বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

দুর্নীতি নিয়ে কড়া বার্তা নয়া প্রধানমন্ত্রীর

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

T
সচিবালয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের মুহূর্তে কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি- সংগৃহীত

# সচিবালয়ে প্রথম দিন ব্যস্ততায় কাটল প্রধানমন্ত্রীর
# ইশতেহার বাস্তবায়নে সচিবদের কড়া বার্তা
# দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের নির্দেশনা
# সাধারণ সিগন্যালেই সচিবালয় ছেড়ে বাসায় প্রধানমন্ত্রী

দায়িত্ব নেয়ার পর নিজ কার‌্যালয়ে না গিয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে প্রথমদিন পার করলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিনের তুলনায় তার আগমনকে ঘিরে সচিবালয়ের পরিবেশ ছিল কিছুটা অন্যরকম। তবে আগের মতো কড়াকড়িও খুব একটা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোরের আলোয় তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকে ফিরে তিনি তার বাবা ও মায়ের কবর জিয়ারত করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করেন সচিবালয়ে। দিনভর মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবদের সঙ্গে  আলাদা বৈঠকে দেন নানা নির্দেশনা। জোর দেন সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে।


বিজ্ঞাপন


এদিকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়া কিংবা আগেও মন্ত্রী ছিলেন যারা তুলনামূলক কম পরিচিত তাদের সচিবালয়ে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বেশ কয়েকজনকে না চেনার জন্য প্রশ্নের মুখে পড়তে দেখা গেছে। পরে অবশ্য পরিচয় পেয়ে দ্রুত যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

2
সচিবালয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি- সংগৃহীত

এদিকে মন্ত্রীদের বৈঠকে জানানো হয়, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে আগামীদিনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব কাজ দৃশ্যমান করা হবে তা সহসাই জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় বিবেচনার বাইরে যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করার কথা সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে।

তবে রমজানের ঠিক একদিন আগে দায়িত্ব পাওয়ায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো সমস্যা না হওয়া-এসব বিষয়কে প্রাথমিক অগ্রাধিকার হিসেবে নতুন সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রীরা।


বিজ্ঞাপন


জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন মন্ত্রণালয় কী কাজ করবে, তা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

6
সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা রয়েছে। এগুলো হলো অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, 'আপনারা জানেন, প্রত্যেকটা সরকার প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি নেয়। আমাদের সরকার সেই কর্মসূচিটি একটু বৃহত্তর পরিসরে ১৮০ দিনের জন্য গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।'

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সালাহউদ্দিন আহমদ দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, কোনো ধরনের তদবির গ্রহণযোগ্য হবে না এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হবে। বাহিনীর মধ্যে কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

3
সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করছেন প্রধানমন্ত্রী। ছবি- সংগৃহীত

আর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হচ্ছে পবিত্র রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বিশেষ করে তারাবিহ ও ইফতারের সময়। মূলত এই তিন বিষয় অগ্রাধিকারে এসেছে।

উৎসবের আমেজ সচিবালয়

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম আগমন ঘিরে বুধবার সকাল থেকেই সচিবালয়ে ছিল অনেকটা উৎসবের আমেজ। প্রধানমন্ত্রী  ও অন্যান্য মন্ত্রীদের বরণ করতে সকাল থেকেই তৎপর ছিলেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

দুপুর  ১২টার কিছু পরে সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেট দিয়ে নিজ দফতরে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি তাকে অভ্যর্থনা জানান।

4
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সই করা পরিদর্শন বই। ছবি- সংগৃহীত

মন্ত্রী ও সচিবদের চোখেমুখে চ্যালেঞ্জের ছাপ

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমদিনের বৈঠক শেষে বের হওয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের চোখেমুখে ছিল নতুন চ্যালেঞ্জের ছাপ।

সরকারের সব সচিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের বলেছেন জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী রায় দিয়েছেন।সুতরাং সংবিধান ও আইনবিধি অনুযায়ী ওই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচিবেরা আন্তরিক হবেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সবাইকে আমরা বলেছি, কে, কার কী অ্যাফিলিয়েশন (সম্পৃক্ততা) আছে, সেটি আমরা দেখব না। আমরা মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই করব।’

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, জনগণ রায় দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহার দেখে। নিশ্চয়ই তারা ইশতেহারকে পছন্দ করেন। সেই ইশতেহার যেন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পূরণ হয়, সে জন্য সব সচিবের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করা দেশের জন্য ভালো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বৈঠকে সচিবদের উদ্দেশে বলা হয়েছে কয়েকদিন আগে নির্বাচনে আপনারা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। সেটা সবার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু জনগণ বিএনপিকে যে ইশতেহার দেখে নির্বাচিত করেছে তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’

শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনের শুরু

এরআগে দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দিনই বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ছুটে যান সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধে। বেলা ১১টায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ও মোনাজাত করেন। এরপর স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে সই করেন। পৃষ্ঠার একেবারে বাঁয়ে প্রথম সারিতে দিনের তারিখ লেখেন তিনি। এরপরের সারিতে নিজের নাম ‘তারেক রহমান’ ও পরিচয়ের সারিতে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’। পরের সারিতে মন্তব্যের জায়গায় প্রায় ১৫০ শব্দে নিজের মন্তব্য লেখেন তিনি। সর্ব ডানে করেন সই।

5
মা-বাবার কবর জিয়ারত শেষে দোয়া করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি- সংগৃহীত

পরিদর্শন বইয়ের মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, আমি এবং আমরা বিশ্বাস করি, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল— একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যই আমরা কাজ শুরু করেছি। আল্লাহ যেন আমাদেরকে জনগণের সামনে ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের তৌফিক দান করেন।’

বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত

সাভারের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর পর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাবা জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি তাদের সমাধিতে  ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এদিকে ১২টার পরে সচিবালয়ে ঢুকে প্রথমদিনের মতো দাফতরিক কাজ শেষে বাসার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী রওনা দেন রাত সাতটার দিকে। ভিভিআইপি হিসেবে চলাচলের সময় অতীতে রাস্তা বন্ধ করে যাওয়ার যে প্রথা ছিল তা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাভাবিক সিগন্যাল ব্যবহার করে বাসায় ফেরেন। যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে রীতিমতো আলোচনার ঝড় উঠেছে।

বিইউ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর