মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা কেমন?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা কেমন?

শরিয়াহভিত্তিক আইনি কাঠামো, সাক্ষ্যপ্রমাণের গুরুত্ব ও গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তি সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। পাশাপাশি লিখিত আইন, বিশেষায়িত আদালত ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনছে দেশটি।

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি ইসলামি শরিয়াহ। দেশটির শাসনব্যবস্থার মৌলিক আইনে কোরআন ও সুন্নাহকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অপরাধের বিচার, পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি ও চুক্তিসংক্রান্ত মামলায় শরিয়াহর নীতির পাশাপাশি প্রযোজ্য লিখিত আইন অনুসরণ করা হয়।

সৌদি বিচারব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন ধরনের মামলার জন্য পৃথক আদালত এবং গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনকে আরও সুনির্দিষ্ট করা, আদালতের সেবা ডিজিটাল করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শরিয়াহর পাশাপাশি লিখিত আইন

সৌদি আরবের আদালত কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে শরিয়াহ প্রয়োগ করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রণীত যেসব আইন শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলোও বিচারিক কার্যক্রমে অনুসরণ করা হয়।

বিচারব্যবস্থাকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে দেশটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালের সাক্ষ্য আইন, ২০২২ সালের ব্যক্তিগত অবস্থাসংক্রান্ত আইন এবং ২০২৩ সালের দেওয়ানি লেনদেন আইন। এসব আইনে সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিবারিক সম্পর্ক, সম্পত্তি, চুক্তি ও দায়দায়িত্বের বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব আইনের ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিচারক ও মামলার পক্ষগুলোর জন্য প্রযোজ্য বিধান চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে। তবে সৌদি আরবের পুরো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা একটি পূর্ণাঙ্গ লিখিত দণ্ডবিধির অধীনে পরিচালিত হয় না। বিশেষ করে তাজির বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির ক্ষেত্রে শরিয়াহর নীতি ও প্রযোজ্য বিধান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের পরিকল্পনার কথা জানান। এর অংশ হিসেবে লিখিত ফৌজদারি দণ্ডবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি ফাঁস হওয়া খসড়া দণ্ডবিধির বিভিন্ন বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ খসড়াটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং জানিয়েছিল, দণ্ডবিধি প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলমান। তাই খসড়াটিকে কার্যকর আইন হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক নয়।

সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অপরাধের বিচার

সৌদি আরবের ২০২১ সালের সাক্ষ্য আইন বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এতে সাক্ষ্য ও বিভিন্ন ধরনের প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং মূল্যায়নসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। মামলার ধরন অনুযায়ী লিখিত নথি, স্বীকারোক্তি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বিচারিক সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে।

অপরাধের ধরন, প্রযোজ্য আইন এবং মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়। গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকায় অভিযোগ প্রমাণ ও বিচারিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসে। তবে সব অপরাধের জন্য একই শাস্তি নির্ধারিত নয়। অপরাধের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী শাস্তি ভিন্ন হয়।

আরও পড়ুন: ১০ মাসে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সৌদির

আদালতের কাঠামো কেমন

সৌদি আরবে সাধারণ ও বিশেষায়িত আদালতের সমন্বয়ে বিচারিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এর প্রধান স্তরগুলো হলো প্রথম স্তরের আদালত, আপিল আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট।

প্রথম স্তরের আদালতের মধ্যে রয়েছে সাধারণ আদালত, ফৌজদারি আদালত, ব্যক্তিগত অবস্থাসংক্রান্ত আদালত, বাণিজ্যিক আদালত ও শ্রম আদালত। এসব আদালত নিজ নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি করে।

আপিল আদালত প্রথম স্তরের আদালতের আপিলযোগ্য রায় পর্যালোচনা করে। সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারিত এখতিয়ারের মধ্যে আইনের প্রয়োগ ও বিচারিক সিদ্ধান্তের বৈধতাসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করে। ফলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উচ্চতর আদালতে রায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

প্রশাসনিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে ‘বোর্ড অব গ্রিভ্যান্সেস’। এর অধীনে প্রশাসনিক আদালত সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে উত্থাপিত নির্দিষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তি করে। বিভিন্ন ধরনের মামলার জন্য পৃথক আদালত থাকায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত বিচার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ডিজিটাল সেবায় বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ

সৌদি আরবের বিচার মন্ত্রণালয় ‘নাজিজ’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে মামলা-সংক্রান্ত নথি দেখা, বিভিন্ন আবেদন জমা দেওয়া এবং নির্ধারিত কিছু বিচারিক সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়।

ডিজিটাল সেবার ফলে অনেক ক্ষেত্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন কমে। নথি ও আবেদন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়ার কিছু কাজও সহজ হয়েছে।

কঠোর শাস্তি ও মৃত্যুদণ্ড

সৌদি আরবে হত্যা, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। 

সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আপিলের সব ধাপ শেষ হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ এবং কিছু মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে তাদের নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার বলে উল্লেখ করা হয়।

কর্তৃপক্ষ জানায়, তদন্ত শেষে আদালতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাজির বা বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে উচ্চতর আদালতে রায় বহাল থাকে এবং রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করা হয়।

আরও পড়ুন: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

বেত্রাঘাত ও শাস্তিব্যবস্থার পরিবর্তন

সৌদি আরবের শাস্তিব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তাজির-সংশ্লিষ্ট অপরাধে বেত্রাঘাতের পরিবর্তে কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান চালু করা হয়। তবে এই পরিবর্তন সব ধরনের শারীরিক শাস্তি বিলোপের সমতুল্য নয়। শরিয়াহর নির্দিষ্ট শাস্তির আওতাভুক্ত কিছু অপরাধে বেত্রাঘাতের বিধান বহাল থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযুক্তের অধিকার ও ন্যায্য বিচার

সৌদি আরবের ফৌজদারি কার্যবিধিতে গ্রেফতার, তদন্ত ও বিচারের নিয়ম উল্লেখ রয়েছে। ন্যায্য বিচারের জন্য অভিযুক্তকে অভিযোগ জানানো, নিজের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং আইনগত সহায়তা পাওয়া প্রয়োজন।

সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলার বিচার করে দেশটির বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালত।

তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই আদালতের কিছু মামলায় ন্যায্য বিচার না পাওয়া, আইনি সুরক্ষার ঘাটতি এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের কারণে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি আদালতের রায়, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ও আপিলের সুযোগও বিবেচনা করা জরুরি। 

বিদেশি শ্রমিকদের বিচারিক সুরক্ষা

সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। অনেক সময় বেতন না পাওয়া, নির্যাতন, পাসপোর্ট আটকে রাখা বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধের মতো সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। এসব ঘটনায় আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।

শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার বিরোধ মেটাতে সৌদি আরবে শ্রম আদালত রয়েছে। তবে আইনি প্রতিকার চাইলেই সব সমস্যার সমাধান সহজে হয় না। আরবি ভাষা না জানা, আইনজীবী নিয়োগের খরচ এবং নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক বিদেশি শ্রমিককে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেছে। এমন পরিস্থিতিতে আইনি সহায়তার পাশাপাশি নিজ দেশের দূতাবাসের সহযোগিতাও শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অপরাধের বিচার ও জনসমক্ষে প্রচার

অপরাধের বিচার এবং অপরাধের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা আলাদা বিষয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ ও প্রমাণের মূল্যায়নের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

সৌদি আরবে সব অপরাধীর পরিচয় বা অপরাধের বিবরণ গোপন রাখার সর্বজনীন নীতি রয়েছে, এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়। এসব বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়।

তথ্যসূত্র: সৌদি আরবের বিচার মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ল অ্যান্ড লিগ্যাল সিস্টেম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর