রাজধানীর গুলিস্তানে একটি মার্কেটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থকরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যদিও দুই পক্ষেরই দাবি, তারা দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লড়ছেন। তবে এই সংঘাতের জেরে গত কয়েক দিন ধরেই পুরো গুলিস্তান এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্তক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উদ্ভুত পরিস্থিতির সূত্রপাত গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট ব্লক 'বি' নগর প্লাজার কর্তৃত্ব নেওয়াকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দুই বছর ধরে মার্কেটটি পরিচালনা করে আসছেন জামায়াতপন্থী কয়েকজন মালিক ও ব্যবসায়ী। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার তৎপরতা শুরু করেন বিএনপিপন্থীরা। এর মধ্যে জামায়াতপন্থীরা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে দুই পক্ষের রেষারেষি চরম আকার ধারণ করে।
জানা গেছে, মার্কেটের পরিচালনা কমিটির মেয়াদ না থাকা এবং উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনায় সমবায় আইন অনুযায়ী মালিক সমবায় সমিতির দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়োগ দেয় ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয়। পাশাপাশি সদস্যদের অংশগ্রহণে অতি দ্রুত একটি নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করতেও বলা হয় অন্তর্বর্তী কমিটিকে। কিন্তু কমিটি গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আইনিসহ নানা জটিলতা ও বাধায় কোনো নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি ওই কমিটি।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় অফিসার শাহাদাতুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তিন মাস হলেও কয়েক দিন আগে মার্কেটের দায়িত্ব বুঝে পেয়েছি। আমরা কাজ সবে শুরু করেছি। নির্বাচনের জন্য কিছুটা সময় লাগবে।’
মার্কেটে থমথমে পরিস্থিতি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ফুলবাড়ীয়া সুপার মার্কেট-২ মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। এগুলো হলো- ব্লক 'এ' সিটি প্লাজা, ব্লক 'বি' নগর প্লাজা ও ব্লক 'সি' জাকের সুপার মার্কেট। এর মধ্যে সিটি প্লাজা ও জাকের সুপার মার্কেট পরিচালিত হয় শ্রম অধিদফতরের নির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে। আর নগর প্লাজা পরিচালনা করে সমবায় অধিদফতরের নির্বাচিত কমিটি।
সরেজমিনে সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরের পর নগর প্লাজা ঘুরে দেখা যায়, মার্কেটের মূল ফটকে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। মার্কেটের ভেতরেও বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে।
মার্কেটের ডান পাশের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গেলেই এই প্রতিবেদনকের পরিচয় জানতে চান লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সিকিউরিটি গার্ড। পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে যেতে দেন তারা।
মার্কেটের অন্যান্য সিকিউরিটি গার্ডদের কড়া অবস্থান দেখা গেছে। মার্কেটের পঞ্চম তলায় দোকান মালিক সমবায় সমিতির কার্যালয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়টি তালাবদ্ধ।
জানতে চাইলে কার্যালয়টির বাইরে দায়িত্বে থাকা সিকিউরিটি গার্ড বাবলু বলেন, 'প্রশাসন তালা দিয়ে রেখেছেন। বাইরে যে ব্যানার, সেগুলোও তারাই টানিয়েছেন।'
কার্যালয়ের বাইরে দুটি ব্যানার টানানো। একটি ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয় কর্তৃক নিয়োগকৃত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির ও অনটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির। তবে এসব ব্যানারে কোনো নির্দেশনা বা বার্তা দেওয়া নেই।
মার্কেটের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন দোকানের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অনেকেই তাতে রাজি হননি। তবে কয়েকজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, মার্কেট পরিচালনা কমিটি নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে মামলাও হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি শঙ্কাজনক। তাই মার্কেটে সার্বক্ষণিক পুলিশও থাকছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, মার্কেটের কর্তৃত্ব নিতে বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থনদের মধ্য প্রতিযোগিতা চলছে। এ কারণে অনাহুত ঘটনা এড়াতে অনেক কাস্টমার মার্কেটটি এড়িয়েও চলছেন।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতন হলে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় একটি সাংগঠনিক কমিটির নেতা মো. সুমন ও হানিফ বাচ্চুর নেতৃত্বে একটি পক্ষ নগর প্লাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত ২৯ জুন পর্যন্ত এই পক্ষটি মালিক সমিতির কার্যালয়ও দখলে রাখে। কিন্তু ওইদিন কার্যালয়টির দখল নেয় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি। তবে জামায়াতপন্থীদের অভিযোগ, তাদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে কার্যালয়ের দখল নিয়েছেন মূলত বিএনপির লোকজন।
জামায়াতের স্থানীয় একটি সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি দাবি করা মো. সুমন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমরা মার্কেটের দায়িত্ব নিই। জামায়াত-বিএনপিসহ সব দলেরই দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী আছেন। আমরা সবাইকে নিয়ে মার্কেট পরিচালনা করছিলাম। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে দলটির নাম করে মার্কেট দখল করা চেষ্টা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগের দোসররা।’
এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘মার্কেট দখল করে এখন চাঁদাবাজি করছে দখলকারীরা। তারা মার্কেটে সার্বক্ষণিক ক্যাডার নিয়োজিত করে রেখেছে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে, ভয় দেখাচ্ছে- এ কারণে কেউ কথা বলছেন না।’
তবে 'মালিক ও ব্যবসায়ী' ব্যানারে গত সোমবার (৬ জুলাই) এক সংবাদ করে পাল্টা অভিযোগ এনেছেন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত সমিতির নেতারা। তারা সাবেক কাউন্সিল ও বিএনপি নেতা মো. মামুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত। সংবাদ সম্মেলনেও কাউন্সিল মানুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্যে মো. কামরুজ্জামান বলেন, মো. সুমন ও হানিফ বাচ্চু গংরা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী পরিচয়ে গত দুই বছর যাবত মার্কেটটিতে চাঁদাবাজি, অবৈধ দোকান নির্মাণ, জোরপূর্বক অনেক দোকান মালিককে দোকান থেকে উচ্ছেদ, স্থায়ী দোকানসমূহের সামনে ও ফুটপাতে অনেক দোকান বসানো লিফট মেরামত ও চালুর কথা বলে টাকা আদায়, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আদায়, ওয়াসা ও বিভিন্ন নামে ও খাতে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে। তবে বিএনপির নামে কোনো দখল বা চাঁদাবাজি হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, দোকান মালিকদের থেকে উত্তোলিত বিদ্যুৎ বিলের ৪০ লাখ, ওয়াসা বিল ২৮ লাখ টাকা এবং লিফট মেরামত ও চালুর কথা বলে ৩০ লক্ষ টাকা বিল পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করেছেন মো. সুমন ও হানিফ বাচ্চু গংরা। মার্কেটে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, মার্কেটকে ব্যবহার করে নিজস্ব রাজনৈতিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং সরকারি স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে রাজনৈতিক কালার দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা মার্কেটের দোকান মালিক ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা তীব্র প্রতিবাদ, নিন্দা ও ধিক্কার জানাই।
পরে কথা হলে অভিযোগের ব্যাপারে মো. সুমন বলেন, ‘এগুলো সবই মিথ্যা বানোয়াট। তারা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করেছেন। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ডাকতে আমাদের ওপর অভিযোগ তুলছেন।’
সুমন আরও বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার সরকারের আমলের অনিয়ম-দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্তরা এখন বিএনপির নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করছেন। আমরাও সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ ও তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেব।’
উত্তাপ ছড়াচ্ছে গুলিস্তানজুড়ে
রাজধানীর অন্যতম বড় বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তান। ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫টির বেশি স্থায়ী মার্কেট রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বিএনপি সমর্থক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে বলে জানা গেছে৷ এগুলোর মধ্যে নগর প্লাজা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ জামায়াতপন্থীদের হাতে ছিল বলে জানা যায়। সেটি এখন হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় সরব হয়ে উঠছেন স্থানীয় জামায়াতের সাংগঠনিক কমিটির নেতারা। এমনটাই দাবি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
গত শনিবার (৪ জুলাই) জামায়াতের একটি বিক্ষোভ মিছিলে বিএনপির স্থানীয় কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রোববার (৫ জুলাই) ফুলবাড়িয়া ফ্লাইওভারের নিচে জামায়াতের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
সেদিন দুপুরে ‘চাঁদাবাজ, দখলদার, সন্ত্রাসী প্রতিরোধ কমিটি’র ব্যানারে গুলিস্তানে এই বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। ওই মিছিলে অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়।
জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুল সাত্তার সুমন অভিযোগ করে বলেন, ‘চাঁদাবাজরা বেশ কয়েক দিন ধরেই জামায়াত সমর্থিত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে আসছিল। এই চাঁদাবাজির প্রতিবাদেই একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কিছু সন্ত্রাসী অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তিনজন গুরুতর আহতসহ আমাদের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন।’
জানতে চাইলে জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুল সাত্তার সুমন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নগর প্লাজা বিএনপির চাঁদাবাজরা দখল করেছে। সেখানে সাধারণ ব্যবসায়ীদের আক্রমণ করা হচ্ছে। শুধু নগর প্লাজাই নয়, গুলিস্তান এলাকার সব মার্কেটে দখল চাঁদাবাজি চলছে। ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করছি। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।’
তবে কথা হলে বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতা ছিদ্দিক হাওলাদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নগর প্লাজার দখলের সঙ্গে জামায়াত-শিবির জড়িত। এখন দখলমুক্ত হওয়ায় তারা বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।’
এদিকে দুই পক্ষের পাল্টা অভিযোগ এবং রেষারেষির জেরে পুরো গুলিস্তান এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে মার্কেটে মার্কেটে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে আ.লীগের কলকাঠি!
বহু বছর ধরে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটটি পতিত আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মার্কেটের নগর প্লাজার তৎকালীন সভাপতি পালিয়ে যান। এই সুযোগে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের সহায়তায় জামায়াত পরিচয়ে মো. সুমন ও হানিফ বাচ্চুরা মার্কেটের দখল নেন বলে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ।
তবে পাল্টা অভিযোগ জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ী নেতাদেরও৷ তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের অনেকেই বিএনপির নাম করে দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
কথা হলে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত কবির হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর জামায়াত পরিচয়ে মার্কেট দখল নিলেও পেছনের শক্তি ছিল আওয়ামী লীগই। তাদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শেই মার্কেট দখল করে চাঁদাবাজি করে আসতে পেরেছি। অন্যথায় তাদের পক্ষে মার্কেট দখল নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি পাল্টা অভিযোগ তোলেন জামায়াতের মো. সুমন। তিনি বলেন, ‘যারা মার্কেট দখল করেছে তারা সবাই আওয়ামী লীগের দোসর। এরা আওয়ামী লীগের পেটে ছিল। এখন খোলস পাল্টে বিএনপির পরিচয় দিচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণও দিচ্ছেন জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ী নেতারা। সোমবার বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য দেন মো. কামরুজ্জামান, তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকার একাধিক ছবিও সরবরাহ করেন তারা।
একটি ছবিতে দেখা যায়, হাসিমুখে আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর আউয়াল হোসেনের পাশে দাঁড়ানো। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের মেয়র ফজলে নূর তাপসের গৃহীত শান্তি ও উন্নয়ন সভার মঞ্চের সামনে সারিতে বসে আছেন। সেখান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর আউয়াল হোসেন।
তবে এ বিষয়ে কামরুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে বারবার কল দেওয়া হলেও ফোন ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও পাওয়া যায়।
বাধায় বাধ্য অন্তর্বর্তী কমিটি
সমবায় অধিদফতরের নথি অনুযায়ী, নগর প্লাজার বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদকালের মধ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় নতুন কমিটি গঠনে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছিল। ওই রিটের শুনানি নিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দেয়। পরে আদালতের নির্দেশনা নিষ্পত্তি করতে ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয় গত ৮ এপ্রিল পাচঁ সদস্য বিশিষ্ট একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে।
ঢাকা জেলা সমবায় অফিসার মো. আল-আমিনের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনসংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, গঠিত কমিটির মেয়াদ ১২০ দিন। এই সময়ে নতুন কোনো সদস্য যুক্ত করা ব্যতীত এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমসহ অতি দ্রুত নির্বাচন কার্যক্রম গ্রহণ করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করতে হবে।
গত ১৬ এপ্রিলের রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কার্যালয়ের আরেকটি নথিতে দেখা যায়, ২০ এপ্রিল নগর প্লাজার সমিতির কার্যালয় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়।
তবে নির্ধারিত দিন সমিতির কার্যালয় দখল পায়নি অন্তর্বর্তী কমিটি। গত ৭ এপ্রিল রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কার্যালয়ের একটি নথি অনুযায়ী, হস্তান্তরের অনুরোধ পত্র সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির কোন সদস্য/প্রতিনিধি না থাকায় প্রেরণ সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কার্যালয়ে বেশ কিছু অপরিচিত ব্যক্তি উপস্থিত ছিল তারা সমিতির পক্ষে পত্র গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। এ কারণে অন্তর্বর্তী কমিটি দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারিনি। তবে ১৩ মে দায়িত্বভার হস্তান্তরের জন্য সমিতি কর্তৃপক্ষকে পুনঃরায় অনুরোধ করা হয়।
আইনি জটিলতায় সমবায়
