সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪, ঢাকা

আলুর গাছে পচন, লোকসানের শঙ্কায় চাষিরা

শুভ ঘোষ, মুন্সিগঞ্জ
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:২৭ এএম

শেয়ার করুন:

মুন্সিগঞ্জে আলুর চারায় পচন, লোকসানের শঙ্কায় চাষিরা
ছবি: ঢাকা মেইল

চলতি মৌসুমে মুন্সিগঞ্জে ৩৪ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছে স্থানীয় কৃষকরা। প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৩ মেট্রিকটন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ইতোমধ্যে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে চাষিদের কপালে। জেলার বেশির ভাগ আলুর জমিতে দেখা দিয়েছে চারা পচা রোগ। ঘনঘন ওষুধ স্প্রে করেও মিলছে না প্রতিকার। এরমধ্যেই নামিদামি ব্র্যান্ডের ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিতে জেলা কৃষি বিভাগকে পাশে না পেয়ে লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা। 

সরেজমিনে কয়েকটি উপজেলায় ঘুরে দেখা গেছে, চারা আলু গাছগুলোর পাতায় হলুদ ও কলচে রংয়ের দাগ পড়েছে। কোথাও কোথাও চারা গাছগুলোর কাণ্ড পচে গেছে। কোনো কোনো উপজেলায় শুকিয়ে যাচ্ছে আলুর গাছগুলো। অনেক জমিতে দেখা গেছে মাটিতে হেলে পড়েছে আলুর চারা। 


বিজ্ঞাপন


কৃষকরা জানিয়েছেন, গেল সপ্তাহ থেকে আলু গাছে পচন ধরেছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো পরামর্শও পাওয়া যাচ্ছে না জেলা কৃষি বিভাগ থেকে। অনলাইন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী একাধিক ব্র্যান্ডের ওষুধ ব্যবহার করেও প্রতিকার মিলছে না। বরং প্রতিদিনই চারা পচন বেড়েই চলেছে। এতে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার আলু চাষিদের সময়।

আরও পড়ুন
টানা বৃষ্টিতে উৎকণ্ঠায় আলু চাষিরা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৩৪ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছে কৃষকরা। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৩ মেট্রিকটন। তবে মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে জেলার ১২ হাজার হেক্টর জমির বীজআলু নষ্ট হয়ে গেছে। একই জমিতে আবাদ করতে হয়েছে দুই দফায়। অধিকাংশ জমিতে আবাদও হয়েছে বিলম্বে। 

অন্যদিকে সম্প্রতি আলুর চারা গাছে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে পচন রোগ।  ফলে আশানরূপ ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। ফলন ভালো না হলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও থাকছে বড় ধরনের শঙ্কা। চলতি মৌসুমে ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনের অধিক ফলনের আশায় কৃষকের যখন তোড়জোড়, তখন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে বেড়েছে সার-কীটনাশকের দাম।


বিজ্ঞাপন


টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, আলুর চারাগাছগুলোর পাতায় হলুদ ও কালচে দাগ পড়েছে। অনেক জমির আলু গাছের কাণ্ড পচে গাছগুলো মাটিতে মিশে গেছে। 

আরও পড়ুন
কৃষিবান্ধব উদ্যোগই কৃষকের গলার কাঁটা!

কৃষকরা জানান, প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার জমিতে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো থেকে আসা লোকদের দেখানো নিয়ম অনুযায়ী স্প্রে দিচ্ছি। তারপরও চারা গাছে পচন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত নামিদামি ব্র্যান্ডগুলোর ওষুধ ১২/১৫ দিন পরপর স্প্রে করার কথা বলে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকরা প্রতি সপ্তাহে ওষুধ স্প্রে করছেন। এছাড়াও নিয়মিত জমি পরিস্কার এবং জমিতে সেচ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না।  

আটপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, প্রতি সপ্তাহেই ওষুধ স্প্রে করছি। তারপরেও আলু গাছের পচন রোগ বেড়েই চলেছে। কোম্পানির লোকজন জমিতে এসে বিভিন্ন প্রদ্ধতিতে ওষুধ স্প্রে করতে পরামর্শ দিচ্ছে। আমরা তাদের শেখানো প্রদ্ধতিতে ওষুধ স্প্রে করছি, তবুও রোগ বেড়েই চলেছে। এছাড়া জেলা কৃষি বিভাগ পরামর্শ কিংবা সহযোগিতা না করার অভিযোগও করেছেন এই চাষি। 

বজ্রযোগীনি গ্রামের কৃষক শামসুদ্দিন বেপারী বলেন, জমিতে ওষুধ দিয়েই চলেছি। কিন্তু রোগ তো কিছুতেই থামছে না। বাজারের সবচেয়ে দামি ওষুধ ২৫০ গ্রাম ৯০০ টাকায় কিনে জমিতে দিলাম, তারপরেও চারা গাছের পচন বেড়েই চলেছে। মৌসুমের শুরুতে আলু চাষ করতে গিয়ে দুই দফা বৃষ্টিপাতের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একদিকে আলু বীজ পচে নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে বৃষ্টিপাতের কারণে এক মাসের বেশি সময় বিলম্ব হয়েছে। আলু চাষের জন্য নভেম্বর মাস উত্তম সময় হলেও এবার জানুয়ারির মাঝামাঝি এসে জমিতে আলুর চারা রোপন করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন
মুন্সিগঞ্জে দ্বিতীয় দফায় ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি

আউটশাহী গ্রামের আরেক আলু চাষি বলেন, জায়গা-জমি বন্ধক রেখে চলতি মৌসুমে আড়াইশো হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছি। এতে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। অসময়ের বৃষ্টিতে দুই দফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন আবার দেখা দিয়েছে আলুর চারা গাছে পচন রোগ। ওষুধ কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ফলে আলু চাষে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরও যদি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তাহলে পথে বসে যেতে হবে। 

সদর উপজেলার মহাকালী ইউনিয়নের আলু চাষি লোকমান হায়দার বেপারী বলেন, গেল বছর শেষ মুহূর্তে আলু বিক্রিতে লাভবান হয়েছে ব্যবসায়ীরা। তবে এতে খুব বেশি সুফল পায়নি কৃষকরা। তবুও ভালো দাম পাওয়ার আশায় চলতি মৌসুমে অন্তত ১৫০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছি। এবার সবকিছুর খরচ ছিল বেশি। মাথাপিছু ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় প্রতিদিন শ্রমিক নিয়ে চাষাবাদ করেছি। 

কয়েক বছরের তুলনায় আলু আবাদে ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। তার ওপর আলুর চারা গাছের ব্যাপক হারে পচন ধরা শঙ্কা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে জেলা কৃষি বিভাগ, সরকারি অন্য কোনো সংস্থা থেকে সহযোগিতা বা নির্দেশনামূলক পরামর্শ না পাওয়া গেলে অসংখ্য আলু চাষি পথে বসে যাবে।

আরও পড়ুন
প্লট কেনেননি উদ্যোক্তারা, অন্ধকারে মুন্সিগঞ্জের বৈদ্যুতিক শিল্পনগরী

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. মো. আব্দুল আজিজ ঢাকা মেইলকে বলেন, চলতি বছর ৩৪ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। যা আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। যেখানে আমাদের লক্ষ্যমাত্র ছিল ৩৪ হাজার ৩৪৬ হেক্টর। মুন্সিগঞ্জে যখন ঘনকুয়াশা আর মেঘলা আবহাওয়া ছিল তখন আমাদের আলু গাছের গ্রোথ ছিল না। সে সময়ও রোগবালাই গাছগুলোকে আক্রান্ত করতে পারেনি। এখন আবহাওয়া ভালো, তারপরেও রোগবালাই বা পচন রোগে আলু গাছগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। 

চাষিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন একরোভেড-এমজেড অথবা সিকিউর জাতীয় ওষুধগুলো সপ্তাহে একবার ভালোভাবে পুরো আলু গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। আর যদি গাছ পচন রোগে আক্রান্ত না হয়, তবে ডায়থেনএম-৪৫, একরোভেট এম-৪৫ জাতীয় ওষুধগুলো স্প্রে করতে হবে। যেহেতু এখনো ফসল উত্তোলন শুরু হয়নি, তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সরকারিভাবে আর্থিক প্রণোদনা বা সহযোগিতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

তবে হঠাৎ আলুর চারা গাছে এমন পচনের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। কারণ আলু মুন্সিগঞ্জে প্রধান অর্থকারী ফসল এবং দেশের অর্থনৈতিক চাকার অন্যতম চালিকাশক্তি।

প্রতিনিধি/এইউ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর