ধর্ম ডেস্ক
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
জাকাত ইসলামি অর্থনীতি ও ইবাদতের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমরা জাকাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব না করে নামমাত্র কিছু টাকা বা শাড়ি-লুঙ্গি বিলি করে মনে করি দায়িত্ব শেষ। যথাযথ হিসাব ছাড়া জাকাত দিলে তা যেমন অভাবী মানুষের উপকারে আসে না, তেমনি জাকাতদাতার ফরজও অনাদায়ী থেকে যেতে পারে। জাকাত গণনায় সাধারণত যেসব ভুল হয়ে থাকে, তার একটি দালিলিক ও নির্ভরযোগ্য গাইড নিচে তুলে ধরা হলো।
অনেকে স্বর্ণ বা রূপার গয়না যে দামে কিনেছিলেন, সেই দামেই জাকাত হিসাব করেন। এটি একটি ভুল পদ্ধতি।
সঠিক বিধান: জাকাত দেওয়ার দিন ওই স্বর্ণ বা রূপার বর্তমান বাজারমূল্য কত, সেই হিসেবে ২.৫ শতাংশ জাকাত দিতে হবে। (তথ্যসূত্র: হিদায়া: ১/১৯৬; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২২)
অনেকে মনে করেন শুধু জমানো সোনা বা বিস্কুট সোনার জাকাত দিতে হয়, ব্যবহৃত গয়নার নয়।
সঠিক বিধান: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, নেসাব পরিমাণ হলে ব্যবহৃত সোনা-রূপার ওপরও জাকাত ফরজ। (তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: ১৫৬৩; ফতোয়ায়ে শামি: ২/২৯৫)
আরও পড়ুন: ব্যবহৃত অলংকারের জাকাত দিতে হবে কি?
অনেকে মনে করেন সাড়ে সাত তোলা সোনা না থাকলে জাকাত দিতে হবে না। কিন্তু আপনার কাছে যদি কিছু সোনা, কিছু রূপা এবং কিছু নগদ টাকা থাকে, তবে সব মিলিয়ে হিসাব করতে হবে।
সঠিক বিধান: সোনা, রূপা ও নগদ টাকা সব মিলিয়ে যদি সাড়ে ৫২ তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ (বর্তমানে আনুমানিক ৯০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা- বাজারদর অনুযায়ী যাচাইযোগ্য) সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। (তথ্যসূত্র: আল-বাহরুর রায়েক: ২/২৪৩)
অনেকে ব্যাংক লোন বা গৃহনির্মাণ ঋণের পুরো টাকা মূল সম্পদ থেকে বিয়োগ করে জাকাতযোগ্য সম্পদ শূন্য বানিয়ে ফেলেন।
সঠিক বিধান: আধুনিক ফিকহি দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী ঋণের (Long-term debt) ক্ষেত্রে কেবল আগামী এক বছরের কিস্তি বা বকেয়া কিস্তি বিয়োগ করা যাবে, ঋণের পুরো টাকা বিয়োগ করা যাবে না। (তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ২/২৬১)
আরও পড়ুন: জাকাতের উপযুক্ত কারা? আত্মীয়-স্বজনদের জাকাত দেওয়ার বিধান কী?
চাকরিজীবীরা অনেকেই প্রভিডেন্ট ফান্ড বা জীবন বীমায় জমাকৃত টাকা জাকাতের হিসাবে আনেন না।
সঠিক বিধান: প্রভিডেন্ট ফান্ডের যে পরিমাণ টাকা আপনার মালিকানাধীন এবং যা আপনি প্রয়োজনে উত্তোলন করতে পারেন, তার ওপর জাকাত আসবে। তবে বাধ্যতামূলক ফান্ডের ক্ষেত্রে টাকা হস্তগত হওয়ার পর বিগত বছরের জাকাত দিলেও আদায় হবে। (তথ্যসূত্র: আহসানুল ফতোয়া: ৪/২৬০)
ব্যবসায়ীরা অনেক সময় শুধু নগদ টাকার জাকাত দেন, দোকানের মালের হিসাব করেন না।
সঠিক বিধান: বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা প্রতিটি পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য বা পাইকারি মূল্যের (Wholesale price) ওপর জাকাত দিতে হবে। তবে দোকানের ডেকোরেশন, আসবাবপত্র বা ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ওপর জাকাত নেই। (তথ্যসূত্র: বাদায়েউস সানায়ে: ২/২১)
অনেকে মনে করেন জমি বা প্লট থাকলে জাকাত দিতে হয় না।
সঠিক বিধান: যদি জমি বা ফ্ল্যাটটি পুনরায় বিক্রির উদ্দেশ্যে কেনা হয় (Investment property), তবে প্রতি বছর তার বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী জাকাত দিতে হবে। কিন্তু নিজের বসবাসের জন্য বা ভাড়ার উদ্দেশ্যে হলে তার মূল্যের ওপর জাকাত নেই, শুধু অর্জিত ভাড়ার ওপর জাকাত আসবে। (তথ্যসূত্র: হিদায়া: ১/১৮০)
আরও পড়ুন: যেসব সম্পদের জাকাত দেওয়া ফরজ
জাকাত হিসাব করতে হয় হিজরি বছরের (চাঁদের মাস) হিসেবে। ইংরেজি বছরের চেয়ে হিজরি বছর প্রায় ১১ দিন কম হয়।
সঠিক বিধান: ইংরেজি বছরে জাকাত দিলে প্রতি ৩৩ বছরে এক বছরের জাকাত কম দেওয়া হয়। তাই জাকাতের হিসাব হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করা আবশ্যক। (তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে শামি: ২/২৯৪)
কাউকে ধার দেওয়া টাকা বা ব্যবসায়িক পাওনা অনেকে হিসাবে ধরেন না।
সঠিক বিধান: যে পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার আশা আছে, তারও জাকাত দিতে হবে। চাইলে টাকা পাওয়ার পর বিগত বছরের জাকাত একসাথে দেওয়া যায় অথবা প্রতি বছর নগদ সম্পদের সাথে হিসাব করা যায়। (তথ্যসূত্র: আল-মাবসুত ৩/৩২)
জাকাতের টাকা দিয়ে অনেকে রাস্তা মেরামত, টিউবওয়েল বসানো বা মসজিদে ফ্যান কিনে দেন।
সঠিক বিধান: জাকাত আদায়ের জন্য ‘তামলিক’ বা দরিদ্র ব্যক্তিকে সরাসরি মালিক বানিয়ে দেওয়া শর্ত। জনকল্যাণমূলক কাজে যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেওয়া হয় না, তাই এতে জাকাত আদায় হবে না। (তথ্যসূত্র: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৮৮)
জাকাত আল্লাহর নির্ধারিত আমানত এবং আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন। এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন।’ (সুরা তাওবা: ১০৩) সুতরাং, নিজের হিসাব ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে নির্ভুল হিসাবের প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের ফরজ দায়িত্ব।
সহযোগিতায়: ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া আহলিয়া মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ফিকহি সূত্র।