বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর ‘গতিতে’ বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

Tareq
ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুনত্ব আনছেন তারেক রহমান। ছবি: ঢাকা মেইল

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে দেশ পরিচালনায় গতানুগতিক ধারার অবসান ঘটিয়ে নতুন সংস্কৃতির সূচনা করেন তারেক রহমান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনও সাতসকালে তিনি যাচ্ছেন নিজের দফতরে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময় অফিসে আসা-যাওয়া নিয়ে দিয়েছেন কড়া বার্তা। আবার সাধারণের ভোগান্তি কমাতে রাস্তায় চলছেন প্রটোকল ছাড়া, কখনো মিশে যাচ্ছেন সাধারণের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, দায়িত্ব গ্রহণের মাস না পেরোতেই ফ্যামিলি কার্ড নারীদের হাতে দেওয়াসহ নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে জোর চেষ্টা করছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।

সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর থেকে নেওয়া কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একদিকে প্রশাসনিক সংস্কার, অন্যদিকে কৃষকের ঋণ মওকুফ, খাল খননের মতো জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ।


বিজ্ঞাপন


যদিও এমন কর্মপরিকল্পনার মধ্যে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রবল আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। অবশ্য বড় ধরনের সংকটের আগেই সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং করে তেল সরবারহসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তেল সংগ্রহের জোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়ানোর খবর সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। অবশ্য অপরাধে জড়ানো নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

tAREQ2
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানকে দূরদর্শী চিন্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে সমস্যায় পড়তে হতে পারে- এমন আশঙ্কার কথা ফুটে উঠেছে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে। তবে বিলম্বে হলেও ইশতেহার সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীতে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় তিনি বলেন, সরকার গঠনের এক মাসের কম সময়ে ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছি। একে একে আমরা সব প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করব। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় হবে না। হয়তো বৈশ্বিক কারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে। 

ইশতেহার বাস্তবায়ন শুরু: দেশজুড়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) থেকে দেশজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির সূচনার মধ্য দিয়ে ইশতেহার বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পথে পা রাখল নতুন সরকার।

আরও পড়ুন

দুর্নীতি নিয়ে কড়া বার্তা নয়া প্রধানমন্ত্রীর

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে উপকারভোগী পরিবারগুলো ভাতা পাবে। ভাতার টাকা যাবে উপকারভোগীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে। তারা ঘরে বসেই ভাতা পাবেন।

আপাতত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরকার বলছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানামুখী চাপে থাকা মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড  শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’ হিসেবে কাজ করবে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা ডিজিটাল ডাটাবেজ ও কিউআর কোড যুক্ত ‘স্মার্ট কার্ড’ ব্যবহারের ফলে বিতরণে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ বন্ধ হয়েছে। প্রথম দিনেই এই উদ্যোগ প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।

Tareq3
সচিবালয়ে ছুটির দিনেও অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে সরকারের চালুকৃত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেবে এবং নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হবে বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন প্রকৃত উপকারভোগী খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন। তা না হলে অর্থের অপচয় হতে পারে বলে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।

১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সংস্কার

এদিকে প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তারেক রহমান। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে তাও ঠিক করা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজ ত্বরান্বিত করতে নিজেই প্রথা ভেঙেছেন প্রধানমন্ত্রী। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারেও তিনি নিয়মিত অফিস করছেন। বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো করছেন তদারকি। সাতসকালে অফিসে আসা এবং শেষ বিকেলে ফেরার কারণে সচিবালয়ে কাজে গতি ফিরেছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

‘অগ্নিপরীক্ষায়’ বিএনপি, সংসদে মুখোমুখি হচ্ছে নতুন অভিজ্ঞতার

সূত্র জানায়, সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে নীতিনির্ধারণী ফাইলে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না বলে ছুটির দিনে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই স্বল্পসময়ের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড কেবল চমক নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা। ১৮০ দিনের এই বিশেষ কর্মপরিকল্পনা এবং ইশতেহার বাস্তবায়নের এই গতি অব্যাহত রাখা গেলে দেশ আধুনিক ও সত্যিকারের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

ঋণ মওকুফে কৃষকের মুখে হাসি, চালু হচ্ছে কৃষি কার্ড

নির্বাচনি প্রচারের সময় তারেক রহমান সরকারে গেলে কৃষকদের জন্য নানা উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষকের জন্য ভর্তুকি, কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন বাস্তবায়ন করেছেন, অন্যদিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সার, ডিজেল ও বীজের ভর্তুকি এখন সরাসরি চাষির হাতে পৌঁছানোর জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

tAREQ4
জনতার কাতারে মিশে যাওয়ার চেষ্টায় তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

এর আগে প্রান্তিক চাষিদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তের কথা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সেচ সুবিধা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী আবারও শুরু হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘খাল কাটা কর্মসূচি’, যা কৃষি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় ১৬ মার্চ খালের খনন কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রটোকলহীন চলাচল ও জনভোগান্তি রোধ

এতদিন ভিভিআইপি হিসেবে সরকারপ্রধান সড়কে সর্বোচ্চ প্রটোকল নিয়ে চলাচল করতেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরদিন থেকে তারেক রহমান ভিভিআইপি প্রটোকল ছাড়াই চলাচল করছেন। তার এই সিদ্ধান্তটি সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক আইন মেনে রাস্তায় চলাচলের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিনের কৃত্রিম যানজট ও জনভোগান্তি দূর করেছেন। তার চলাচলের সময় রাস্তা বন্ধ রাখা কিংবা উচ্চ শব্দে সাইরেন বাজানোর সংস্কৃতি বন্ধের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন

শিগগিরই প্রশাসনে বড় রদবদল: ‘পছন্দের’ কর্মকর্তা খুঁজছেন মন্ত্রী-এমপিরা

এতে প্রতিনিয়ত সচিবালয়ে আসা-যাওয়ার পথে সাধারণ মানুষ কাছ থেকে দেখছেন দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। কেউ আবার স্মৃতিতে ধরে রাখতে গাড়ির মধ্যে বসা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তুলে রাখছেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য ভিআইপিরা প্রটোকল না নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলায় রাজধানীর রাস্তায় যানবাহনের গতি বেড়েছে। আগে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ছিল ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার, যা কি না পায়ে হাঁটা গতির সমান। এখন সেই গতি ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে।

সাশ্রয় ও কৃচ্ছতাসাধন

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারি দফতরে এসি ও ফ্যানের ব্যবহার সীমিত করে কৃচ্ছতাসাধনের যে পথ প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন, তা জাতীয় সম্পদ সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি নিজে এটি কঠোরভাবে মেনে চলছেন। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং বাজার সিন্ডিকেট দমনে বিশেষ টাস্কফোর্সের নজরদারি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Tareq5
যানজটে আটকে থাকছে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িও। ছবি: সংগৃহীত

খরচ কমানোর অংশ হিসেবে চলাচলের সময় প্রটোকলে গাড়ি অর্ধেক করা হয়েছে। অন্যদিকে রমজানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঘোষিত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ইফতারও বাতিল করেছেন তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের কথা মাথায় রেখে সরকারি দফতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করতে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারি দফতরগুলোতেও এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সংরক্ষিত আসনে চোখ বিএনপির সাবেকদের, ত্যাগের মূল্যায়ন চান নতুনরা

অন্যদিকে ইরানে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকট নিয়ে অস্থিরতা শুরু হলেও সরকার চেষ্টা করছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এজন্য জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা করা, দ্বিতীয়ত দামও নিয়ন্ত্রণে রাখায় জোর দেওয়া হচ্ছে সরকারের তরফে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকে যে কার্যক্রম চালাচ্ছেন তা অবশ্যই ইতিবাচক। এটা একদিকে যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, দ্বিতীয়ত তাকে সহযোগিতা করতে হবে। সর্বস্তরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। প্রশাসনে ও দলে দক্ষ, যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের জায়গা দিতে হবে। তাহলে পরিবর্তন অসম্ভব কিছু নয়।’

বিইউ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর