- নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংসদে যাচ্ছে বিএনপি
- বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ
- গলার কাঁটা হতে পারে 'জুলাই সনদ' ও সংস্কার ইস্যু
- কার্যকর সংসদ উপহার দেওয়াই লক্ষ্য: চিফ হুইপ
দেড় যুগ ধরে একচ্ছত্র শাসন করা আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। লম্বা সময় ধরে রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম শেষে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। আগামী ১২ মার্চ বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। এই অধিবেশন ঘিরেই রাজনীতির ভেতরে-বাইরে চলছে না কৌতূহল।
বিজ্ঞাপন
কারণ এবার সংসদের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বিএনপি স্বস্তিতে থাকলেও রাষ্ট্র সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের নানামুখী চ্যালেঞ্জ এখন তাদের সামনে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো জামায়াত-এনসিপি জোট থাকছে সংসদের বিরোধী দলে। ফলে অতীতের চেয়ে সংসদের পুরো সময় এবার ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে দলটিকে।
তবে পরিস্থিতি যাই হোক, বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনাকে সাধুবাদ জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি বলছে, এবার তারা কার্যকর সংসদ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর।
রাজপথ থেকে সংসদে বিএনপি, নতুন কৌশলে তারেক রহমান
সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারকে এক সুতোয় গেঁথে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রশাসনিক সংস্কার থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল রাখা- সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন। বিশেষ করে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জনগণের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের তাগাদা দিচ্ছেন তিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে এমপি-মন্ত্রীদের খুটিনাটি প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে এতসব পরিকল্পনার পরও ১২ মার্চ ফুরফুরে মেজাজে সংসদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া বিএনপিকে রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল কর্মযজ্ঞ একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে বলে আলোচনা হচ্ছে।
মাঠের বন্ধু থেকে সংসদে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত
দীর্ঘদিন ধরে কখনো বিএনপি, কখনো আওয়ামী লীগ সংসদের বিরোধী দল হলেও এবারের দৃশ্য ভিন্ন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের আমলে একাধিকবার বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টিও এবার সংসদে নেই। তাই এবারের সংসদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং চ্যালেঞ্জিং দিক হলো বিরোধী দল। দীর্ঘদিনের রাজপথের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল। তাই বিএনপি ও জামায়াতের এই নতুন ‘মুখোমুখি’ অবস্থান সংসদীয় গণতন্ত্রে কেমন প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে।
ইতোমধ্যে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা বক্তব্য-বিবৃতিতে বলছেন, সংসদে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে গঠনমূলক সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন। এর আগে তারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনেরও কথা বলেছেন।
জামায়াত সূত্র বলছে, দেশে-বিদেশে থাকা জামায়াত-শিবির সমর্থিত বিভিন্ন খাতের দক্ষ লোকদের দিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ছায়া মন্ত্রণালয় গড়ে সার্বিক কার্যক্রমে নজর রাখবে। তারা ওই মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কাজ করবে।
যদিও বিএনপিও কৌশলগত কারণে ডেপুটি স্পিকার পদটি জামায়াতের জন্য ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। যা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক সমঝোতা ও একইসঙ্গে সংসদীয় লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াত এই পদটি নাও নিতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
এদিকে তরুণদের হাতে গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান রাষ্ট্র সংস্কারসবহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সরব। এমন অবস্থায় সংসদে দাবি-দাওয়া সামলানো বিএনপির নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ হতে পারে।
এখনো অমীমাংসিত 'জুলাই সনদ' ও সংস্কার ইস্যু
এদিকে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে অঙ্গীকার নিয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছে, তার অনেক কিছুই এখনো অমীমাংসিত। বিশেষ করে- জুলাই সনদের কিছু ধারা নিয়ে আদালতে রিট বিচারাধীন থাকায় সেগুলো আইনি কাঠামোতে আনার বিষয় রয়েছে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অসংখ্য অধ্যাদেশকে এই সংসদেই আইনি বৈধতা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এটি করতে ব্যর্থ হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
স্পিকার নির্বাচন ও নতুন এমপিদের নিয়ে চ্যালেঞ্জ
আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্বে থাকা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ১২ মার্চ অধিবেশনের শুরুতে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। যদিও তার ভাষণ দেওয়ার বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে আপত্তি উঠেছে। অবশ্য বিএনপি সংবিধানের কথা জানিয়ে এ নিয়ে বিরোধিতার সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
এদিকে স্পিকার হিসেবে কাউকে এখনো চূড়ান্ত করার কথা জানায়নি বিএনপি। তবে সম্ভাব্য একাধিক নেতার নাম আলোচনায় আছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচন করা হবে। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে জামায়াতকে দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত পায়নি বিএনপি। তবে তারা আশাবাদী জামায়াত ডেপুটি স্পিকার করার প্রস্তাবে সাড়া দেবে।
স্পিকার পদে ড. আবদুল মঈন খান, ড. ওসমান ফারুক, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বা জয়নুল আবদিন ফারুকের মতো হেভিওয়েট নামগুলো আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলের হাইকমান্ড।
এদিকে বিএনপির অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবারই প্রথম সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখছেন। তাদের সংসদীয় আচরণবিধি, বিল প্রণয়ন ও বাজেট বিশ্লেষণে দক্ষ করে তুলতে ইতোমধ্যে গুলশান কার্যালয়ে ৬ ও ৭ মার্চ নিবিড় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় সংসদ সদস্যদের নানা বিষয় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা চাই এবারের সংসদ হবে প্রাণবন্ত। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে আমরা সংসদকে ডিজিটাল ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করছি। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি নতুনদের মেধা ও তারুণ্যকে কাজে লাগিয়ে একটি কার্যকর সংসদ উপহার দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে জবাবদিহিতার জন্য। আমাদের অনেক নতুন মুখ থাকলেও আমরা অভিজ্ঞদের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে চাই।’
বিইউ/জেবি

