ধর্ম ডেস্ক
২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০৬ পিএম
জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও এতে রয়েছে অনেক বড় পুরস্কার। হাদিস অনুযায়ী, জিহ্বার সংযম পরকালে জান্নাতলাভের উপায় হয়ে যাবে। কিন্তু যার জিহ্বা ভুল পথে পরিচালিত হবে, সে হবে জাহান্নামি। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কাছে এই অঙ্গীকার করবে যে, সে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত জিহ্বা এবং তার দুই পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর জিম্মাদার হবে, তবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব।’ (সহিহ বুখারি : ৬৫৫২)
মহান আল্লাহ বান্দাকে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য জিহ্বা দিয়েছেন, কিন্তু একে লাগামহীন ব্যবহার করা থেকে সতর্কও করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা সংরক্ষণের জন্য) তার নিকটে সদাতৎপর একজন প্রহরী আছে।’ (সুরা ক্বাফ: ১৮) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আমার বান্দাদের বলে দাও, তারা যেন এমন কথাই বলে, যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৫৩)
আরও পড়ুন: সুন্দর আচরণের প্রতিদান
জিহ্বা মানুষকে যেভাবে সাফল্যের শীর্ষে সমাসীন করতে পারে, তেমনি ধ্বংসের অতলেও ডোবাতে পারে। কটুকথা, পরনিন্দা, গাল-মন্দ, মিথ্যা বলা ইত্যাদি গুনাহ জিহ্বার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। তাই মুমিনদের জন্য জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ অনেক বড় আমল। প্রকৃত মুমিনদের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন: ৩)
উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (স.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, মুক্তির উপায় কী? তিনি বললেন, নিজের জিহ্বাকে আয়ত্তে রাখো, নিজের ঘরে পড়ে থাকো এবং নিজের পাপের জন্য কান্নাকাটি করো।’ (তিরমিজি: ২৫৮৬)
জিহ্বাকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে রাখতে হবে। আল্লাহর জিকির ও দ্বীন ইসলামের খেদমতে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করে। (হামিম সাজদাহ: ৩৩) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে। তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং নিষেধ করবে মন্দ কাজ থেকে। (সুরা ইমরান: ১)
আরও পড়ুন: সৎকাজের আদেশ ও অন্যায়ে বাধা দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন-‘হে রাসুল আপনি বলে দিন এটাই আমার রাস্তাা আমি জেনে বুঝে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকি, এটা আমার কাজ এবং তাদের কাজ যারা আমার অনুসারি তথা আমার উম্মত। (সুরা ইউসুফ: ১০৭)
জিহ্বাকে কোনো অবস্থাতেই না-হক পথে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ জিহ্বা ঠিক থাকলে দেহের অঙ্গসমূহ ঠিক থাকবে আর জিহ্বা বাঁকা হলে অন্য অঙ্গগুলোও বাঁকা হয়ে পড়বে। তাই দেহের অঙ্গসমূহ প্রতিদিন ভোরে জিহ্বার সঠিক ব্যবহারের জন্য ফরিয়াদ করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (স.) বলেন, ‘যখন আদম সন্তান ভোরে ওঠে তখন তার অঙ্গসমূহ জিহ্বাকে বিনয়ের সঙ্গে বলে, আমাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, আমরা সবাই তোমার সঙ্গে জড়িত। সুতরাং তুমি ঠিক থাকলে আমরাও ঠিক থাকব। আর তুমি বাঁকা হলে আমরাও বাঁকা হয়ে পড়ব।’ (তিরমিজি: ২৫৮৭)
জিহ্বার ব্যবহারই প্রমাণ করবে ব্যক্তিসত্তা সৎ নাকি অসৎ। অসৎ ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ শাস্তি। হাদিসে আছে, হজরত সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ সাকাফি (রা.) বলেন, একদিন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার জন্য যেই জিনিসগুলো ভয়ের কারণ বলে আপনি মনে করেন তন্মধ্যে সর্বাধিক ভয়ঙ্কর কোনটি? বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি নিজের জিহ্বা ধরলেন এবং বললেন, এটা। (তিরমিজি: ২৫৯২)
আরও পড়ুন: হাদিসের আলোকে সর্বোত্তম ১৭ আমল
অন্য হাদিসে আছে, আসলাম (রা.) বলেন, একদিন হজরত ওমর (রা.) হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে গেলেন, তখন তিনি স্বীয় জিহ্বা টানছিলেন, হজরত ওমর বললেন, থামুন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুক! ব্যাপার কী? তখন হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, এটাই আমাকে ধ্বংসের স্থানসমূহে অবতীর্ণ করেছে। (মুয়াত্তা মালেক: ১৮২৫)
যেখানে জলিলুল কদর সাহাবিরাই জিহ্বার অসংযতা নিয়ে সতর্ক থাকতেন, সেখানে আমাদের কী অবস্থা হবে চিন্তা করুন। তাই সবসময় আমাদের বুঝেশুনে কথা বলা উচিত। এছাড়াও ব্যক্তিত্বের অবনতি ও অবক্ষয় হয় কথার কারণেই। জ্ঞানী তো সে, যে চিন্তাভাবনা করে ও বুঝেশুনে জিহ্বার ব্যবহার করে। কেননা মুখ ফসকে বের হওয়া কথা এবং ধনুক থেকে ছুটে যাওয়া তীর কখনোই ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই যত কম কথা বলা যায় ততই কল্যাণকর। ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেন, যে নীরবতা অবলম্বন করে সে মুক্তি পায়। (তিরমিজি: ২৪৮৫)
কথা বলার পর আফসোসের পরিবর্তে আগে থেকেই চুপ থাকা শ্রেয়। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে।’ (বুখারি: ৬০১৮; মুসলিম: ১৮২)
আরও পড়ুন: ছোট-বড় শিরক চেনার ও আত্মরক্ষার উপায়
ঈমানদার ও বিশ্বাসীর কথাবার্তা সবসময় উত্তম এবং প্রভাবপূর্ণ হয়। সে অনর্থক কথা ও কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মহানবী (স.) বলেছেন, অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করা মানুষের উন্নত ইসলামের প্রমাণ। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক) আবু মুসা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সর্বোত্তম মুসলিম কে?’ তিনি বললেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। (বুখারি: ১১, মুসলিম: ১৭২)
অতএব, ভালো কথাই কেবল বলতে হবে। মন্দ কথা পরিহার করে চুপ থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।