ধর্ম ডেস্ক
২১ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ‘মানুষের মধ্যে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এই ঘরের হজ করা ফরজ।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭) হজ একটি ধারাবাহিক ইবাদত, যার প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে সম্পাদন করা আবশ্যক। নিচে তামাত্তু হজের আলোকে ধাপে ধাপে বিধান তুলে ধরা হলো।
তামাত্তু হজকারীরা ৮ই জিলহজ হুদুদে হারামের যেকোনো স্থান থেকে হজের নিয়তে নতুন করে ইহরাম বাঁধেন। ইহরামের কাপড় পরে তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...) পাঠের মাধ্যমে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ইহরাম বেঁধে জোহরের আগেই মিনায় পৌঁছানো সুন্নত।
৮ই জিলহজ জোহর থেকে ৯ই জিলহজ ফজর পর্যন্ত মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ও রাত যাপন করা সুন্নত। এটি মূলত হজের মূল ধাপগুলোর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি।
৯ই জিলহজ সূর্যোদয়ের পর হাজিরা মিনা থেকে আরাফাতের দিকে রওনা হন।
অবস্থান (ফরজ): জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান ফরজ। এক মুহূর্তের জন্যও এই সময়ে অবস্থান না করলে হজ হবে না।
নামাজ: মসজিদে নামিরায় ইমামের সাথে জামাতে শরিক হলে জোহর ও আছর একত্রে (জমে তাকদিম) পড়া যায়। তবে যারা নিজ তাঁবুতে পড়বেন, তাদের জোহর ও আসর যার যার নির্ধারিত ওয়াক্তে আলাদাভাবে আদায় করতে হবে।
করণীয়: সূর্যাস্ত পর্যন্ত তালবিয়া, দোয়া, ইস্তেগফার ও কান্নাকাটির মাধ্যমে সময় কাটান। এটিই হজের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। সূত্র: সহিহ মুসলিম: ১২১৮; ফতোয়ায়ে শামি: ২/৪৬৭
আরও পড়ুন: আরাফার ময়দানে কতক্ষণ থাকতে হবে, কী দোয়া পড়বেন- সম্পূর্ণ গাইড
সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়।
নামাজ (ওয়াজিব): মুজদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশা এক আজান ও দুই ইকামতে একত্রে আদায় করা ওয়াজিব।
রাতযাপন ও অবস্থান: খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করা সুন্নত। ১০ই জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্যোদয়ের আগে কিছু সময় মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব।
পাথর সংগ্রহ: শয়তানকে মারার জন্য এখান থেকেই অন্তত ৪৯টি (বা ৭০টি) ছোট কঙ্কর সংগ্রহ করুন। সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে: ২/৪৭৭; হেদায়া: ১/১৬৫
এদিন নিচের চারটি কাজ নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় করতে হয়-
ক. রমি- বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ: মিনায় পৌঁছে শুধু বড় শয়তানকে (জামারায়ে আকবা) ৭টি পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
খ. কোরবানি (দমে শোকর): পাথর মারার পর হজের কোরবানি আদায় করা ওয়াজিব। তামাত্তু ও কিরান হাজিদের জন্য এটি অপরিহার্য।
গ. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা (হলক/কসর): কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করা ওয়াজিব। এর মাধ্যমে হাজিরা ইহরামমুক্ত হন — স্বামী-স্ত্রী মিলন ছাড়া অন্য সব স্বাভাবিক কাজ বৈধ হয়ে যায়।
ঘ. তাওয়াফে জিয়ারত (ফরজ): ১০ই জিলহজ থেকে ১২ই জিলহজের মধ্যে তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করা উত্তম। হানাফি মাজহাবে এর উত্তম সময় ১০ই জিলহজ। ১২ জিলহজের পরে আদায় করলে দম ওয়াজিব হয়। তাওয়াফের পর সাফা-মারওয়া সাঈ করতে হবে এবং এই তাওয়াফের পর স্ত্রী সহবাসও বৈধ হয়ে যায়। সূত্র: দুররে মুখতার: ২/৫১১; ফতোয়ায়ে শামি: ২/৫১৮
আরও পড়ুন: হজ করার সময় শয়তানকে পাথর মারতে হয় কেন?
১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। এই দুই দিন সূর্য ঢলার পর থেকে পরদিন সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত তিনটি শয়তানকে (ছোট, মধ্যম ও বড়) ৭টি করে মোট ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
১২ তারিখ পাথর নিক্ষেপ করে সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করা জায়েজ। তবে ১৩ তারিখ সুবহে সাদিক পর্যন্ত মিনায় থাকলে সেদিনও পাথর নিক্ষেপ ওয়াজিব হয়ে যায়। সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে: ২/৪৯৫; হেদায়া: ১/১৭২
দূরদেশ থেকে আসা হাজিদের জন্য মক্কা ত্যাগের আগে সর্বশেষ একটি তাওয়াফ করা ওয়াজিব, একে বিদায়ী তাওয়াফ বলে। হজ শেষে সবশেষে যে নফল তাওয়াফ করা হয় তা-ই বিদায়ী তাওয়াফ হিসেবে গণ্য হয়। ঋতুস্রাব চলাকালীন নারীদের জন্য এই তাওয়াফ মাফ। সূত্র: সহিহ বুখারি: ১৭৫৫; ফতোয়ায়ে শামি: ২/৫৩৩
হজের ফরজ (৩টি)- হানাফি মাজহাব অনুযায়ী-
| ক্র. | বিবরণ |
| ১ | ইহরাম পরিধান ও তালবিয়া পাঠ করা |
| ২ | ৯ই জিলহজ আরাফায় অবস্থান করা |
| ৩ | তাওয়াফে জিয়ারত (ফরজ তাওয়াফ) সম্পন্ন করা |
যেকোনো একটি ফরজ ছুটে গেলে হজ বাতিল হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত কার্যাবলী
হজের ওয়াজিব (৮টি)-
| ক্র. | বিবরণ |
| ১ | সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা |
| ২ | মুজদালিফায় নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করা |
| ৩ | মুজদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে আদায় করা |
| ৪ | শয়তানকে পাথর (রমি) নিক্ষেপ করা |
| ৫ | হজের কোরবানি (দমে শোকর) করা- তামাত্তু ও কিরান হাজিদের জন্য |
| ৬ | মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা |
| ৭ | বিদায়ী তাওয়াফ করা |
| ৮ | রমি, কোরবানি ও হলকের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা |
কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে হজ আদায় হয়, তবে দম (কোরবানি) ওয়াজিব হয়।
وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ ‘তোমরা আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা: ১৯৬) হজের দীর্ঘ এই সফরে ধৈর্যের সাথে প্রতিটি মাসয়ালা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে তবেই তা ‘হজ্জে মাবরুর’ হিসেবে আল্লাহর দরবারে কবুল হবে ইনশাআল্লাহ। বিস্তারিত মাসয়ালার জন্য অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র:সুরা আলে ইমরান: ৯৭; সুরা বাকারা: ১৯৬; সহিহ মুসলিম: ১২১৮; সহিহ বুখারি: ১৭৫৫; হেদায়া: ১/১৬৫-১৭২; ফতোয়ায়ে শামি: ২/৪৬৭-৫৩৩; দুররে মুখতার: ২/৫১১; বাদায়েউস সানায়ে: ২/৪৭৭-৪৯৫