images

ইসলাম

জাকাত প্রদানে ভুল করছেন না তো? জেনে নিন সঠিক বিধান

ধর্ম ডেস্ক

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

ইসলামে ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হলো নামাজ ও জাকাত। পবিত্র কোরআনুল কারিমের বহু স্থানে নামাজ কায়েমের নির্দেশের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের আদেশ এসেছে। জাকাত কেবল ঐচ্ছিক দান নয়; এটি ধনীদের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘তোমরা সালাত আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর নিকট পাবে।’ (সুরা বাকারা: ১১০)
তবে জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় পড়েন- কাকে জাকাত দেওয়া যাবে, আর কাকে নয়। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

জাকাতের নির্ধারিত খাতসমূহ

পবিত্র কোরআনে জাকাতের আটটি খাত সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাতকর্মী, যাদের মনোরঞ্জন উদ্দেশ্য তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরের জন্য। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।’ (সুরা তাওবা: ৬০)

আরও পড়ুন: জাকাত: ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে

১. দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত: যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে কষ্ট হয়, তাকে জাকাত দেওয়া যাবে।
(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১০৫৩৬)
২. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যে ব্যক্তি ঋণের চাপে জর্জরিত এবং ঋণ পরিশোধের পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে না, সে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত।
৩. বিপদগ্রস্ত মুসাফির: কোনো ব্যক্তি নিজ এলাকায় সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও সফরে এসে অভাবী বা সম্পদশূন্য হয়ে পড়লে তাকে প্রয়োজন পরিমাণ জাকাত দেওয়া যাবে।
৪. দরিদ্র আত্মীয়স্বজন: ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাগনে, চাচা-মামা, ফুফু-খালা এবং অন্যান্য আত্মীয় যদি জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হন, তবে তাদের জাকাত দেওয়া যাবে। এতে সদকার সওয়াবের পাশাপাশি আত্মীয়তা রক্ষার (সিলাহ রেহমি) সওয়াবও পাওয়া যায়। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭১৬৪)

আরও পড়ুন: জাকাত গণনায় সচরাচর যেসব ভুল করি

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে না

১. নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক: যার কাছে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সমমূল্যের জাকাতযোগ্য সম্পদ (নগদ টাকা, স্বর্ণ, ব্যবসায়িক পণ্য) আছে, তাকে জাকাত দেওয়া যাবে না। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭১৫৬)
২. অমুসলিম: জাকাত কেবল মুসলিমদের হক। অমুসলিমকে জাকাত দেওয়া জায়েজ নয়; তবে তাদের নফল দান-সদকা করা যাবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭১৬৬)
৩. উর্ধ্বতন ও অধস্তন আত্মীয়: নিজের জন্মদাতা মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং নিজের মাধ্যমে যারা দুনিয়ায় এসেছে অর্থাৎ সন্তান, নাতি-নাতনি এদের জাকাত দেওয়া যাবে না। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত দিতে পারবেন না। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৫৮)
৪. বনু হাশেমের লোক: মহানবী (স.)-এর বংশধরদের (সৈয়্যদ বংশ) জন্য জাকাত বা সদকা গ্রহণ বৈধ নয়।
৫. ধনী ব্যক্তির নাবালক সন্তান: যদি পিতা ধনী হন, তবে তার নাবালক সন্তানকে জাকাত দেওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন: যাদের জাকাত দিলে সওয়াব বেশি, যাদের দিলে কবুল হবে না

জাকাত আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও নিয়ম

মালিক বানিয়ে দেওয়া (তামলিক): জাকাত আদায়ের জন্য মৌলিক শর্ত হলো- উপযুক্ত ব্যক্তিকে সম্পদের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। সরাসরি তার হাতে টাকা তুলে না দিয়ে তার ঘর মেরামত বা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করলে জাকাত আদায় হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৫৭)

জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়: মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি, কূপ খনন, দাফন-কাফন কিংবা ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন—এসব খাতে জাকাত ব্যয় করা যাবে না। জাকাতের টাকা সরাসরি হকদারের হাতে পৌঁছানো জরুরি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭১৭০)

গৃহকর্মীকে প্রদান: গৃহকর্মী অভাবী হলে তাকে জাকাত দেওয়া যাবে; তবে তা বেতনের অংশ হিসেবে নয়; বরং বেতনের অতিরিক্ত হিসেবে তাকে মালিক বানিয়ে দিতে হবে।

ভুলবশত প্রদান: কাউকে দরিদ্র মনে করে জাকাত দেওয়ার পর যদি জানা যায় সে ধনী ছিল, তবে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু যদি জানা যায় গ্রহীতা অমুসলিম ছিল, তবে পুনরায় জাকাত আদায় করতে হবে।

জাকাত কোনো আনুষ্ঠানিক দান নয়; এটি ফরজ ইবাদত এবং সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী ঐশ্বরিক ব্যবস্থা। জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক খাত নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীনদার ও প্রকৃত অভাবী ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিলে জাকাতের উদ্দেশ্য পূর্ণতা পায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে ও সঠিক খাতে জাকাত আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।