শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

মোহাম্মদপুরে আসাদুল হত্যা: নেপথ্যে মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব

একে সালমান
প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

মোহাম্মদপুরে আসাদুল হত্যা:  নেপথ্যে মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব
আসাদুল হক। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় আসাদুল ইসলাম ওরফে লম্বু আসাদুলকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। ঘটনার পর থেকে পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছে বন্ধুত্ব, মাদক কারবার ও পূর্বশত্রুতার জটিল সমীকরণ।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব ও পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।


বিজ্ঞাপন


গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দিবাগত রাতে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক খান পাম্পসংলগ্ন ইটখোলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আসাদুল স্থানীয়ভাবে মাদক কারবার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, নিহতের পরিবার ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক আক্কেল আলীর নেতৃত্বে আক্তার, মুন্না, নয়ন ও মিরাজকে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া র‍্যাব-২ পৃথক অভিযানে প্রধান সন্দেহভাজন আসদুল ও শাওনকে গ্রেফতার করে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকা কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবার হটস্পট হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে এ এলাকার নেকাব খান রোড, আজিজ খান রোড, ক্যানসার গলি, বোর্ড ঘাট, সাদেক খান ইটখোলা, রায়েরবাজার কাঁচাবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকা জুড়ে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। এসব মাদক সাম্রাজ্য ধরে রাখতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কিশোর গ্যাং বাহিনী গড়ে তুলেছে। এলাকা জুড়ে থাকা ভয়ঙ্কর কিশোর গ্যাং সদস্যরা প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম কিংবা হত্যা করছে। তারা দিনের বেলায় এক পেশা, রাতে আরেক পেশার রূপ ধারণ করে। এদের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু কিছু লোকের যোগাযোগ থাকায় অপরাধ করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।


বিজ্ঞাপন


আসাদুল হত্যা নিয়ে যা বলছে পরিবার:

বুধবার (১৫ এপ্রিল) দিবাগত রাতে ১২টার পর রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ সাদেক খান পাম্পের পাশে ইটখোলা এলাকায় কুপিয়ে ও বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় আসাদুল ইসলাম ওরফে লম্বু আসাদুলকে। এ ঘটনায় তার পরিবারের দাবি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে।

আসাদুল ইসলামের বাবা আব্দুল জলিল ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ছেলে প্রায় এক মাস যাবৎ বাসা থেকে বের হতো না। কেমন যেন একটা ভয়ে থাকত। তাকে বিয়ে করানোর পর এক বছরের বাচ্চা রেখে তার স্ত্রী ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে সেই বাচ্চা আমরা লালন-পালন করে বড় করি। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে সে ভিন্ন রকম হয়ে গেছে।

asad
এ ঘটনায় মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

তাকে যেদিন হত্যা করা হয়, ওই দিন রাতে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অলিল তাকে বাসা থেকে ফোনে ডেকে নিয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর আমি আসাদুলকে ফোন দিই। সে তখন আমাকে বলে, আমার আসতে একটু দেরি হবে। এর ঠিক ২-৩ ঘণ্টা পর আমরা খবর পাই, আসাদুলকে কারা যেন কুপিয়ে রেখে গেছে। আমরা ভয়ে সেখানে যেতে পারিনি, যদি আমাদের ওপর আবার আক্রমণ করে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই জড়িত। কিভাবে বন্ধুরা মিলে আমার ছেলেকে হত্যা করল, আমি এর বিচার চাই।

আসাদুলের বোন জান্নাতুল ফেরদৌসী প্রিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ভাই বাসায় ছিল। তার বন্ধু অলিল প্রথমে আমার ভাইকে ফোন দিয়ে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর আমার ভাইকে তারা হত্যা করে। এর আগে ওসমান, আক্তার—এরা আমার ভাইকে মাদক বিক্রির জন্য বলত। কারণ, সে মাঝেমধ্যে মাদক সেবন করত। এ নিয়ে আমার ভাইয়ের সঙ্গে ওসমানের বেশ কয়েকবার বাকবিতণ্ডা হয়। মাদক বিক্রি না করায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে আমার ভাইকে তারা হত্যা করে।

তবে নিহত আসাদুলের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় এক ছোট ভাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, আসাদুল ভাইকে স্থানীয় যুবদল নেতা ওসমান, আক্তার মাদক বিক্রির জন্য বলত। এ নিয়ে আক্তার ও ওসমানের সঙ্গে গত বছরের জুলাই মাসে মারামারি হয়। তখন আক্তারের গ্রুপের একজনকে আসাদুল ভাই কুপিয়ে আহত করে। সে সময়ের পর থেকে আসাদুল ভাইকে তারা টার্গেটে রেখেছে। প্রায় সময় তাকে হুমকি দিত।

তিনি আরও বলেন, ওই দিন রাতে আসাদুল ভাইকে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অলিল প্রথমে ইটখোলায় ডেকে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে মোটরসাইকেলে করে আরও চার থেকে পাঁচজন এসে যোগ দিয়ে তাকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে।

এদিকে, আসাদুল হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, আসাদুলের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক মাদক ও ছিনতাই মামলা রয়েছে। সে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সাদেক খান পাম্প এলাকায় একটি কিশোর গ্যাং বাহিনী চার্লি গ্রুপের মূলহোতা। তার নেতৃত্বে বেড়িবাঁধ এলাকায় মাদক বিক্রি ও ছিনতাই করা হতো। এর আগে স্থানীয় আরেক কিশোর গ্যাং লিডার আক্তার আসাদুলের কাছ থেকে কোনো টাকা না দিয়ে মাদক নিয়ে যেত। এ নিয়ে আসাদুল, আক্তার ও ওসমানের মধ্যে মারামারি হয়। ওই সময় আসাদুল বাহিনী আক্তার গ্রুপের সদস্যদের একজনকে কুপিয়ে আহত করে। এ ঘটনার পর থেকে তাদের মধ্যে পূর্বশত্রুতা শুরু হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসাদুলকে হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বলেন, আসাদুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আইনানুগ ব্যবস্থা শেষে আদালতে পাঠানো হবে।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় নিহত আসাদুল ওরফে লম্বু আসাদুলের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মাদক ও ছিনতাইয়ের একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা সব বিষয় তদন্ত করে দেখব।

একেএস/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর