সওয়াব কি না, তা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
মুহাদ্দিস ও ফকিহদের একাংশ মনে করেন, নামাজের সওয়াব যেহেতু নির্দিষ্টভাবে ১ লক্ষ গুণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তাই অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর রহমতে এই আধ্যাত্মিক গুণিতক কার্যকর হতে পারে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, অন্যান্য ইবাদতে সওয়াব বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত হলেও তা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যায় (যেমন ১ লক্ষ) নির্ধারিত নয়। বরং তা আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহেরবানি ও ব্যক্তির আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন: কোরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত: গুরুত্ব ও ফজিলত
ওহি নাজিলের স্থানে তেলাওয়াতের স্বাদ
মসজিদুল হারামে কোরআন তেলাওয়াতের অনন্য একটি দিক হলো এটি ‘মাহবাতে ওহি’ বা ওহি নাজিল হওয়ার স্থান। যে পবিত্র ভূমিতে জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে আসতেন, সেখানে বসে সেই ওহির কালাম তেলাওয়াত করার স্বাদই আলাদা।
পবিত্র কাবা বা বায়তুল্লাহর সামনে বসে কোরআন তেলাওয়াত করার সময় এই পবিত্র পরিবেশের প্রভাবে ব্যক্তির ঈমানি হালত ও খুশু-খুজু (একাগ্রতা) বহুগুণ বেড়ে যায়। আধ্যাত্মিক এই পরিবেশ সরাসরি মুমিনের অন্তরে হেদায়াতের নূর ও প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।
বিজ্ঞাপন
ফকিহদের বক্তব্য
ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদ বা ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, সম্মানিত স্থান ও সময়ে ইবাদতের সওয়াব সাধারণ অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি। বিখ্যাত ইমাম ও গবেষক ইমাম নববি (র.) এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (র.) এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র মক্কায় কৃত যেকোনো নেক আমলের মর্যাদা ও সওয়াব আল্লাহর বিশেষ করুণায় অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আরও পড়ুন: কোরআন তেলাওয়াতের সময় কান্না নেককার বান্দাদের অলংকার
হাজি ও দর্শনার্থীদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ
সময়ের মূল্যায়ন: হারামে অবস্থানকালীন প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই অপ্রয়োজনীয় আলাপ না করে তেলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকা উচিত।
অর্থ ও তাদাব্বুর: শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং ওহির ভূমিতে বসে কোরআনের মর্ম অনুধাবন ও চিন্তা (তাদাব্বুর) করার চেষ্টা করা।
আদব রক্ষা: কাবার সামনে তেলাওয়াত করার সময় পূর্ণ আদব, পবিত্রতা ও নিবিষ্ট মনোযোগ বজায় রাখা জরুরি। কারণ এখানে যেমন সওয়াব বেশি, তেমনি ইবাদতে অবহেলার গুনাহও মারাত্মক হতে পারে।
পবিত্র কোরআন মূলত আল্লাহর সাথে কথোপকথন। আর আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে তাঁরই কালাম তেলাওয়াত করা- এটি একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে সৌভাগ্যময় ও মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। নির্দিষ্ট সওয়াবের সংখ্যার চেয়েও বড় পাওয়া হলো মহান রবের সেই বিশেষ সান্নিধ্য, যা কেবল মসজিদুল হারামের প্রাঙ্গণেই অনুভব করা সম্ভব।




