বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

সংরক্ষিত আসনে চোখ বিএনপির সাবেকদের, ত্যাগের মূল্যায়ন চান নতুনরা

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

সংরক্ষিত আসনে চোখ বিএনপির সাবেকদের, ত্যাগের মূল্যায়ন চান নতুনরা
সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির কয়েকজন নেত্রী। ছবি: ঢাকা মেইল।

# এমপি হওয়ার চেষ্টায় নতুনরা

# হাল ছাড়ছেন না সাবেকরাও


বিজ্ঞাপন


# হাইকমান্ডের কাছে ধরনা দিচ্ছেন আগ্রহীরা

# ত্যাগীদের মূল্যায়নের আশ্বাস বিএনপির

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বিএনপি। নতুন সরকারের পথচলা শুরু করতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় সরগরম হয়ে উঠেছে বিএনপির নারী রাজনীতির মাঠ। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের রাজপথের লড়াইয়ে পরীক্ষিত, ত্যাগী, উদীয়মান নেত্রীরা জোর চেষ্টা করছেন সংসদ সদস্য হতে। অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্যরাও মরিয়া সংসদের টিকিট পেতে। তাই দিন যত ঘনিয়ে আসছে আগ্রহীরা সবাই দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুমের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তারা।

অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ত্যাগী, দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বেছে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রোজা ও ঈদের আগে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে ৯০ দিনের মধ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান আসন বণ্টন অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিএনপি একাই ৩৫-৩৬টি আসন পেতে পারে।

অবশ্য সংরক্ষিত আসন ১০০টি করার একটি প্রাথমিক আলোচনা থাকলেও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ৫০টি আসনেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নতুন কোনো আইন পাস বা সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানের ৫০টি আসনেই ভোট করতে কোনো আইনি বাধা নেই।

641722531_1832855297262877_3914163624646695689_nত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার তালিকা ইতোমধ্যেই সংসদ সচিবালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই তালিকা কমিশনে পাঠাতে হয়। তারা ২৯৬ জনের তালিকা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা এখন আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

অভিজ্ঞতার পাল্লা বনাম রাজপথের ত্যাগ

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবার মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ত্যাগ, অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্য’-এই তিন ফর্মুলায় এগোবে দলটি। একদিকে সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রবীণ নেত্রীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জেল-জুলুম ও রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা ছাত্রদল, মহিলা দলের সাবেক নেত্রীদেরও মূল্যায়নের আভাস দিচ্ছেন নেতারা।

গতকাল সোমবার বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের বিষয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নারী আসনের প্রার্থী মনোনয়নের যোগ্যতা হবে দলের আদর্শ, নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকতে হবে, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিবিড় সম্পৃক্ততা থাকতে হবে, দলের জন্য ত্যাগ থাকতে হবে। আমাদের দলের মধ্যে যারা দলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত আছেন, যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

আলোচনায় যারা

দলের একদম সিনিয়র নারী সদস্যদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, শিরিন সুলতানার নাম আলোচনায় আছে। এর বাইরে দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী কনক চাঁপা এবং বেবী নাজনীনকে নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা আছে বলে জানা গেছে।

639059348_1228077078954205_6033101180092126430_n

তবে সাবেক এমপিদের বাইরে আলোচনার বড় একটি অংশ দখল করে আছেন ছাত্রদল ও মহিলা দলের মাঠে থাকা নেত্রীরা। এদের কেউ কেউ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মাঠে নামলেও শেষ পর্যন্ত দল প্রার্থী করেনি। 

কে কোন এলাকার জন্য আগ্রহী

জানা গেছে, সাবেক এমপিদের মধ্যে ফেনী থেকে রেহানা আক্তার রানু, জামালপুর থেকে নিলোফার চৌধুরী মনি, মাগুরা থেকে নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মাদারীপুর থেকে হেলেন জেরিন খান, ঢাকা থেকে সুলতানা আহাম্মেদ, চাঁদপুর থেকে রাশেদা বেগম হীরা, হবিগঞ্জ থেকে শাম্মী আক্তার, বরিশাল থেকে বিলকিস জাহান শিরিন, সিরাজগঞ্জ থেকে বরেণ্য সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা ও নীলফামারী থেকে বেবী নাজনীন আলোচনায় আছেন।

640449807_1257949482949901_1125782642366842711_nপাবনা থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য ও সাবেক ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, নরসিংদী থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক ও রামপুরা থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, বরগুনা থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক আসমা আজিজ, লক্ষ্মীপুর থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বিথিকা বিনতে হুসেইনের নাম আলোচনায় আছেন।

