পোকা দমন ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি জমিতে ব্যাপক হারে ছিটানো হচ্ছে কীটনাশক। কীটনাশকের ব্যবহারে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। চলতি বোরো মৌসুমে ধানসহ সবজি খেতে কৃষক যে পরিমাণ ঝাঁঝাল গন্ধযুক্ত কীটনাশক ছিটাচ্ছে তাতে ফসলি জমির পাশ দিয়ে মানুষ নাক চেপে ধরে হাঁটাচলা করতে হচ্ছে। এর যথেচ্ছা ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্যের যেমন ক্ষতি করছে, তেমনি কীটনাশক খেয়ে ফেলছে মাটির উর্বরতা শক্তি। যার বড় একটি অংশ নানাভাবে যাচ্ছে মানব শরীরে। এতে করে মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণীও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। শস্যের উপকারী পোকামাকড় ও ফড়িং শেষ হওয়ার পথে। বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশকেও সয়লাব। জনসচেতনতা কিংবা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নেই কৃষিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের।
সম্প্রতি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে কৃষক খেয়ালখুশি মতো বোরোধানে কীটনাশক ছিটাচ্ছে। কীটনাশকের নাম এবং প্রয়োগবিধি সম্পর্কে অবগত নয় অনেকে। বিভিন্ন এলাকার এমন ৩০ জন কৃষক থেকে জানতে চাইলে মাত্র পাঁচ জন বলতে পেরেছে কীটনাশকের নাম। বাজারে ভেজাল কীটনাশকের বিষয়েও তাদের নেই কোনো ধারণা।
বিজ্ঞাপন
পৌরসভা ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক ওমর ফারুক তার বর্গা নেওয়া ৮০ শতক জমিতে বোরো চাষ করেছে। কীটনাশক ছিটানোর সময় তার থেকে জানতে চাওয়া হয় এর নাম এবং তার শরীরের সুবিধা- অসুবিধা সম্পর্কে। তিনি বলেন, জমিতে বাসুডিন দিয়েছি, এখন কাটার ওষুধ দিচ্ছি। তবুও পোকা দমন হচ্ছে না। ওষুধ ছিটানোর সময় তার হাত-পা জ্বলে, শ্বাসেও অসুবিধা হয় বলে জানান তিনি। একই ওয়ার্ডের কামরু বলেন, গ্যাস ছিটানোর কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসে অসুবিধা হয়। ত্বকও মাঝেমধ্যে জ্বলে। কিন্তু অসুবিধা হলেও কিছু করার নাই বলে জানান তিনি।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক আলতাফ মিয়াসহ তার পার্শ্ববর্তী একজন কৃষকও বলতে পারেননি ছিটানো কীটনাশকের নাম। জমিতে শুধু ইচ্ছে মতো সার ও গ্যাস ছিটাচ্ছেন তারা। নকল ও ভেজালের বিষয়ে দোকানদাররা-ই ভালো বলতে পারবেন বলে জানান আলতাফ মিয়া।
শুন্যেরচর গ্রামের সচেতন কৃষক হাজি আলতাফ হোসেন জানান, তার পার্শ্ববর্তী সব কৃষক ফসলি জমিতে খেয়ালখুশি মতো সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন। কোনো নিয়মনীতি জানারও চেষ্টা করছেন না। এতে অল্পসময়ে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্টসহ পরিবেশও দূষণ করে ফেলছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
একই গ্রামের সচেতন কৃষক খবির উদ্দিন জানান, মানুষ না জেনে না বুঝে ফসলে ইচ্ছে মতো কীটনাশক ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি এখানে কীটনাশকের মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নকল ও ভেজাল ওষুধ আঁচ করতে পারলেও ধরার উপায় নাই।
উপজেলার সাগুরিয়া বাজারের সার ও কীটনাশক বিক্রেতা আমিরুল ইসলাম জানান, ভালো নাকি ভেজাল চেনার উপায়ও থাকে না। একই ওষুধ অনেকসময় দামের পার্থক্যের কারণে ভালো কিংবা নকল বুঝে থাকি। তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন ভিত্তিক কৃষি উপসহকারীরা সরাসরি কীটনাশক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি সেজে ওষুধ সাপ্লাই দিয়ে থাকে। ভেজাল ওষুধ চিহ্নিত করার দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একইরকম মন্তব্য করেছেন উপজেলার মাইজদী বাজারের সার ও কীটনাশক বিক্রেতা আকবর হোসেনও।
ফসলি ক্ষেতে ক্রমবর্ধমান কীটনাশক ব্যবহারে হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত ভুগছেন শ্বাসকষ্টে। পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুল এবং জসিম জানান, আশপাশের অনেকে বোরোধান চাষ করেছে। সাপ্তাহ-সাপ্তাহ ওষুধ ছিটানোর ফলে অবিরাম গন্ধের ভেতর আমরা বসবাস করতে হয়। এতে নিশ্বাস নিতেও আমাদের কষ্ট হচ্ছে।
খেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী কাইয়ুম ও আফছার নাক চেপে ধরে যাওয়ার সময় বলেন, গ্যাসের গন্ধে বমি আসছে।তাই নাক ধরে যাচ্ছি।
এছাড়া, কীটনাশক ব্যবহারের যন্ত্র বা কৃষক নিজেই হাত-পা বা শরীর ধৌত করেন সেচ নালা, পুকুর, ডোবা, টিউবওয়েলসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে। এর মাধ্যমেও বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জলজ মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া ব্যবহৃত কীটনাশকের পাত্র যেখানে-সেখানে ফেলে রাখার কারণেও দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ডাক্তার আরিফ বলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. খাদ্যে বিষাক্ততার ঝুঁকি: কীটনাশক ব্যবহারে ফলমূল, শাকসবজি ও শস্যদানা থেকে মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, স্নায়ুবিক সমস্যা ও হরমোনজনিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
২. শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি: কীটনাশকের কণা বাতাসের মাধ্যমে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
৩. স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি: দীর্ঘ সময় ধরে কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকলে মাথাব্যথা, স্মৃতিভ্রংশ ও স্নায়ুবিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
৪. প্রজনন ও জন্মগত ত্রুটি: গবেষণায় দেখা গেছে- কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত ও জন্মগত ত্রুটি বৃদ্ধি পায়।
৫. কিডনি ও লিভারের সমস্যা: অতিরিক্ত কীটনাশক গ্রহণ লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
এ কারণে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, জৈবিক বিকল্পের প্রচলন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন এ চিকিৎসক।
পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা, নিবন্ধিত পরিবেশক ব্যতীত অন্য কেউ যাতে কীটনাশক বিক্রি করতে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোসহ উৎপাদনকারী, ভোক্তা ও সরকারের কৃষি বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে মাটির ক্ষতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ সবুজ জানান, বিভিন্ন মাঠ দিবস প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও মতবিনিময় সভায় কৃষকদের সঠিকভাবে কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করা হয়। আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় অধিকাংশ কৃষক প্রেশক্রিপশন ছাড়াই কীটনাশক ব্যবহার করে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এবছর হাতিয়াতে ১২ হাজার ৮৩০ হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিনিধি/এসএস