তিন ধাপে তিনটি করে এক বর্গফুট আয়তনের খাঁচা রাখা। লোহার তৈরি বিশেষ ধরনের এই খাঁচাগুলো মশারি দিয়ে আবদ্ধ। আর তাতে রাখা ৫০টি করে জীবন্ত মশা। একজন মশক কর্মী কাছ থেকে প্রথম সারির খাঁচাগুলো লক্ষ্য করে ফগিং করলেন। ফগিংয়ের ধোঁয়া খাঁচার ভেতরে ঠিকঠাক পৌঁছানোর আগেই চারপাশ পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো। একইভাবে অন্য ধাপের খাঁচাগুলোতেও ফগিং করা হয়। ফগিংপরবর্তী ৩০ মিনিট খাঁচাগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অল্প কয়েকটি মশা অজ্ঞান হলেও খাঁচার ভেতরে অন্য সব মশা উড়ছে!
ভারত থেকে আনা একটি ওষুধের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ফিল্ড টেস্টে এমনটাই লক্ষ্য করা গেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অবজারভেশন করে দেখবেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফগিংয়ের পর প্রথম ২০ মিনিটে যদি ৯৭ শতাংশ মশা না মরে তাহলে তা কার্যকর ধরা যায় না।
মঙ্গলবার (৯ জুন) নগর ভবনে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই ফিল্ড টেস্ট শুরু হয়। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে প্রথম ধাপের ফগিং করা হয় এবং ১টা ২৫ মিনিটে শেষ ধাপের ফগিং সম্পন্ন হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফগিংয়ের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চলে গেলে দায়িত্বে থাকা অনেকেই কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক মশা না মরায় হতাশা প্রকাশ করেন। কাউকে কাউকে 'মশা মরেনি' 'মশা মরেনি' বলতেও শোনা যায়।
বিজ্ঞাপন
তবে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বরতরা বলছেন, এখনই (ফগিংয়ের ২০ মিনিট পর) সব মরবে না। তারা ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশন করবেন। এরপর কতগুলো মশা মারা যায়, সে অনুযায়ী ওষুধের কার্যকরিতা নির্ধারণ হবে।
তবে সাংবাদিক শোনে দায়িত্বরতদের কেউ পরিচয় দিতে রাজি হননি। বরং পরীক্ষাধীন খাঁচার ছবি তুলতে বাধাও দেন কেউ কেউ।
যদিও পরিচয় গোপন করে দায়িত্বরত একজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, মশা আশানুরূপ মরেনি। দু-একটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আর অনেক মশাই উড়ছে। তবে পরে মশা মরে কি না এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সিটি করপোরেশন পূর্ণাঙ্গ বা উড়ন্ত মশা মারার জন্য বিকেলে এই ‘এডালটিসাইড’ ওষুধ ফগিং করে। বর্তমানে চীন থেকে সংগ্রহ করা ‘ম্যালাথিয়ন (malathion)' নামের এডালটিসাইড ব্যবহার করছে।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, চীনের মশার ওষুধটি চলতি মাস পর্যন্ত ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ভাণ্ডারে মজুদও আছে সে পরিমাণই। তবে আগামী মাস থেকে নতুন ওষুধ ব্যবহার শুরু হবে। সেই লক্ষ্যে ভারত থেকে আমদানি করা ‘ডেল্টামেথ্রিন (Deltamethrin)’ নামের এডালটিসাইড ওষুধের সেম্পল এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।
ফিল্ড টেস্টের প্রথম ত্রিশ মিনিটে স্বল্পসংখ্যক মশা মরার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন ঢাকা মেইলকে বলেন, এটি আমাদের একেবারে প্রাইমারি পরীক্ষা। ফগিংয়ের ২০ মিনিট পর মশা কী পরিমাণ মরেছে তা দেখেছি। এখন আমরা ২৪ ঘণ্টা তথা আগামীকাল দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অবজারভেশন করবো।
প্রধান ক্রয় কর্মকর্তা আরও বলেন, আমাদের পরীক্ষা চূড়ান্ত হলেও সেটি আরও দুই জায়গায় ল্যাবরেটরি টেস্ট হবে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরীক্ষা উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং (পিপিডব্লিউ) এবং স্বাস্থ্য অধিদফরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইডিসিআর) এটি পরীক্ষার জন্য পাঠাবো। এরপর চূড়ান্ত হলে ব্যবহারের জন্য আমদানি করা হবে।
তবে ফিল্ড টেস্টে ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশন করার কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। বিকেলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, যখন ২০ মিনিটে কোনো একটা কীটনাশকে ৯৭ পারসেন্টের নিচে মশা মারা যায়। অর্থাৎ, ১০০টি মশা থেকে ৯৭টির কম মারা গেলে তখন সেটিকে কার্যকর হিসেবে ধরা যায় না।
আরও পড়ুন
মশা মারার পদ্ধতিই ভুল!
এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, সবগুলো (৯৭% মশা) ফগিংয়ের প্রথম ২০ মিনিটেই চলে আসবে (মারা যাবে)। ২৪ ঘণ্টা দেখার কোনো প্রয়োজন নাই। যেটা ২০ মিনিটে কার্যকারিতা দেবে না, সেটা ২৪ ঘণ্টায়ও কার্যকারিতা দেবে না।
কবিরুল বাশার বলেন, ২৪ ঘণ্টায় কীটনাশকের কার্যকারিতা আরও কমবে, বাড়বে না। কারণ ২৪ ঘণ্টায় অনেক মশা উড়ে যায়। যদি আলো বাতাস আছে, এমন জায়গায় রাখলে মশা উড়ে যাওয়ার সংখ্যা বাড়বে।
দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার মশা নিয়ে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক। নিজেদের ল্যাবেই এই ডেল্টামেথ্রিন কার্যকারিতা পাননি বলেও জানান তিনি।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেল্টামেথ্রিন নিয়ে আমাদের ল্যাবে কাজ করেছি। এটি পুরোপুরি অকার্যকর। এটি বাংলাদেশে কোনো কার্যকরী কীটনাশক না। এটা আমি অনেকবার বলেছি।
এএম/জেবি