এর মধ্যেই হাইকোর্টে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়োগের বিরুদ্ধে একটি রিট দায়ের হয়। গত ৫ মে ওই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি মোসা. ফাতেমা আনোয়ার সমন্বিত ডিভিশন বেঞ্চ একটি সম্পূরক রুল জারি করেন এবং অন্তর্বর্তী কমিটি নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশের কার্যকারিতার ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। ফলে ১৩ মে পুনঃনির্ধারিত তারিখেও সমিতির দায়িত্বভার হস্তান্তর/গ্রহণ করতে পারেনি গঠিত কমিটি।
তবে পরবর্তী সময়ে সমিতির সাবেক সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন ওই রিট আবেদনের বিপক্ষে আপিল আবেদন করেন। তার আইনজীবী এম.এ.বি.এম. খায়রুল ইসলাম কর্তৃক সমিতির পক্ষে দাখিলকৃত বক্তব্য এবং আবেদনের বিষয়বস্তু বিবেচনা করে আবেদনটি মঞ্জুর করেন উচ্চ আদালত।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুন শুনানি নিয়ে সম্পূরক রুল স্থগিত এবং অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনসংক্রান্ত আদেশের কার্যকারিতার স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করেন বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি মোসা. ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট ব্যঞ্চ। যার ফলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণে আইনি বাধা কেটে যায়।
দায়িত্ব গ্রহণেই ১২০ দিনের ৮৬ শেষ
পরবর্তী সময়ে গত ২৩ জুন রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কার্যালয় নতুন একটি পত্র জারি করে। সেখানে বলা হয়, ২৯ জুন সমিতির কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে সমিতির রেকর্ডপত্রসহ দায়িত্বভার হস্তান্তরের জন্য পুনঃরায় অনুরোধ করা হলো।
একই সঙ্গে গত ২৪ জুন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (লালবাগ) বরাবর সমিতির দায়িত্ব গ্রহণে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েনের আবেদন করে রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কার্যালয়।
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শাহাদাতুল হকের স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বলা হয়, স্থানীয়ভাবে জানা যায়, ৫ আগস্ট/২৪ এর পর থেকে সমিতির মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সাধারণ সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ বিদ্যমান থাকায় সমিতির দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ ও সময়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায়, সরকারি কর্মচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে দায়িত্বভার গ্রহণকালে সমিতির কার্যালয়ে দুইজন অফিসারসহ কমপক্ষে ২০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েনের জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।
পরে গত ২৯ জুন কার্যালয়ের দায়িত্ব বুঝে নিতে সক্ষম হয় অন্তর্বর্তী কমিটি। কিন্তু এরমধ্য কমিটির ১২০ দিন মেয়াদের ৮৬ দিনই পেরিয়ে গেছে।
মার্কেটের নির্বাচন কবে?
সংশ্লষ্ট সূত্র জানা যায়, নগর প্লাজা মার্কেট সমিতির পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছেন। সমিতির বেশ কয়েকজন সদস্য বলছেন, চলমান জটিল পরিস্থিতির সমাধান একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সম্ভব। এতে সবপক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কাউ বাধা বা বঞ্চিত করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রমনা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় অফিসার শাহাদাতুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা বহু বাধা পেরিয়ে মার্কেটের দায়িত্ব নিতে পেরেছি। আমাদের মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ সময় নানা জটিলতায় কেটে গেছে। নির্বাচনের জন্য আমরা আনুষঙ্গিক কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছি।’
নির্বাচনের আয়োজনে জন্য আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলেও জানান অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি।
শাহাদাতুল হক বলেন, ‘ভোটার তালিকা তৈরিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে হবে। এখন নতুন করে কোনো জটিলতা তৈরি না হলে আগামী দুই আড়াই মাসের মধ্য নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’
এএম/জেবি




