- চামুরাই হাতে প্রকাশ্যে কোপায় সন্ত্রাসীরা
- খোঁজ মেলেনি কেটে নেওয়া দুই কবজির
- চুরি-চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ড
- সিসিটিভি দেখে চারজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ
- ৫ মাস আগে বিয়ে করেন পলাশ, স্ত্রীর আহাজারি
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, এরপর দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে উধাও সন্ত্রাসীরা। সবুজবাগে বিএনপি কর্মী ইব্রাহীম পলাশ হত্যাকাণ্ডের এই নৃশংসতা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ঘটনার একদিন পেরিয়ে গেলেও তার বিচ্ছিন্ন দুই হাত উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পূর্ব শত্রুতা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং চুরি-চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়াকেই কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, রিকশা চুরির ঘটনা নিয়ে মূলত এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ‘কিডনি পচা সবুজ’ নামে এক কিশোর গ্যাং লিডার বাসাবো কলোনি থেকে একটি রিকশা চুরি করে। মালিকরা রিকশা ও চোরকে খুঁজছিলেন। এ বিষয় নিহত পলাশের কাছে বিচার দেন রিকশার মালিকরা। এছাড়াও, কিছুদিন আগে বাগপাড়া হিজরা বিল্ডিংয়ের পাশ থেকে রসুলের গ্যারেজে ঢুকে মিস্ত্রীকে মারধর করে চাঁদা চায় ‘কিডনি পচা সবুজ’। এসব ঘটনায় সবুজকে জিজ্ঞেস করলে কিশোর গ্যাং লিডার রয়েল ‘কিডনি পচা সবুজের’ হয়ে পলাশকে খুঁজতে বের হয়। বিষয়টি নিয়ে তিন চার দিন আগে রয়েলের বাসায় পলাশ কথা বলতে গেলে তার ওপর হামলা করা হয়। মঙ্গলবার রাতে মোবাইল চুরির কারণে সবুজবাগ এলাকার শীর্ষ মোবাইল চোর হিসেবে পরিচিত 'দুখু'কে স্থানীয়রা আটক করে। পলাশ বিষয়টি মীমাংসা করছিলেন। এমন খবর শুনে রয়েল, গুরুদাস, সবুজ ও শফিক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আকস্মিক হামলা করে। তাকে কুপিয়ে হত্যার পর দুই হাতের কবজি কেটে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রয়েল ও গুরুদাসকে সবুজবাগ এলাকায় শেল্টার দেন ইলিয়াস বাবু ওরফে ভিডিও বাবু। তার বাসায় বসেই মূলত পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহত পলাশের মাথায়, ঘাড়ে, বুকে, কোমরে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং হাত দুটি কব্জি থেকে বিচ্ছিন্ন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
স্বজনদের আহাজারি ও বিচার দাবি
নিহত পলাশের বড় বোন জোৎস্না বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গতকাল (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমার ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে আমার বাসা থেকে আমার মেয়ের জন্য মাদরাসায় খাবার পৌঁছে দিতে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় আমার মেয়েকে বলেছিল, ‘মামা, আমি একটু কালীবাড়ি যাব। ফিরতে দেরি হবে, তুমি খেয়ে নিও।’ আমার ভাই আমার মেয়েকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসত। আমার মেয়ে নন্দীপাড়া ৬ নম্বর রোডের একটি মহিলা মাদরাসায় পড়াশোনা করে।’
আরও পড়ুন
আদাবরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, নেপথ্যে দলীয় কোন্দল
সোহাগ হত্যা: এক বছরেও শুরু হয়নি বিচার, নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
জোৎস্না বলেন, ‘রাতে হঠাৎ খবর পাই, দুর্বৃত্তরা আমার ভাইকে কুপিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। কী নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে! তার দুটি হাত কেটে নেওয়া হয়েছে। মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেছিল। ধীরে ধীরে সংসার গুছিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে বাঁচতে দিল না। কয়েক দিন আগেই আমি তাকে এক লাখ টাকা দিয়েছিলাম, সেই টাকা দিয়ে সে একটি মোটরসাইকেল কিনেছিল। আমরা দুই ভাই ও দুই বোন। ভাইবোনদের মধ্যে পলাশ ছিল তৃতীয়।’
নিহত পলাশের স্ত্রী মরিয়ম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মাত্র তিন দিনের পরিচয়ে আমি তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করি। পাঁচ মাস আগে আমাদের সংসার শুরু হয়েছিল। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু জীবনসঙ্গীকে নিয়ে সংসারটা আর গুছিয়ে তোলা হলো না। আমি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, এই মাসেই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু এর আগেই সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করল। এ শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এখন আমাকে আর কে এভাবে ভালোবাসবে? আমার তো সব শেষ হয়ে গেল।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে সে খাওয়া-দাওয়া করে বাসা থেকে বের হয়। আমি একটি টিউশনি করাই। টিউশনির টাকা আনতে তাকে না বলেই বের হয়ে গিয়েছিলাম। পরে সে আমাকে ফোন করেছিল, কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। বাসায় ফিরে তাকে একটি মেসেজ দিই—‘তোমাকে না বলে চলে গেছি, আর কখনো এমন হবে না। সরি।’ সে মেসেজটি দেখেছিল, কিন্তু আর কোনো উত্তর দেয়নি।’
মরিয়ম বলেন, ‘রাত আটটা থেকে সোয়া আটটার মধ্যে একজন এসে আমাদের জানায়, পলাশ ভাইকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে গেছে। খবর পেয়ে আমরা প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানে জানতে পারি, তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ভালোবাসার মানুষটি আর বেঁচে নেই। কী নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে! তার দুটি হাত কেটে নেওয়া হয়েছে। আমি শুধু আমার স্বামী হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
যেভাবে হত্যা করা হয় পলাশকে
একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৫ জুলাই (বুধবার) একটি রিকশা গ্যারেজে কয়েকজন যুবক এসে সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, রিকশা গ্যারেজের ম্যানেজারের কাছে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে রয়েল, সবুজ ও শফিক নামের তিন ব্যক্তি ওই হামলা চালায়।
এদিকে, ২১ জুলাই পলাশ হত্যাকাণ্ডের দিন ধারণ করা আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজেও হামলার কিছু চিত্র ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, রাত ৮টা ১০ মিনিটে স্থানীয় কয়েকজন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্র সামুরাই নিয়ে দৌড়ে এসে প্রকাশ্যেই একজনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন
মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই মিশন, বাড়ছে আতঙ্ক!
অপরাধীদের হাতে ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’, নতুন শঙ্কা
স্থানীয়দের দাবি, হামলাকারী ব্যক্তি এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ রয়েল। তিনি সামুরাই দিয়ে পলাশকে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হামলার আগে রয়েলের সঙ্গে থাকা কয়েকজন এসে পলাশকে শনাক্ত করে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর ‘ক্লিয়ারেন্স’ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রয়েল ঘটনাস্থলে এসে প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করেন।
ঘটনার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সবুজবাগের রাজারবাগ বাজারের পানির পাম্পসংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে পলাশকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তার একটি হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চারজন শনাক্ত, গ্রেফতারের চেষ্টায় পুলিশ
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, গতকাল ইব্রাহিম পলাশ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার দুটি হাত কেটে নেওয়া হয়। পরে আমরা সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে তার মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠাই। তবে, তার কেটে নেওয়া দুটি হাত আমরা এখনো উদ্ধার করতে পারিনি।
ওসি বলেন, রয়েল নামে এক ব্যক্তি নিহত পলাশের সাথে চলাফেরা করতো। তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে ঝগড়া হয়। পরে এটা নিয়ে হাতাহাতির একপর্যায়ে রয়েলের মায়ের গায়ে হাত লাগে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েলসহ বেশ কয়েকজন মিলে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। আমরা সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত চারজনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। আসামিদের গ্রেফতার করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
একেএস/জেবি




