- মামলার ২৪ আসামির মধ্যে ৪ জনকে অব্যাহতি
- মামলা তুলে নিতে পরিবারের সদস্যদের হুমকি
- বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় সমাজে অপরাধ বাড়ছে: বিশেষজ্ঞ
রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিনের আলোয় ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যার ভয়াবহ ভিডিও এক বছর আগে নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ওঠে দ্রুত বিচারের দাবি। তবে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়লেও এক বছরেও শুরু হয়নি বিচার। মামলাটি এখনো অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আটকে রয়েছে। এ অবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে বিচার বিলম্বের সুযোগে মামলার বাদী ও নিহত সোহাগের পরিবারের সদস্যদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালের ৯ জুলাই বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়। মামলায় ২০ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও আটজন এখনো পলাতক। তবে সোহাগের পরিবারের দাবি, পলাতক কয়েকজন আসামি সম্প্রতি সংসদ নির্বাচনের পর এলাকায় ফিরে এসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্নভাবে মামলা তুলে নিতে পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছেন।
বিচারের জন্য মামলা স্থানান্তর
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও আসামিদের নাম-পরিচয়সহ কিছু বানান ও তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ে। পরে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। অধিকতর তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের জুনে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হলে আদালত সেটি গ্রহণ করেন। পরে ২১ জুন মামলাটি ঢাকার মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলাটি অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। আগামী রোববার (১২ জুলাই) ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ গঠনের পরই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।
সোহাগ হত্যাকাণ্ড মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জিয়াউল হক। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, মামলাটি বর্তমানে বিচারিক আদালতে রয়েছে। তবে এখনো বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।
সোহাগের পরিবারের অভিযোগ
নিহত সোহাগের ভাগ্নি ও মামলার বাদীর মেয়ে বিথী ঢাকা মেইলকে বলেন, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শারাফাত নামে এক পলাতক আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি নিয়মিত আমাদের পরিবারকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। এ ছাড়া ইমরান নামে এক ব্যক্তি শুরু থেকেই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও তাঁর বাবার নাম ও বয়স পরিবর্তন করে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতির পর তিনি পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করছেন এবং এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি আমাদের বলেন, সোহাগকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমাদেরও একইভাবে হত্যা করা হবে।
তিনি বলেন, মামলার ২ নম্বর আসামি টিটু এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। সে নিয়মিত অনলাইনে ফোন করে আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয় এবং এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। একজন হত্যা মামলার আসামি কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়?
তিনি আরও বলেন, এক বছরেও মামলার বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। এটি পুলিশের ব্যর্থতা, অবহেলা নাকি অন্য কোনো কারণে হচ্ছে, তা আমাদের ধারণা নেই। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে আমাদের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
বাবাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় নিহত সোহাগের ছেলে মো. সোহান ঢাকা মেইলকে বলেন, বাবাকে হত্যার এক বছর পার হলেও মামলার দুই নম্বর আসামি টিটুকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। সে অনলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমরা চাই, দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।
এ ছাড়া নিহত সোহাগের মেয়ে মোসা. সোহানা ঢাকা মেইলকে বলেন, বাবার মৃত্যুর এক বছর হয়ে গেলেও আমরা এখনো বিচার পাইনি। আমরা আমাদের বাবার হত্যার বিচার চাই।
বিশেষজ্ঞদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা থাকলে সুষ্ঠু বিচার পেতে ভুক্তভোগী পরিবারকে ধাপে ধাপে ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। এ ছাড়া এমন নির্মম ঘটনার পর দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা গেলে সমাজে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, একটি হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীরা ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দেওয়ার সুযোগ পায়। আবার অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নিতে মারধরসহ নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণেই এসব ঘটনার সুযোগ তৈরি হয়। বিচার দ্রুত শেষ হলে সমাজে এ ধরনের অপরাধও কমে আসবে।
একেএস/এআর