639559320_1954909888432568_889830969881821628_nএছাড়া ময়মনসিংহ থেকে তানজিন চৌধুরী লিলি, অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফাহসিনা হক লিরা, রাজশাহী থেকে বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবিবা ও রাজশাহী জেলা মহিলা দলের সভাপতি শামসাদ বেগম মিতালী, ঢাকা থেকে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া চৌধুরী বেবি, গোপালগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সাবরিনা বিনতে আহমেদ, ফেনী থেকে শাহানা আক্তার শানু, নরসিংদী থেকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, মাদারীপুর থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী শওকত আরা উর্মি, মুন্সীগঞ্জ থেকে নাসিমা আক্তার কেয়ার নাম আলোচনায় আছে।

638679827_1563154148094221_8834775767829969111_n

এছাড়া মানিকগঞ্জ থেকে মনিরা আক্তার রিক্তা, বরিশাল থেকে আফরোজা খানম নাসরিন, মানিকগঞ্জ থেকে রুকসানা খানম মিতু, বাগেরহাট থেকে আয়শা সিদ্দিকা মানি, কুমিল্লা থেকে হেনা আলাউদ্দিন, মেহেরপুর জেলা থেকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রাফিজা আলম লাকি, কুষ্টিয়া থেকে ফরিদা ইয়াসমিন, নারায়ণগঞ্জ থেকে সালমা আক্তার সোমা, নোয়াখালী থেকে শাহিনুর বেগম সাগর, বান্দরবান থেকে আলীকদম উপজেলা পরিষদের ৪ বারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বান্দরবান জেলা মহিলা দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিনা আক্তার, বিএনপির সাবেক নেতা প্রয়াত হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের (লেচু মিয়া) মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনার নামও আছে আলোচনায়।

অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিলেন না এমন কোনো কোনো সাবেক সংসদ সদস্য, ছাত্রদল-মহিলা দলের কেউ কেউ সুসময়ে দলে সক্রিয় হয়েছেন। নানা মাধ্যমে বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদে মাঠে থেকে গ্রেফতার হয়েছেন, মামলায় সাজা হয়েছে এমন নেত্রীরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। তবে মাঠে ছিলেন এমন নেত্রীরা বলছেন, প্রার্থী মনোনয়নের সময় দল যেন কারা মাঠে ছিলেন তাদের বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।

যা বলছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা 

বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দলের দুর্দিনে মাঠে সক্রিয় ছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে অংশ নিয়েছি। দলের কাছে এসব বিষয় অজানা নয়। যে কারণে আশা করি দল সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের ভূমিকার মূল্যায়ন করবে।’

639700922_835884756141985_3400593400804558844_n

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার পুরো আমলে মাঠে ছিলাম, জেল খেটেছি, এখনো মামলা আছে। কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। দুর্দিনের নেতাকর্মীদের দল যেন সঠিক মূল্যায়ন করে সেটাই চাওয়া।’

636687620_25658529710512450_4885446153640632875_n

মহিলা দলের ক্রীড়া সম্পাদক নিলুফা ইয়াসমিন নিলু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের সঙ্গে থেকে প্রত্যেক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছি। রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও শুরু থেকে মাঠে ছিলাম। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছি। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস আছে। তিনি সবার খবর রেখেছেন। আশা করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যখন দলের মিছিল করার জন্য হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ছিল সেই সময়েও আমরা মাঠে ছিলাম। পুরো আওয়ামী লীগের নিপীড়নের সময় দলের পাশে ছিলাম। দলের আদর্শ থেকে দূরে সরে যাইনি। বিশ্বাস করি সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও দল আমাদের কথা ভুলবে না।’

636474482_2096238057890322_1713400137389337830_n

মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্ব-নির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক আসমা আজিজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে বিগত ১৭ বছর প্রত্যক্ষভাবে রাজপথে আন্দোলনে সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। লাঠি-গুলি টিয়ারগ্যাস সাক্ষী আছে। রাজপথ কখনো তার সংগ্রামী সহযোদ্ধাকে ভুলে যায় না। তা মনে রেখেই একই সঙ্গে আমার নির্বাচনী এলাকা বরগুনা-১ এর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সক্রিয় আছি ছিলাম এবং থাকব ইনশাআল্লাহ।’

বিইউ/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর