সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা অপরাধ প্রমাণে সাক্ষীর ভূমিকা, সাক্ষ্য-প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। গুরুতর ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, অন্য কী ধরনের প্রমাণ বিবেচনায় আসে এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে দেশটির আইন জানা জরুরি।
সৌদি আরবের প্রমাণ আইন, ২০২১-এর ৬৯ ধারায় সাক্ষ্যের ভিত্তি এবং ৭১ ধারায় সাক্ষীর সঙ্গে মামলার পক্ষগুলোর সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সাক্ষ্য সাধারণত প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দিতে হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোক্ষ তথ্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। সাক্ষীর ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মামলার পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও সাক্ষ্য মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইনটি মূলত দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক বিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফৌজদারি মামলায় এর প্রয়োগ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কার্যবিধি ও অন্যান্য আইনি বিধান বিবেচনা করতে হয়।
সৌদি ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৫ ধারা অনুযায়ী, তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার পক্ষগুলোর অনুরোধে সাক্ষীর বক্তব্য গ্রহণ করতে পারেন, যদি তা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে না করেন। অপরাধের ঘটনা, অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতা কিংবা তার নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক তথ্যও তদন্তে বিবেচিত হয়। ৯৬ ধারায় সাক্ষীর পরিচয় এবং মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নথিভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা কেমন?
বিচারিক পর্যায়ে সাক্ষ্য গ্রহণ ও যাচাইয়েরও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত অভিযোগ স্বীকার করলে আদালত তার বক্তব্য বিস্তারিতভাবে শুনে যাচাই করেন। স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য বলে সন্তুষ্ট হলে এবং অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন না থাকলে আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। ১৬২ ধারায় অভিযুক্ত অভিযোগ অস্বীকার করলে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিধান রয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগও রয়েছে। ১৬৩ ও ১৬৪ ধারায় সাক্ষী তলব, প্রমাণ উপস্থাপন এবং প্রয়োজন হলে সাক্ষীর বক্তব্য পুনরায় শোনার বিষয়ে আদালতের ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বা বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে করা আবেদন আদালত নাকচ করতে পারেন।
সাক্ষীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব মামলায় তা একমাত্র প্রমাণ নয়। অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী লিখিত নথি, ভিডিও ক্লিপ, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে ধারণ করা দৃশ্য, অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদন ও আইনসম্মত স্বীকারোক্তিও বিবেচনায় আসতে পারে। ভিডিও ফুটেজের ক্ষেত্রে উৎস, সত্যতা, সম্পাদনা বা বিকৃতির সম্ভাবনা এবং ঘটনার সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে হয়। কোনো ভিডিওতে কাউকে দেখা গেলেই সেটি একাই অপরাধে তাঁর সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে না। সাক্ষীর বক্তব্যে অসংগতি আছে কি না এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করে আদালত প্রমাণের গুরুত্ব নির্ধারণ করেন।
বাংলাদেশেও গুরুতর অপরাধের ঘটনায় সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও বিচার দীর্ঘায়িত হওয়া কিংবা অপরাধ প্রমাণে জটিলতা তৈরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দুর্বল তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা, প্রমাণের ঘাটতি ও বিচারিক বিলম্ব এর সম্ভাব্য কারণ। তবে নির্দিষ্ট মামলার নথি যাচাই ছাড়া কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের পাশাপাশি সাক্ষীর নিরাপত্তা ও অভিযুক্তের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকারও রক্ষা করা জরুরি।
আরও পড়ুন: ১০ মাসে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সৌদির
সৌদি আরবে ২০২৪ সালে তথ্যদাতা, সাক্ষী, বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় পৃথক আইন অনুমোদন করা হয়। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচয় গোপন রাখা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে ভয়ভীতি বা ক্ষতির ঝুঁকি কমানোই এ ধরনের সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে কী সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার বিস্তারিত তথ্য ও আদালতের রায়ের অনুলিপি চেয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া মামলায় কতজন সাক্ষী ছিলেন, তাদের বক্তব্য কী ছিল কিংবা কোন প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ অপরিহার্য। বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ পেলে জনআস্থা বাড়ে এবং তথ্য, অভিযোগ ও অনুমানের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট থাকে।
তথ্যসূত্র: সৌদি প্রমাণ আইন, ২০২১; সৌদি ফৌজদারি কার্যবিধি; সাক্ষী সুরক্ষা আইন, ২০২৪; বিএসএস




