সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ইহরাম অবস্থায় উকুন মারাও কি নিষিদ্ধ? মারলে জরিমানা কী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ইহরাম অবস্থায় উকুন মারাও কি নিষিদ্ধ? মারলে জরিমানা কী

ইহরাম কেবল নির্দিষ্ট পোশাক পরিধানের নাম নয়; এটি মূলত এক গভীর আধ্যাত্মিক অবস্থার সূচনা। এই অবস্থায় একজন মুমিন নিজেকে মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করেন। বাহ্যিক সৌন্দর্য, আরাম-আয়েশ ও দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্য থেকে সরে এসে তিনি এক ভিন্ন জীবনচর্চায় প্রবেশ করেন। তাই নখ কাটা, চুল ছাঁটা বা সুগন্ধি ব্যবহারের মতো উকুন মারা সম্পর্কেও শরিয়তে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র একটি প্রাণীকে কেন্দ্র করে এমন বিধান ইসলামের গভীর দর্শন ও শৃঙ্খলাবোধকে ফুটিয়ে তোলে।

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ: পর্যালোচনা

ফিকহশাস্ত্রে ইহরামের বেশ কিছু সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ উল্লেখ করা হয়েছে। হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ যেমন- রদ্দুল মুহতার, আদ্দুররুল মুখতার এবং ফতোয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসব বিষয় বিস্তারিত এসেছে। প্রধান নিষেধাজ্ঞাগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরুষদের জন্য সেলাই করা কাপড় পরা এবং মাথা ও চেহারা আবৃত করা। নারীদের জন্য এ সময় মুখে কাপড় স্পর্শ করানো নিষেধ। এছাড়া শরীর বা পোশাকে সুগন্ধি ও সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা যাবে না। শরীরের কোনো অংশের চুল, পশম বা নখ কাটা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি বন্যপ্রাণী শিকার করা এবং ঝগড়া-বিবাদে জড়ানোও গুনাহের কাজ। এই ধারাবাহিকতায় নিজের বা অন্যের শরীর কিংবা কাপড়ে থাকা উকুন হত্যা করা বা ফেলে দেওয়াকেও নিষিদ্ধ বা পরিত্যাজ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪৮৬; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২২৪)

আরও পড়ুন: ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ নিষিদ্ধ 

হাদিসের দলিল: বাস্তবতার স্বীকৃতি

এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে সাহাবি কাব ইবন উজরা (রা.) থেকে। তিনি ইহরাম অবস্থায় মাথায় মারাত্মক উকুনের কষ্টে আক্রান্ত হলে রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে কষ্ট লাঘবে মাথা মুণ্ডানোর অনুমতি দেন। তবে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তুমি একটি কোরবানি করো, অথবা তিন দিন রোজা রাখো, অথবা ছয়জন মিসকিনকে আহার করাও।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ অবস্থায় উকুন মারা নিষিদ্ধ, তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা কষ্টে এটি করা হলে তার বিনিময়ে ‘ফিদইয়া’ বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।


বিজ্ঞাপন


উকুন মারা কেন নিষিদ্ধ, অন্তর্নিহিত দর্শন

ইহরাম অবস্থায় উকুন না মারার পেছনে কয়েকটি সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে। প্রথমত, ‘শআস’ বা বিরাগী অবস্থা বজায় রাখা। হজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো নিজেকে উস্কোখুস্কো ও ধুলোমলিন অবস্থায় আল্লাহর দরবারে হাজির করা। হাদিসে এসেছে, ‘হজ পালনকারী হলো সেই ব্যক্তি, যার চুল উস্কোখুস্কো ও দেহ ধুলোবালিমাখা।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ) উকুন এই অবস্থার একটি অনুষঙ্গ বিধায় একে দূর করা এক ধরনের আরামপ্রিয়তার পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অভয়ারণ্যসদৃশ অবস্থা বজায় রাখা। ইহরাম অবস্থাকে এক প্রকার আধ্যাত্মিক ‘অভয়ারণ্য’ বলা যায়। এখানে বড় প্রাণী তো বটেই, এমনকি শরীরের ক্ষুদ্র পরজীবী উকুনও নিরাপত্তা পায়। এটি মুমিনের ধৈর্য, আত্মসংসংযম এবং সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধের এক অনন্য পরীক্ষা। এছাড়া চুল বা নখ কাটার মতো উকুন পরিষ্কার করাও এক ধরনের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যচর্চার অংশ। ইহরামে এসব পরিহার করার মাধ্যমে মানুষ যাবতীয় বাহ্যিক পরিপাটিভাব ও পার্থিব বিলাসিতা থেকে দূরে সরে এসে কেবল আত্মিক শুদ্ধির ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে। অর্থাৎ, নিজের দেহের আরাম বা সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয়, বরং আল্লাহর দরবারে একজন নিঃস্ব ও সমর্পিত দাস হিসেবে উপস্থিত হওয়াই এই বিধানের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন: ইহরাম অবস্থায় নারীরা যে ভুলটি বেশি করেন 

ভুলবশত উকুন মারলে বা ফেলে দিলে জরিমানা ও মাসয়ালা

যদি কেউ ইহরাম অবস্থায় উকুন মেরে ফেলে বা ঝেড়ে ফেলে দেয়, তবে তার ওপর শরিয়ত নির্ধারিত জরিমানা (সদকা) ওয়াজিব হবে। এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট মাসআলাগুলো নিম্নরূপ-
১টি থেকে ৩টি উকুন মারলে: যদি ১টি, ২টি বা ৩টি উকুন মারা হয় বা ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে প্রতিটির বিনিময়ে সামান্য খাবার (এক মুঠো গম বা সমজাতীয় কিছু) সদকা করা ওয়াজিব।
তিনটির অধিক উকুন মারলে: যদি কেউ তিনটির বেশি উকুন মেরে ফেলে, তবে তার ওপর জরিমানা হিসেবে ‘এক সদকাতুল ফিতর’ সমপরিমাণ মূল্য দান করা ওয়াজিব হবে। এক্ষেত্রে ‘দম’ বা পশু কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব হয় না।
সদকা প্রদানের স্থান: এই জরিমানার সদকা হারামের এলাকার (মক্কা) গরিবদের দেওয়া উত্তম। তবে কেউ দেশে ফিরে আসার পর মায়ালাটি জানতে পারলে নিজ দেশের গরিব-মিসকিনদের দিলেও তা আদায় হয়ে যাবে।
(সূত্র: আল মুহিতুল বুরহানি: ৩/৪২০; ফাতহুল কাদির: ৩/১৬; হিন্দিয়া ১/২৫২; আদ্দুররুল মুখতার: ২/৫৪৩, ৫৫৮)

ইহরাম অবস্থায় উকুন মারা নিষিদ্ধ হওয়ার এই বিধান প্রমাণ করে- ইহরাম হলো ধৈর্য, সংযম ও সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ গড়ে তোলার এক অনন্য প্রশিক্ষণ। একই সঙ্গে ইসলাম অত্যন্ত বাস্তববাদী ধর্ম বিধায় মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা বা ফিদইয়ার সুযোগ রেখেছে। মূলত এই সূক্ষ্ম বিধানগুলো পালনের মাধ্যমেই একজন হাজি তাঁর চূড়ান্ত আত্মসংযমের শিক্ষা লাভ করেন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর