সিটি নির্বাচনের এখনও অনেকটা সময় বাকি। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের রোডম্যাপ দেয়নি কমিশন। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে ঢাকা শহর। এমনকি ‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের প্রচার পোস্টারেও শ্রীহীন হয়ে পড়ছে শহর। পিছিয়ে নেই জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীও। পোস্টার লাগানোর হিড়িক পড়েছে অন্যদেরও।
নগরবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন উপলক্ষে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার লাগানোর মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তা ঠেকানোর কোনো পদক্ষেপ নেই। পরিষ্কার করারও কোনো উদ্যোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
পরিবেশবাদীরা বলছেন, পোস্টার-ব্যানার লাগিয়ে শহরের পরিবেশ নষ্ট করা জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি আইনেরও লঙ্ঘন।
গ্রীন ভয়েস নামের একটি সংগঠনের কো-ফাউন্ডার ও পরিবেশবাদী নেতা হুমায়ুন কবির সুমন ঢাকা মেইলকে বলেন, “ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে চান তারা। আমরা তাদের দায়িত্ব দেব। কিন্তু তার আগেই যদি তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়া তারা আইনেরও লঙ্ঘন করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনি আচরণবিধিতে আছে, দেয়ালে পোস্টার লাগানো যাবে না। দেয়ালে পোস্টার লাগানোর সংস্কৃতি থেকে আমরা গত নির্বাচনেই (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) বেরিয়ে গেছি। এখন আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তারা (সম্ভাব্য প্রার্থী) এটা করতে পারেন না। বিশেষ করে (সিটি করপোরেশনের) প্রশাসক আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে পারেন না।”
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
বিজ্ঞাপন
তবে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, “প্রশাসকের নামে কিছু সুযোগসন্ধানী অসাধু লোকজন পোস্টার লাগাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “শহরের দেয়ালগুলোতে লাগানো পোস্টার নিয়মিতই অপসারণ করছি। আমরা গণবিজ্ঞপ্তিও জারি করেছি। এখন যেসব পোস্টার লাগানো হচ্ছে, সেগুলোও পরিষ্কার করা হবে।”

দেয়ালে দেয়ালে প্রশাসকের পোস্টার
রোববার (১৪ জুন) ডিএসসিসির নগর ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে বের হলে রাস্তার উল্টো পাশে তাকাতেই দুই গাছে বাঁধা বড় একটি ব্যানার চোখে পড়ে।
যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ওই ব্যানারে লেখা, “আগামীর তিলোত্তমা ঢাকার স্বপ্নদ্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালামের ভাইয়ের পক্ষ থেকে ঢাকা দক্ষিণের সর্বস্তরের জনগণকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা।”
ওই ব্যানারের নিচে উসমানী উদ্যানের দেয়ালজুড়ে লাগানো অসংখ্য নতুন-পুরোনো পোস্টার। পোস্টারে পোস্টারে বড় করে রয়েছে প্রশাসক আবদুস সালামের ছবি।
ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুস সালাম। কাছে গিয়ে দেখা গেল, নতুন পোস্টারগুলোতে লেখা— “সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে ঢাকা। পরিবর্তনের বাংলাদেশে বদলে যাওয়া ঢাকা গড়তে জাতির সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামের সঙ্গে থাকুন, পাশে থাকুন।”
একই ধরনের কিছু পোস্টার নগর ভবনের প্রধান ফটকের দেয়ালেও লাগানো আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পাশে নগর ভবনের ছোট ফটকের দেয়ালেও সাঁটানো হয়েছে এসব পোস্টার।
আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গেট ও দেয়ালেও পোস্টার দেখা গেছে। বিশেষ করে ফিনিক্স রোডের রেল পরিদর্শক অধিদপ্তর ও কর্মচারী হাসপাতালের নবনির্মিত দেয়াল প্রশাসকের পোস্টারে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
এদিকে গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, কাকরাইল, মালিবাগ ও শাহবাগেও একই ধরনের পোস্টারসহ প্রশাসকের বিভিন্ন প্রচার পোস্টার দেখা গেছে।
পোস্টার লাগানো থেকে বাদ যায়নি মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভারও। শান্তিনগর মোড়ে ফ্লাইওভারে নতুন-পুরোনো বেশ কিছু পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। এর মধ্যে “বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালামকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই—প্রচারে: ঢাকা দক্ষিণ নগরবাসী” পোস্টারই বেশি।
শান্তিনগর মোড়ে কথা হয় শিক্ষার্থী খাইরুল আকন্দের সঙ্গে। তিনি মালিবাগ মোড়ের একটি প্রতিষ্ঠানে আইইএলটিএস করছেন।
খাইরুল বলেন, “সিটি করপোরেশনের পোস্টার ঠেকানো বা পরিচ্ছন্ন করার কোনো উদ্যোগ নেই। বরং এই এলাকাজুড়েই দেয়ালে দেয়ালে প্রশাসকের পোস্টার লাগানো হচ্ছে। ওনার পোস্টারে ফ্লাইওভারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “তার দায়িত্ব নগর পরিষ্কার রাখা। তিনি মেয়রও হতে চান। এখন তিনিই যদি পরিবেশ দূষণ করেন, শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করেন, তাহলে তো আমাদের সঙ্গে প্রতারণাই হচ্ছে।”
পুরানা পল্টন এলাকার একটি ম্যানপাওয়ার কোম্পানিতে কাজ করেন তন্ময় চন্দ্র। কথা হলে তিনি বলেন, “ঈদ, বৈশাখ বা কোনো উপলক্ষ হলেই এই এলাকায় প্রশাসকের নামে পোস্টার লাগানো হচ্ছে। এখন পোস্টারের ওপর পোস্টার লাগানো হচ্ছে। তার পোস্টারে মেট্রোরেলের সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।”
সরেজমিনে খিলগাঁও, বাসাবো ও মুগদা এলাকাতেও প্রশাসকের নামে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার দেখা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, “এসব পোস্টারে যতটা প্রচার হচ্ছে, এর চেয়ে বেশি বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। পরিবেশ নষ্ট করে তো আর মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়।”
শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফিজিওথেরাপিস্ট মাহমুদ হাসান বলেন, “প্রশাসকের উচিত এগুলো নজরে রাখা। এগুলো (পোস্টার সাঁটানো) যদি তিনি নাও করে থাকেন, তবুও আমরা তাকেই দায়ী করব। তাই যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে তার (প্রশাসকের) পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”
>> আরও পড়ুন
পরিবেশবাদী নেতা হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, “ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তাকে (ডিএসসিসি প্রশাসক) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাদের ঢাকা পরিষ্কার রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করবেন, সেখানে তার পোস্টারেই শহর অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে। এটা জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
তিনি আরও বলেন, “দেয়ালে পোস্টার তিনি (প্রশাসক) না লাগালেও শহরের পরিবেশ নষ্টের দায়ভার তার ওপরই পড়ে। তিনি এগুলো কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”
পোস্টার লাগানোর হিড়িক অন্যদেরও
ঢাকায় মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন। জামায়াত ‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ কর্মসূচি চালালেও তার নামে নগরজুড়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।
এমনকি উত্তরা আজমপুর এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত একটি গ্রাফিতির ওপর তার পোস্টার লাগানোয় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
ওই ঘটনায় অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন সেলিম উদ্দিন। পাশাপাশি গ্রাফিতির ওপর লাগানো তার পোস্টারগুলো অপসারণও করা হয়েছে।
>> আরও পড়ুন
তবে অন্যান্য স্থানে এই জামায়াত নেতার পোস্টার এখনো দেখা গেছে। ঢাকা উত্তর ছাড়িয়ে দক্ষিণ এলাকাতেও সাঁটানো পোস্টার দেখা গেছে। এর মধ্যে মালিবাগ রেলগেট এলাকাতেও তার পোস্টার রয়েছে।
এদিকে মেয়র পদ ছাড়াও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে ইচ্ছুকদের পোস্টার লাগানোর হিড়িক পড়েছে। ফলে নোংরা হচ্ছে ঢাকার অলিগলি, নষ্ট হচ্ছে শহরের সৌন্দর্য।
এএম/এএস




