ভোরের অন্ধকারে যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, ঠিক তখনই নীরবে কাজে নেমে পড়েন তারা। নিরলস শ্রমে ঝাড়ু হাতে পরিচ্ছন্ন করে তোলেন শহরের অলিগলি, রাস্তা ও বাজার। তাদের হাতেই শহর হয় বাসযোগ্য। অথচ সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জীবনই কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনায় ঘেরা।
৪০ বছর ধরে ঢাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তুফান। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে দয়াগঞ্জ পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিবাসে থাকেন ৫৫ বছর বয়সী তুফান।
বিজ্ঞাপন
এই পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘১৫ বছর বয়সে এই কাম শুরু করি। আজ এতো বছর হলো কোনো সম্মান পাই না। ময়লা আবর্জনায় কাম করি শুনলেই মানুষ দূরে সরে যায়। আমাদের জীবনটাই অবহেলার।’
বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) অধীনে ১০ হাজারের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছে। এছাড়া সারাদেশে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতেও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত আছেন। তাদের কিছু মাসিক ভিত্তিতে হলেও অনেকেই দৈনিক কাজের ভিত্তিতে কাজ করেন। তারা মূলত ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত শহরের অলিগলি, বাজার ও রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসনসহ নানা সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। তবে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সরকারি যেসব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন তা তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তাদের ছাড়া শহর কল্পনা করা যায় না। শহর বাসযোগ্য রাখতে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই তাদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উঠিত।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিত তাদের কাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। কারণ তারাও আমাদের মতোই মানুষ। তাদের পাশে দাঁড়ানো সবারই দায়িত্ব।’
অনিশ্চয়তা আর অবহেলায় বন্দি জীবন
মে দিবসেও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অবকাশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের অনেকে জানেনও না, মে দিবস কী কিংবা এর তাৎপর্যই বা-কি। দায়িত্বের এতো চাপ যে অধিকার নিয়ে কোনো কথা বলবেন, তারও ফুরসত নেই।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ধলপুর বউবাজার এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন ভাংগারী চিলআম্মা (৫৫)। দেড় দশক আগে একই কাজ করতে গিয়ে রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার স্বামী। পরে একই কাজ শুরু করেই সংসারের হাল ধরেন তিনি।
ব্রিটিশ আমলে থেকে বংশপরম্পরায় ঢাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করে আসছেন তেলেগু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ। তাদের একজন চিলআম্মা। বর্তমানে তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ধলপুর পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিবাসে থাকেন।
ঢাকা মেইলকে চিলআম্মা বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্য কাজ পাই নাই। বাসা-বাড়িতেও (তেলেগু সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায়) আমাদের কাজ দেয় না। সংসার চালাতে হবে, বাধ্য হয়ে এই (পরিচ্ছন্নতার) কাজই নিছি।’
মে দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কোনো দিবস আছে জানা নাই। আর কোনো দিবস-টিবসে দিয়া আমাদের কোনো কিছু আসে যায়ও না। আমাদের ঠিকই মাঝ রাইতে জাইগা উঠতে হয়, মাইয়া হইয়াও অন্ধকারে কাজে বের হইতে হয়। প্রত্যেক দিনই আমাদের একই রকম। আমাদের কাজে কেউ সম্মান দিল, নাকি দিল না- তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না। কাজে যাইতে হইবো, জীবন বাঁচাইতে হইবো- এটাই জানি।’
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রত্যেকেরই গল্প কষ্টের। অনিশ্চয়তায় বন্দি জীবন তাদের। বিশেষ করে সামাজিক বৈষম্য তাদের জীবনে বড় বাধা। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অভিযোগ, তাদের কাজকে অনেকেই নিম্নশ্রেণির পেশা হিসেবেই দেখেন।
৩২ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন ইশরাক রাও (৫৬)। তিনিও তেলেগু সম্প্রদায়ের লোক। থাকেন যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অমুসলিম নিবাসে। স্ত্রী, তিন ছেলে ও মেয়ে নিয়ে তার সংসার।
কথা হলে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আর চাকরি আছে। খালি হাতে অবসরে যাইতে হইব। বাসা (সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ফ্ল্যাট) ছাড়তে হইবো। এরপর তখন কী করবো, কিভাবে সংসার চলবো, হেই নিয়াই চিন্তা। আমাদের জীবনে যে অনিশ্চয়তা, তাতে মে দিবস নিয়া আবেগ দেখানোর মতো কোনো পরিস্থিতি নাই।’
গণকটলী এলাকার লস্কর নামের এক কর্মী অভিযোগ করে বলেন, ‘ময়লার কাজ করি শুনলেই মানুষ দূরে যাইয়া খাড়ায়। তারা আমাগো অন্য দৃষ্টিতে দেখে।’
সম্মানের প্রত্যাশা
দীর্ঘ বছর ধরে ঢাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করে আসছেন গৌরমুর্তি (৫৩) ও জুসেফ (৪৮)। তাদের ভাষ্য, জীবনের দিকে না তাকিয়ে দায়িত্ববোধ থেকেই তারা তাদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।
আক্ষেপের সুরে গৌরমুর্তি (৫৩) বলেন, ‘পরিচ্ছন্নকর্মীরা কেউ নিজের কথা চিন্তা করে না। যদি চিন্তা করতো তাহলে এমন পরিবেশ কেউ কাজ করতো না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করায় প্রত্যেকটা কর্মীই নানা রোগে আক্রান্ত। আমরা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যে ত্যাগ শিকার করি, সেটির মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা সম্ভব নয়। আমরা সে মূল্য চাইও না। আমরা চাই, একটু সুন্দরভাবে জীবন চালাতে। একটু সম্মান পেতে।’
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের মূল্যায়ন চান জুসেফ। তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কয়েকদিন কাজ বন্ধ রাখলে বুঝতে পারবেন, আমরা আসলে কি করি। সেই চিন্তা করে আমাদের মূল্যায়ন করা উঠিত।’
মালিবাগ এলাকায় দৈনিক ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন কবীর (৪৫)। তিনি বলেন, ‘বউ, বাচ্চা আছে। দৈনিক ভিত্তিতে কাম করি। কামে না আসলে টাকা পাবো না, সংসারও চলে না। আর যে টাকা পাই তা দিয়াও সংসার চলে কোনোমত। কষ্টে কষ্টে জীবন যাচ্ছে।
কী করছে সরকার
ঢাকার দুই সিটি করপোরশন বেশ কিছু পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিবাস তৈরি করে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য ঈদ উপহারসহ আর নানা উদ্যোগের কথা বলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যেন দুর্দশায় না থাকেন তাই অর্থের সংকট থাকলেও সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে তাদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে।’
গাবতলীতে গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) নির্মাণাধীন পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসন প্রকল্পের অগ্রগতি পরিদর্শনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে শিশুদের জন্য স্কুল, সবুজায়ন, মসজিদ ও উন্নত সড়ক ব্যবস্থাসহ বসবাসের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
গত ঈদুল আজহায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সকল পরিচ্ছন্নকর্মীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। ওই সহায়তা প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, দেশের শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের এই নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগ নিয়েছেন। নগর সেবায় নিয়োজিত সকল কর্মীর কল্যাণে সরকার ভবিষ্যতেও বিভিন্ন মানবিক ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।
এএম/এমআর




