সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ফুটপাতজুড়ে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’, সমাধানহীন হকার সংকট

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

ফুটপাতজুড়ে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’, সমাধানহীন হকার সংকট
ফুটপাত উদ্ধার করলেও রাতারাতি দখল হয়ে যাচ্ছে। ছবি: ঢাকা মেইল
  • উচ্ছেদ অভিযানেও থামছে না দখল
  • অভিযান শেষে ফিরছে পুরনো চিত্র
  • হকার ব্যবস্থাপনা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
  • ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
  • উচ্ছেদ নয়, টেকসই সমাধানের দাবি
  • ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতির তাগিদ

সকালে উচ্ছেদ, বিকেলে আবার দখল। রাজধানীর ফুটপাতগুলো যেন প্রতিদিন একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি দেখছে। বিকল্প স্থানে পুনর্বাসনের মাধ্যমে হকার সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নিলেও তা কার্যত থমকে গেছে। কারণ অনেক হকারেরই যেমন এতে অনাগ্রহ রয়েছে, তেমনি লাখ লাখ হকারের বন্দোবস্ত করার সীমাবদ্ধতাও সামনে আসছে। ফলে পুরনো ধারায় হকার উচ্ছেদেই বেশি মনোযোগ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। এতে এখন প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হকার উচ্ছেদে অভিযান হচ্ছে। ফলে সাময়িকভাবে ফুটপাত থেকে সরে গেলেও অভিযান শেষ হতেই আবার ফিরে আসছেন হকাররা। যার ফলে অতীতের মতো ফুটপাতে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলায়’ রূপ নিয়েছে।

অবশ্য সিটি করপোরেশন বলছে, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আগামীতে তাদের অভিযানের মাত্রা আরও বাড়বে। তবে জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে কাউকে ফুটপাতে বসতে দেবে না। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বা চলমান কার্যক্রমে নগরীর হকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং এই সমস্যা সমাধানে দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের হকার ম্যানেজমেন্ট পলিসি নাই। হকার সমস্যা সমাধানে পরিসিটা আগে করতে হবে।

‘উচ্ছেদ করে কূল পাচ্ছি না। তাহলে কী করলে কূল পাব, ব্যাপারটা ওইভাবে দেখতে হবে। আবার এটাও ঠিক যে, সব জায়গায় উচ্ছেদ করব কি না, চিন্তা করতে হবে। আবার এরকমও হতে পারে, উচ্ছেদ না করেও পুনর্বাসন করা যায়- সেটার নীতিমালা কী হবে? এই জিনিসগুলো না করে অভিযান চালালে ইঁদুর আর বিড়ালের খেলা চলবেই, তাছাড়া কিছুই করার থাকবে না’, বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এই সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘টেকসই সমাধানের চিন্তা না করে বড় স্কেলে অভিযান করাটা ঠিক হয় না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক  ড. আদিল মুহাম্মদ খানও সিটি করপোরেশনের ‘অপরিকল্পিত’ অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

Dhaka1

সোমবার (২২ জুন) তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একটা প্ল্যান। কোন কোন জায়গায় করবে, কারা দায়িত্বে থাকবে। কোন কোন রাস্তায় কী ধরনের ক্রাইটেরিয়ায় উচ্ছেদ করবে। কিন্তু সেই প্ল্যানই নাই। ফলে অভিযান করলেও আবার বসে যাচ্ছে।’

সাঁড়াশি অভিযান দুই সিটির

অতীতে বিভিন্ন সময় রাজধানীতে হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত তা উচ্ছেদ, বিক্ষোভ, সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সবশেষ দুই মাস আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীজুড়ে ফুটপাতগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছিল। টানা কয়েক দিনের সে অভিযানে পাল্টে গিয়েছিল ঢাকার ফুটপাতগুলোর চিত্র। কিন্তু সেই অভিযান শিথিল হতেই স্বরূপে ফেরে হকাররা।

পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ এর আওতায় নির্দিষ্ট স্থানে হকার পুনর্বাসনের কার্যক্রম হাতে নেওয়ার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়ে আসছিল সিটি করপোরেশন। কিন্তু তাতে তেমন কোনো ফল আসেনি। বরং গুলিস্তানসহ নগরজুড়েই চলে আসছে ফুটপাত দখল উৎসব।

যদিও হকারদের আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কিছুদিন জন্য সময় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিল সিটি করপোরেশন। এরমধ্যেই বিগত সপ্তাহ ধরে টানা অভিযান শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনই। যদিও অভিযানের আওতায় এখনো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো আসেনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সূত্র জানায়, গত সপ্তাহের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফুটপাত ও রাস্তা অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। পাশাপাশি অভিযানকালে মামলা দিয়ে অনেককে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে গত ১৪ জুন কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল হয়ে আরামবাগ পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করা হয়।

আরও পড়ুন

পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিতে চান যারা, তাদের পোস্টারেই শ্রীহীন ঢাকা

পরদিন ১৫ জুন মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা এবং দৈনিক বাংলা মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত  রাস্তার উভয় পাশের সব অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ করে ফুটপাত ও রাস্তা পরিষ্কার করা হয়। পরে ১৬ জুন চানমারী ঘাট থেকে খিলগাঁও রেল ক্রসিং পর্যন্ত এলাকা এবং ১৭ জুন ধোলাইপাড় খালপাড় রোড, যাত্রাবাড়ী মোড় এবং শহীদ ফারুক সড়ক এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এছাড়াও ১৮ জুন যাত্রাবাড়ী এলাকা, ২১ জুন ধানমন্ডি, মিরপুর রোড এবং হাতিরপুল এলাকা, ২১ জুন গোলাপবাগ থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত অভিযান পরিচালিত হয়। সবশেষ গতকালও (২২ জুন) জুরাইন ও শ্যামপুর এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তার দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালিত হয়।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) ফুটপাতের হকার মুক্ত করতে অভিযান জোরদার করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংস্থাটির ধারাবাহিক অভিযান চলমান রয়েছে। এরমধ্যে গত ৭ জুন গুলশান-২ কাঁচাবাজার ও আশপাশ এলাকার ফুটপাতের হকারদের ৫০টির বেশি অবৈধ দোকান অপসারণ করা হয়।

গত ১২ জুন উত্তরা সেক্টর ৪, ৬, ৮ ও ১০ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০০টিরও বেশি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। গত ১৪ জুন তেজগাঁও নাবিস্কো, শহীদ মিনার মোড়সহ আশেপাশের অবৈধ দখলকৃত রাস্তা ও ফুটপাতের শতাধিক টং দোকান অপসারণ করা হয়।

এছাড়া ১৫ জুন রাজধানীর উত্তরা, ১৬ জুন জিয়া উদ্যান, লেক রোড, মানিক মিয়া এভিনিউ এবং জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকা, ২১ জুন উত্তরা এবং ২২ জুন গুলশান ও শাহজাদপুর এলাকায় হকার উচ্ছেদ অভিযান করা হয়। এসব অভিযানে উচ্ছেদের পাশাপাশি মামলার মাধ্যমে জরিমানাও করা হয়।

Dhaka2

কথা হলে ‎ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকতা মো. জাকির হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পথচারীদের হাঁটাচলা নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ‎মো. রেজাউল করিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে রেগুলারই অভিযান হচ্ছে। আমরা রুটিন করে অভিযান চালাচ্ছি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় অভিযান করছি। যতটা সম্ভব মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি।’

অভিযানের ফলাফল ‘শূন্য’

যাত্রাবাড়ী পার্ক ঘেষে ফুটপাতের উপর অবকাঠামো তৈরি করে ৩০/৪০ জন হকার ফলের ব্যবসা করে আসছিলেন। সামনের রাস্তায় অস্থায়ীভাবে ভ্যান বা টং বসিয়েও ফলমূলের ব্যবসা করছিলেন অনেকে। কিন্ত গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) অভিযান চালিয়ে অবকাঠামোগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হকারদের উচ্ছেদ করে জায়গাটি পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিগত কয়েক দিনে সেখানে আবারও অবকাঠামো তৈরি করে ব্যবসা চালাচ্ছেন হকাররা।

আরও পড়ুন

শহরকে বাসযোগ্য করেন যারা, তারাই থাকেন অবহেলিত

সোমবার (২২ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী পার্ক ঘেষে আবারও বাঁশ দিয়ে ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। আর তার নিচে পৃথকভাবে হকাররা তাদের ফলের ব্যবসা চালাচ্ছেন। সেখানে থাকা যাত্রী ছাউনিটি দখল করে চা-পান-সিগারেট ও কেক-বিস্কুটের টং দোকানও দিয়েছেন একজন।

স্থানীয়রা বলছেন, বৃহস্পতিবার সিটি করপোরেশনের অভিযানের পর বিকেল থেকেই সেখানে হকাররা আবার বসে পড়েন। পরে দখল পোক্ত করতে অবকাঠামোও তৈরি করেন। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ছাউনিও দেন।

পার্কে নিয়মিতেই সময় কাটাতে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা কায়সার আলম। কথা হলে তিনি বলেন, ‘হেগোরা (হকাররা) হেইদিনই আইয়া বইসা গেছিল। শুরুর দিকে হেরা কোনো ছাউনি-মাউনি দেই নাই। পরে আস্তে আস্তে (অবকাঠামো) বানাইছে।’

এই পথ ধরে নিয়মিত আসা যাওয়া করেন সাজিদ হোসেন। ঠাটারী বাজার এলাকার একটি দোকানে কাজ করেন তিনি। থাকেন কাজলা এলাকায়। কথা হলে সজিব বলেন, ‘ফুটপাতডার পুরাডাই আবার হকারগো দখলে। বিকাল বেলা আইলে আর ভালো কইরা বুঝবার পারবেন। তহন এই রাস্তাডায় ফলের মেলা বইয়া যাইবো।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘ফুটপাত দখল কইরা যারা বইসা আছে, হেইগো লোকজন আইয়া রাস্তায় আরও কয়ডা দোকান বসাইবো। এইহানে পুরাই গ্যাঞ্জাম হইয়া যাইবো। মানুষে আর হাটবার পারবো না, এমন অবস্থা হইবো।’

শুধু যাত্রাবাড়ী পার্ক সংলগ্ন এলাকাই নয়, আশপাশের যেসব ফুটপাতে অভিযান হয়েছে সেখানেও হকারদের ব্যবসা চালাতে দেখা গেছে। এমনকি আগের দিন রোববার (২১ জুন) অভিযান হওয়া সায়েদাবাদ ও গোলাপবাগ এলাকায়ও সোমবার দুপুরের পর ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালাতে দেখা গেছে হকারদের। কেউ কেউ গুঁড়িয়ে দেওয়া দোকান মেরামত করে আবার বসার প্রস্তুতি নিতেও দেখা গেছে।

আগের দিনের অভিযানে জনপদ মোড়ের ফ্লাইওভারের পিলারের সঙ্গে থাকা মো. শামীমের দোকানটি গুঁড়িয়ে দেয় সিটি করপোরশন। সোমবার দুপুরের পর দিয়ে দেখা যায়, শামীম তার দোকানটি মেরামত করছেন। তবে তখনো তিনি নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারেন।

কথা হলে শামীম বলেন, ‘গরির মানুষ কিছু করে খাওয়ার জন্য (পুলিশ) প্রশাসন আমাকে এখানে দোকান বসাতে দেয়। এই দোকান চালাইয়াই আমার সংসার চলে। কিন্তু আমাকে কোনো ব্যবস্থা না করে দিয়াই দোকান ভেঙে দিয়ে গেছে। তাই গতকাল থেকে ব্যবসা বন্ধ। দোকান ঠিক করতাছি। আগামীকাল থেকে হয়ত আবার ব্যবসা শুরু করতে পারব।’

Dhaka3

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরশনের অভিযানের পর মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, আরামবাগ, নয়াপল্টন, কাকরাইল এলাকার ফুটপাতে আগের মতো হকারদের ব্যবসা চালাতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অভিযানের পর উত্তরা, গুলশান, শাহজাদপুর এলাকায়ও হকারদের ফুটপাত দখল উৎসব দেখা গেছে।

অভিযানের পরই আবার দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ‎মো. রেজাউল করিম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এটা একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি। আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তারা চলেও যাচ্ছে। কিন্তু আবারও তারা এসে বসছে।’

‘এটা একটা পার্মানেন্ট সলিউশন (হকার পুনর্বাসন) প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রশাসক মহোদয় উদ্যোগটি নিয়েছেন। তার বাইরেও আমাদের জায়গা থেকে কোনো দ্রুটি রাখি নাই। অভিযান চলছে। চলতে থাকবে। যদি বুঝি কাজ হচ্ছে না, তখন অভিযানের গতি আরও বাড়াবো’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

গুলিস্তান-মিরপুরেই ‘আটকে’ হকার পুনর্বাসন, ফুটপাতের ভোগান্তি শেষ কবে?

জানতে চাইল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের হকার পুনর্বাসনের কার্যক্রমও চলমান আছে। হকার নীতিমালার আওতায় আমরা ডিজিটাল পরিচয়পত্র কার্ড দিচ্চি। তাদের জায়গা নির্ধারণ করে দিচ্ছি। বিভিন্ন উদ্যোগ আমাদের চলমান আছে। তবে কাউকে ফুটপাতে বসতে দেওয়া হবে না।’

অভিযানের ফল পেতে পলিসি জরুরি

ঢাকা মহানগরীর হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যা সমাধানে অতীতে বহুবার নানা উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। কিন্তু অভিযানেই সীমাবন্ধতা দেখা গেছে সিটি করপোরেশনকে। এতে উল্টো সংকট নিরসন না হয়ে বছর বছর তা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত সঠিক পলিসি ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছে সিটি করপোরেশন। যার ফলে সমস্যাও তীব্র হয়েছে। তাই সমস্যা নিরসনে আগে পলিসি ঠিক করতে হবে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হকারদের ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের পলিসি থাকলে আমরা চিন্তা করতাম। কিন্তু পরিসি নাই। পলিসি কীভাবে করতে হবে, সেই উদ্যোগও নাই।’

অতীতে হকার পুনর্বাসনে মার্কেট করার কথা তুলে ধরে এই নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘পুনর্বাসন ক্ষেত্রে যদি বলি, পুনবার্সনের নামে হকার মার্কেটগুলো যা হয়েছে সেগুলো আসলে বড়লোকদের মার্কেট হয়ে গেছে। এগুলো আর হকার মার্কেট থাকছে না। মার্কেটের ডিজাইন এমনভাবে করা হচ্ছে যে, সেখানে ২০ লাখ ৪০ লাখ টাকার দোকানের মূল্য হচ্ছে। এখন সেই টাকা হকাররা পাবে কোথা থেকে? তাহলে হকার সমস্যা রোধ হবে কী করে? তাই শুধু হকারদের কথা বিবেচনা নিয়ে মার্কেট করা জরুরি।’

জানতে চাইলে এই নগর পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, ‘আমরা জানি যে, এই অভিযানের ফলাফল শূন্য। ফলাফল শূন্য হলেও কিছু জায়গায় (অভিযান) হতে পারে। যেমন গুলশান-২ (হকাররা) বসে গেছে বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বসে গেছে। এরকম কিছু জায়গায় টপ পাইরিটি দিয়ে (অভিযান) করা যেতে পারে যে, অন্যগুলো পারি না পারি এগুলো আপাদত ক্লিয়ার করি। কিন্তু বিশাল স্কেলে (অভিযান) করাটা কাজে আসছে না, সেভাবে চিন্তা করা দরকার৷ অন্যথায় (হকার সমস্যার) টেকসই কোনো সমাধান হবে না। টেকসই সমাধানের চিন্তা না করে বড় স্কেলে করাটা ঠিক হয় না।’

Dhaka4

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যে জায়গায় হকাররা অবৈধভাবে বসে আছেন, সেগুলো পথচারীদের জায়গা। কিন্তু তারা দরিদ্র মানুষ, তাদের উচ্ছেদে সামাজিক সুরক্ষাও দিতে হবে। কিন্তু আবার তাদের সবাইকে (সুরক্ষা) করতেও পারবেন না। কারণ কতজনকে করবেন? এজন্য প্ল্যান দরকার।’

‘একটা সময় বেঁধে দেওয়া যায় যে, এই সময় পর্যন্ত তোমরা থাকো, এরপর আর তোমাদের এলাউ করা হবে না। তোমাদের রাষ্ট্র সুবিধা, যেমন- ফ্যামিলি কার্ড বা অন্যান্য কার্ডের ব্যবস্থা করার বিষয়গুলো আমরা দেখব। সেই বেসিক জায়গা থেকে সরে এসে অভিযানে গেলে পুরো বিষয়টা ভেস্তে যাবেই’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

পরীক্ষা পর্বেই ‘ব্যর্থ’ ভারতীয় ওষুধ, দমছে না ঢাকার মশা

এই নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘(হকারদের বিষয়ে) এই সরকারে যে মুভমেন্ট দেখছি তাতে আল্টিমেটলি তাদের সরাতে পারবে না। কারণ সব জায়গায়ই তো হকার আছে, যদি ৫/৬ লাখ বা তার বেশি হকার থাকে তাহলে তাদের সবার পুনর্বাসন করা সম্ভব না।’

ফুটপাতের হকারদের নেপথ্যে যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে সেদিকে নজর দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘হকারদের কাছ থেকে যারা টাকা পয়সা নেয়, এই লোকগুলো কারা? তাদের কেন ধরে না। তারাই তো হকারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদের ব্যাপারে তো কোনো পদক্ষেপ নাই৷’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রাজনৈতিক বলয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলয় কোটি কোটি টাকা ইনকাম করছে, তাদের যদি না ধরা হয় তাহলে তো কোনো লাভ নাই। সরকার আসলে ওই দিকে এখন পর্যন্ত যায় নাই৷’

তার মতে, ‘সরকারের নির্দিষ্ট কোনো ভিশন নাই, কোনো রোডম্যাপ নাই, নির্দিষ্ট কোনো পলিসি নাই। অভিযান হচ্ছে কিন্তু মনিটরিং নাই। ফলে আল্টিমেটলি রেজাল্ট জিরো হচ্ছে।’

তিনি হকারদের নেপথ্যে যারা কাজ করছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান। আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘যারা হকারদের বসিয়ে টাকা নেয় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, কিন্তু হচ্ছে না। এটা নিয়ে কোনো আলাপই নাই। যতক্ষণ না এই চক্রটাকে আইডেন্টিফাই করা না হবে এবং এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হবে, ততক্ষণ হকার সমস্যা সমাধান হবে না।’

এএম/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর