মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই মিশন, বাড়ছে আতঙ্ক!

একে সালমান
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই মিশন, বাড়ছে আতঙ্ক
মোহাম্মদপুরে মিনিটেই শেষ হয় ছিনতাই মিশন। ছবি: নোটবুকএলএম
  • দল বেঁধে এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় সব
  • পোশাকে লুকিয়ে রাখে দেশীয় ধারালো অস্ত্র
  • এক মাসে ডিএমপিতে ২ হাজার ৮৪৪ জন গ্রেফতার, মোহাম্মদপুরেই ৬৫০ জন

রাজধানীর অন্যতম আবাসিক এলাকা মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযান চললেও এলাকাটিতে সংঘবদ্ধ অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, বসিলা, টাউন হল, আদাবর-সংলগ্ন অংশ এবং বিভিন্ন বস্তিতে অপরাধীদের সক্রিয়তা বেশি। গত এক মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানাতেই গ্রেফতার হয়েছে ৬৫০ জন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে একাধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। এসব চক্রের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। একাধিক ক্ষেত্রে মূল চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছিনতাইকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় বলেও দাবি স্থানীয়দের।

মোহাম্মদপুর থানার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন ঘটনায় ৮৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৪ জন, কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট ডাকাতির ঘটনায় ৩২ জন, দস্যুতার ঘটনায় ৭ জন এবং মাদক মামলায় ৩০ জনসহ মোট ৬৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

‎‎যেভাবে ঘটে কয়েক মিনিটের ছিনতাই মিশন


বিজ্ঞাপন


‎১১ মে বিকেলে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিদ্দিক শ্রেষ্ঠ কোচিং শেষ করে রিকশাযোগে বাসায় ফিরছিলেন। মোহাম্মদপুর চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকার ১ নম্বর গেটের সামনে পৌঁছালে কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তি হঠাৎ রিকশার সামনে এসে দাঁড়ায়। এতে রিকশার চাকা তার গায়ে লাগলে তিনি যাত্রীকে গালাগালি শুরু করেন। এ সময় আশপাশে আগে থেকেই অবস্থান করা মুখে মাস্ক পরা আরও চারজন সেখানে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে দুইজন রিকশায় উঠে ধারালো ছুরি দেখিয়ে যাত্রীকে ভয় দেখায় এবং তার মোবাইল ফোন, টাকা ও মানিব্যাগ কয়েক মিনিটের মধ্যে ছিনিয়ে নেয়। পরে তারা ব্যাগ তল্লাশি করে এনআইডি কার্ড, ব্যাংকের এটিএম কার্ডসহ সবকিছু নিয়ে নেয়। দিনের আলোতে প্রকাশ্যে এমন ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রকাশ্যে এমন ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।‎

আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের ৭ সদস্য গ্রেফতার

‎এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১১ মে বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিট ৪ সেকেন্ড থেকে ৫টা ৩৮ মিনিট ২১ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ঘটনাটি ঘটে। ১ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে ছিনতাইকারীদের এমন মিশন সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়। ওই সময়ের মধ্যেই সব ছিনিয়ে নেওয়ার পর ওই যুবকের মোবাইলের পাসওয়ার্ড খুলে তা জেনে নেয়।

pic-‎‎

এর আগে, ১৫ এপ্রিল (বুধবার) ভোর রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে নূরজাহান রোডে বাসার গেটে গেট খোলার অপেক্ষায় থাকা অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের শিকার হন জুলাই জাদুঘরের ফটোগ্রাফার সাঈদ হাসান তানিম। এ সময় ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন, ম্যাকবুক এম৪ প্রো ল্যাপটপ, সনি এফএক্স৩ ক্যামেরা ও লেন্সসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। প্রায় ২ মাস পার হলেও এ ঘটনায় এখনো আসামি গ্রেফতার বা কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

‎‎এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ এপ্রিল রাত ৩টা ৩৯ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে একটি মোটরসাইকেলে করে তিন ছিনতাইকারী আসে। এসেই বাড়ির গেট খোলার অপেক্ষায় থাকা যুবককে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ৩টা ৪০ মিনিট ৩ সেকেন্ডে মাত্র ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেয় চক্রের সদস্যরা।

‎গত ৩ জুন (বুধবার) আরেক ঘটনায় বিকেল ৪টায় চাঁদ উদ্যান লাউতলা এলাকায় কয়েকজন কিশোর সংঘবদ্ধ হয়ে গণছিনতাই করে। এ সময় রিকশায়, সিএনজিতে করে আসা পথচারীদের সবকিছু ছিনিয়ে নেয়। এ ছিনতাই গ্রুপের নেতৃত্ব দেওয়া সবাই বয়সে এখনো শিশু। এ গণছিনতাইয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরে পুলিশের ওপর ছিনতাইকারীদের হামলা, পাল্টা গুলি

‎‎গণছিনতাইয়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৩ জুন বিকেল ৪টা ৫৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে পাঁচ কিশোর গ্যাং সদস্য স্বাভাবিকভাবে হেঁটে এসে প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে রাখা দেশীয় ধারালো অস্ত্র বের করে ছিনতাই শুরু করে। এরপর ৪টা ৫৯ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে তারা ছিনতাই শেষ করে পালিয়ে যায়। মাত্র ৩৬ সেকেন্ডের এ ঘটনায় আশপাশে থাকা ৪-৫টি রিকশা ও ২-৩ জন পথচারীর সবকিছু ছিনিয়ে নেয়।

‎মোহাম্মদপুরে শুধু এ তিনটি ঘটনা নয়। গত ৩ মাসে অন্তত ৬০টির বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কেউ সব হারিয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, কেউ নীরবে মেনে নিয়েছেন।

‎‎এসব ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগের তীর প্রশাসনের দিকে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অপরাধীদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার—এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে দিন দিন মোহাম্মদপুর এলাকায় অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলছে।

‎‎মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা আতঙ্কিত

‎স্থানীয় বাসিন্দা ও সংগঠক পারভেজ হাসান সুমন বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার মতো নয়। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা সবাই আতঙ্কিত। আমি দায়ী করব এ এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। আমরা দেখেছি মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যকে ক্লোজ করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের পর সমঝোতার মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে আঁতাত করত। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা কাঠামো দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।

pic-
গত বছর মোহাম্মদপুরে ছিনতাই করতে এসে গণপিটুনিতে যুবক নিহত হয়।

‎‎তিনি আরও বলেন, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক কিশোর গ্যাং চক্র। এসব চক্র রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়। তবে অনেক সময় রাজনৈতিক নেতারা চাপে পড়ে তাদের নির্দেশে অপরাধীদের ধরিয়ে দিয়ে নিজেরা আড়ালে থাকেন। এছাড়া এসব চক্রের প্রধানরা কখনো গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলে ছোট ছোট গ্রুপ হয়ে ছিনতাইকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নেয়।

‎‎স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক সেকান্দার আলী বলেন, মোহাম্মদপুরে বসবাস করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আতঙ্কে থাকি। আমাদের সন্তানরা স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময় সবসময় ঝুঁকিতে থাকে।

‎‎ডিএমপির পরিসংখ্যানে অপরাধ দমন:

‎ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ১ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী, দস্যু ও মাদক কারবারিসহ ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫৪ জন চাঁদাবাজ, ৯৭১ জন ছিনতাইকারী-সন্ত্রাসী-দস্যু এবং ১ হাজার ২১৫ জন মাদক কারবারি রয়েছে। এ সময় ৭৪৪ কেজি গাঁজা, ১ লাখ ৭৯ হাজার ইয়াবা, ৪০৫ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ২৮১ বোতল ফেনসিডিল, ২৯ গ্রাম আইসসহ বিভিন্ন মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন: ‎‎মোহাম্মদপুরে অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই: নারায়ণগঞ্জ থেকে মূলহোতা গ্রেফতার

অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে ছয়জন চীনা নাগরিকসহ মোট নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সময়ে ৫২৩টি মোবাইল ফোন, ২৯৩টি সিম কার্ড এবং ৪১টি যানবাহন উদ্ধার করা হয়।

মোহাম্মদপুর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনা:

‎‎গত ২ জুন (মঙ্গলবার) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধপ্রবণ মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে সরকার পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে এবং এই এলাকা বিশেষ নজরে রয়েছে।

‎‎তিনি বলেন, এখন বলা যায় এটি অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের পরিকল্পনা আছে। একটু সময় লাগবে। কারণ রাতারাতি এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে আমরা পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছি। ওই এলাকার জন্য আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে। যেহেতু মোহাম্মদপুর ঘনবসতিপূর্ণ এবং অধিবাসীদের মধ্যে অনেকেই নিম্নবিত্ত, তাই এখানে মাদকের বিস্তার তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব বিবেচনায় নিয়ে আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংস্কার করছি। সামনে আপনারা এর ফল দেখতে পাবেন।

‎‎বিশেষজ্ঞদের মত

‎‎সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি—ছিনতাই, সন্ত্রাস ও মাদক—জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। কোনো এলাকা যখন রেড জোনে পরিণত হয়, তখন যে ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে ধরনের জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর কারণ হতে পারে, গ্যাং বা অপরাধী চক্রগুলোর শেল্টারদাতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ বা প্রভাবশালী যোগসূত্র থাকা।

‎তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মোহাম্মদপুরসহ যেকোনো এলাকার অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে এখানে গড়ে ওঠা অপরাধীরা আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি চক্রে যুক্ত। গ্যাংগুলো শেল্টারদাতাদের আশ্রয়ে অপরাধ করে, আর সেই শেল্টারদাতারা অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের ছাড়িয়ে নেয়। এসব ঘটনায় দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।

‎‎একেএস/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর