রাজধানীর মিরপুরে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী ওরফে পারভেজ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং এলাকায় প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার বিরোধই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনায় এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নামও এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইতোমধ্যে থানা ও গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি কয়েক দিন আগে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ভাড়াটে হত্যাকারীদের ঢাকায় এনে টার্গেটকে অনুসরণ করার পর পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলেও তদন্তে তথ্য মিলেছে।
পুলিশ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে চারজনের নাম উল্লেখ করে নিহত যুবদল কর্মী ইউসুফ আলীর বড় ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে শনিবার (২৫ জুলাই) কাফরুল থানায় মামলা করেছেন। এতে পুলিশের কাছে আটক চঞ্চল মোল্লাসহ চারজনের নাম উল্লেখ এবং ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি জড়িতদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া চঞ্চল ঝিনাইদহ থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য অন্যান্য আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার নেপথ্য, পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানায়, মূলত আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জমি ও ডিশ লাইনের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে শত্রুতা দেখা দেয়। মূলত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে এ ঘটনাগুলো কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আরও পড়ুন
দুই হাত কেটে বিএনপি কর্মী পলাশকে নৃশংস হত্যা, নেপথ্যে কী
আদাবরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, নেপথ্যে দলীয় কোন্দল
শুক্রবারের (২৪ জুলাই) ওই ঘটনার পর রাতে স্থানীয় জনতা শুটার চঞ্চলকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করে। পরে শনিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে আরেক শুটার জিয়ারুল হক মোল্লা ও তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে। এছাড়াও শুটার জিয়ারুল হক মোল্লা জিয়ার সহায়তাকারী নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান, সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহম্মেদ ও আলী হোসেনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে নাহিদ পিস্তলটি অন্য একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে শুটারকে দেন বলে জানিয়েছেন। সাফিন ও আলী ঘটনাস্থল রেকিসহ সার্বিক বিষয়ে শুটারদের সহযোগিতা করেন।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড
শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাফরুল থানার মিরপুর-১৩ নম্বর ই-ব্লকের ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে অজ্ঞাত পরিচয় চার থেকে পাঁচজন দুর্বৃত্ত ইউসুফ আলীসহ কয়েকজনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ইউসুফ আলীর বুকের ডান পাশে গুলি লাগার পর দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ নালাম সরদার ও মনির হোসেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, নালাম সরদারের মাথার ডান পাশে এবং মনির হোসেনের বাম পায়ে গুলি লেগেছে।
মালার এজাহারে বলা হয়, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে তার ছোট ভাই ইউসুফের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রাতে ইউসুফ অন্যদের সঙ্গে ওপেক্স গার্মেন্টের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করছিলেন। এ সময় বিবাদীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থলে এসে গুলি করলে ইউসুফের বুকের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। এ সময় অন্য আসামিরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে পাশে থাকা সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। নালামের মাথার ডান পাশে ও মনিরের ডান পায়ে গুলি লাগে।
নিহত ইউসুফের ভাই সুমন বেপারী ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ভাই ইউসুফ অবিবাহিত। মূলত রাজনীতি নিয়েই পড়ে থাকত। চার ভাইবোনের মধ্যে ছোট ছিল সে। কীভাবে কী হয়ে গেল তা নিয়ে আমরাও আতঙ্কে আছি।
সুমন বেপারী জানান, ময়নাতদন্ত শেষে কাফরুলে জানাজার পর তার ভাইয়ের মরদেহ দাফনের জন্য বরিশালের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
যুবদল নেতা বাবু'র বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের ঘটনায় কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর নাম সামনে আসছে। তার বিরুদ্ধে
স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতাকর্মী নানা অভিযোগ করেছেন। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখল, গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি শুরু করেন হাফিজুল ইসলাম বাবু। এর মধ্যে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগ নেতা ডিএসপি বাবুর তিনটি টিনশেড বাড়িও তিনি দখল করেন।
এছাড়াও মিরপুর ১৩ নম্বরের বিজয় রাকিন সিটির অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, বাবু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাকিন সিটির তিনটি ভবনে ২৫টি ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন। এছাড়া একটি ফ্ল্যাট দখলে নিয়ে নিজে মালিক সেজেছেন। এমন নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে। নিহত পারভেজ বাবুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মূল টার্গেট মূলত হাফিজুর রহমান বাবুই ছিলেন।
আরও পড়ুন
মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই মিশন, বাড়ছে আতঙ্ক!
মোহাম্মদপুরে আসাদুল হত্যা: নেপথ্যে মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব
তবে হাফিজুল ইসলাম বাবু নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমরা ১৭-১৮ বছর এলাকার বাইরে ছিলাম। ফলে দখলের সুযোগ ছিল না। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ডিএসপি বাবুর তিনটি টিনশেড বাড়ি দখলের বিষয়টি সত্য নয়। সরকারি ও মালিকানা জমি দখল করে বাড়িগুলো করা হয়েছিল, যা ৫ আগস্টের পরে জমির মালিকরা পুনরুদ্ধার করেছেন।
যুবদল নেতা বলেন, ভাষানটেক থানা বিএনপির এক নেতার স্ত্রীর জানাজা শেষে প্রতিদিনের মতো এলাকায় পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এ সময় একটি ক্যাপ পরা যুবকের চলাফেরা সন্দেহজনক মনে হলেও প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। পরে নিহত ইউসুফ আমাকে ফোন করে রাস্তার অপর পাশে অবস্থান নেওয়া তিন যুবকের বিষয়ে জানতে চায়। ইউসুফ আমাকে ফোনে জানায়, ওই তিনজনের গতিবিধি দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল সে। তাদের আচরণ সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। পরে কয়েকজন তাদের পরিচয় জানতে চাইলে একজন কোমর থেকে অস্ত্র বের করার চেষ্টা করে। তখন ইউসুফ তাকে জাপটে ধরলে হামলাকারীরা গুলি চালায়। এতে ইউসুফের বুকে গুলি লাগে। একই সময় ছোড়া আরেকটি গুলিতে পথচারীরা আহত হয়।
বাবু আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা ব্যক্তির মাধ্যমে পুরো ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে। আটক ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদে হাফিজ নামের একজনের কথা বলেছেন। নাম বলা এ হাফিজ কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ। তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হবে।
খুনিদের আনা হয় ভাড়া করে
এ ঘটনায় সরাসরি খুনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ভাড়া করে আনা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। গুলির ঘটনার পর স্থানীয়রা চঞ্চল নামে এক যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর গ্রেফতার হওয়া চারজনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ ও মাগুরা এলাকায় বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন
সোহাগ হত্যা: এক বছরেও শুরু হয়নি বিচার, নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
সেদিন পাথরে মাথা থেঁতলে দেওয়ার আগে-পরে কী ঘটেছিল সোহাগের সঙ্গে?
ঘটনাস্থল থেকে আটক চঞ্চল মোল্লার বাবার নাম আতিয়ার মোল্লা। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রাড়ীপাড়ায়। এছাড়া জিহাদ মোল্লার বাবার নাম মৃত রওশন আলী মোল্লা। তার বাড়ি কালীগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুরে। জিয়ারুল মোল্লার বাবার নাম আনোয়ার পাটোয়ারী। তার বাড়ি মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়ায়। আরেক আসামির নাম হাসান।
এ বিষয়ে মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার ঢাকা মেইলকে বলেন, কাফরুলে গুলির ঘটনায় মামলা হয়েছে। চঞ্চল নামে একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে ঝিনাইদহ থেকে এসেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বিস্তারিত আরও জানা যাবে। পুলিশসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে কাজ করছে।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর তারা জানিয়েছেন, তারা ঢাকায় হত্যার কাজে এসেছেন। তাদের বাড়ি ঝিনাইদহ ও মাগুরা এলাকায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। ঘটনার সঙ্গে যে জড়িত থাকবে তাকে আমরা আইনের আওতায় আনা হবে।
একেএস/জেবি




