সাম্প্রতিক শীত মৌসুমে বৃষ্টিপাতের ফলে সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চল ঘাস ও বুনো ফুলে ছেয়ে গেছে। মক্কা ও মদিনার চিরচেনা রুক্ষ ও ধূসর রূপ যেন অস্থায়ীভাবে পাল্টে গেছে গত কয়েক সপ্তাহে। তবে বিজ্ঞানীরা এই মনোরম দৃশ্যকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হওয়া ‘মৌসুমি প্রস্ফুটন’ (Seasonal Blooming) বলে বর্ণনা করছেন, যা স্থায়ী কোনো পরিবর্তন নয়।
যেসব অঞ্চলে সবুজায়ন ঘটেছে
জানুয়ারি ২০২৬-এর শুরু থেকেই দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছবিতে দেখা যাচ্ছে দিগন্তজোড়া সবুজের চাদর। বিশেষ করে নিচের অঞ্চলগুলোতে পরিবর্তন সবচেয়ে লক্ষণীয়।
মক্কা প্রদেশ: পবিত্র মক্কা নগরীর পূর্ব দিকের পাহাড় এবং উপকূলীয় কুনফুদাহ (Al Qunfudhah) ও আল-লাইথ অঞ্চলের উপত্যকাগুলো এখন সবুজ গালিচায় মোড়ানো।
মদিনা ও উত্তরাঞ্চল: মদিনার মরুভূমি এবং উত্তরের রাফহা (Rafha) ও আরার (Arar) অঞ্চলে ল্যাভেন্ডার ও অন্যান্য বুনো ফুলের সমারোহ দেখা যাচ্ছে, যা মরুভূমির রং বদলে দিয়েছে।
আসির ও জাজান: প্রাকৃতিকভাবে সবুজ এই অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টির মাত্রা বাড়ার ফলে প্রকৃতি আরও সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কেয়ামতের যেসব আলামত সৌদি আরবে প্রকাশ পাবে
বৃষ্টিপাত ও পরিসংখ্যানের খতিয়ান
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতকে দায়ী করছেন।
বৃষ্টিপাতের রেকর্ড: দেশটির আবহাওয়া দপ্তরের (NCM) তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে শীতকালীন বৃষ্টিপাতের হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। নাসা (NASA)-র স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এই সময়ে পশ্চিম সৌদি আরবের কোনো কোনো স্থানে গড়ের চেয়ে প্রায় ২০০-৩০০% বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সরকারি উদ্যোগ: এর পাশাপাশি ‘সৌদি গ্রিন ইনিশিয়েটিভ’ (SGI)-এর আওতায় দেশজুড়ে ১০ বিলিয়ন গাছ লাগানোর উচ্চভিলাষী পরিকল্পনাও চলমান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের এই বিশাল সবুজায়ন মূলত প্রাকৃতিক বৃষ্টির ফল, মানবসৃষ্ট বনায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সামাজিক ও স্থানীয় প্রভাব
এই অপ্রত্যাশিত সবুজায়ন স্থানীয় জনজীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় বেদুইন সম্প্রদায়ের জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, কারণ তাদের পশুপালনের জন্য এখন প্রচুর চারণভূমি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, মরুভূমির এই নতুন রূপ দেখতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সবুজ সৌদি আরব’-এর ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, যা দেশটির পর্যটন খাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আরও পড়ুন: আরবের মরুভূমিতে বন্যা সম্পর্কে হাদিসে যা আছে
সতর্কতা ও বাস্তবতা: কেন এটি স্থায়ী নয়?
চোখ জুড়ানো এই দৃশ্য দেখে অনেকেই ভাবছেন সৌদি আরব হয়তো চিরস্থায়ীভাবে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। তবে পরিবেশবিদরা বাস্তবতা মনে করিয়ে দিচ্ছেন-
১. অস্থায়ী প্রকৃতি: এটি মূলত ঘাস ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গ্রীষ্মের প্রখর তাপ শুরু হলেই এই সবুজ রং হারিয়ে যাবে এবং মরুভূমি তার চিরাচরিত রুক্ষ রূপে ফিরে আসবে।
২. বিজ্ঞান ও বিশ্বাস: অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সেই হাদিসটি স্মরণ করছেন যেখানে বলা হয়েছে, ‘আরব ভূমি পুনরায় চারণভূমি ও নদীনালায় পরিণত হবে।’ তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক দীর্ঘমেয়াদী চক্রের (Weather Cycles) একটি অংশ। অতীতেও এই অঞ্চলে এমন আদ্র যুগ (Wet Period) এসেছিল।
এই বিষয়ে কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, ‘আমরা এখন এল নিনো এবং ভারত মহাসাগরের ডাইপোল (IOD)-এর প্রভাবে আরব উপদ্বীপে বেশি বৃষ্টিপাত দেখছি। এটি একটি চক্রাকারে ঘটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।’
ঈমানি ভাবনা ও নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী
বিজ্ঞানীরা এটিকে আবহাওয়ার চক্র বা জলবায়ু পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, মুমিনের হৃদয়ে এটি ১৪০০ বছর আগের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতাই নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছিলেন, ‘কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যতক্ষণ না আরব ভূমি পুনরায় চারণভূমি ও নদীনালায় পরিণত হয়।’ (সহিহ মুসলিম)
মক্কার পাহাড়ের এই সবুজায়ন মুমিনদের জন্য কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, বরং এটি আল্লাহর অসীম কুদরত এবং রাসুল (স.)-এর সত্যবাদিতার এক জীবন্ত নিদর্শন। ক্ষণস্থায়ী এই দৃশ্য মুমিনকে এই বার্তাই দেয় যে, মহান আল্লাহ যেমন মৃত ও শুষ্ক ভূমিকে বৃষ্টির মাধ্যমে জীবিত করতে পারেন, তেমনি তিনি পরকালেও মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন। তাই এই দৃশ্য মুমিনের ঈমান বৃদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ।
২০২৬ সালের এই শীতকাল সৌদি আরবের প্রাকৃতিক ইতিহাসে এক অস্থায়ী কিন্তু অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মক্কা-মদিনার এই সবুজ রূপ ক্ষণস্থায়ী হলেও, তা একদিকে প্রকৃতির অপার রহস্য, অন্যদিকে শেষ জামানার নির্দেশক হিসেবে মুমিনদের ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

