ঢাকা মেইল ডেস্ক
০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২২ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসী কর্মীরা। জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের ওপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবার। জাতীয় অর্থনীতিতেও তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে: আমরা কি শুধু শ্রমিক রফতানিকারক দেশ হিসেবেই পরিচিত থাকব, নাকি দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারব?
বিশেষ করে ইউরোপের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য, কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ ও ইউরোপ উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত কূটনৈতিক উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি।
ইউরোপের অর্থনীতি ও শ্রমবাজার বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা, নির্মাণ, কৃষি, আতিথেয়তা, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। দেশভেদে চাহিদা ও নিয়োগের শর্ত অবশ্যই ভিন্ন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠী, কর্মক্ষম মানুষ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই জনশক্তির বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ এবং পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। ফলে ইউরোপের শ্রমবাজারে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারছে না।
এখানে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ইউরোপের নিয়োগদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরি করা। একজন কর্মী যদি সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা, পেশাগত দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিধি এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে তাঁর কর্মসংস্থানের সুযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে।
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে শ্রম অভিবাসন সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো Talent Partnership। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সহযোগিতায় ‘Supporting a Talent Partnership with Bangladesh’ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়।
২০২৪ থেকে ২০২৭ মেয়াদে পরিচালিত এই প্রকল্পের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, ইউরোপীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যোগ্যতার সমন্বয় এবং নিরাপদ ও বৈধ কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা।
প্রকল্পটির আওতায় স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিচর্যা, আতিথেয়তা, নির্মাণ, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন ও মূল্যায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ উদ্যোগের অগ্রগতিও আশাব্যঞ্জক। ২৯ অক্টোবর ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ১ হাজারের বেশি কর্মী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং ১২টি পেশায় ৭৭৬ জনকে দক্ষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা যাচাই, ভাষাশিক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি এবং ন্যায্য নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে।
এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। কতজন বাস্তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধ চাকরি পেয়েছেন, কতজন ন্যায্য বেতন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছেন এবং তাদের দক্ষতা কতটা স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ-ইউরোপ শ্রমবাজার সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি পৃথক সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রম সহযোগিতা চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে হবে।
কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশে শ্রমবাজার, নিয়োগব্যবস্থা, কাজের অনুমতি ও অভিবাসনসংক্রান্ত আইন এক নয়। কোনো একটি দেশের সঙ্গে সফল সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হলেই অন্য দেশেও একই নিয়মে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে না।
বাংলাদেশের উচিত প্রথমে দেশভিত্তিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করা। কোন দেশে কোন পেশায় কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, কী পরিমাণ বেতন দেওয়া হয় এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের আইনি প্রক্রিয়া কী, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
আরও পড়ুন
দিল্লিনির্ভরতা নয়, ঢাকাতেই চাই ইউরোপের ভিসা সেবা
দেশে গৃহকর্মী রাখতেন, ইউরোপে এসে নিজেই শ্রমিক
এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।
বিশেষ করে পর্তুগাল, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশের শ্রমবাজার নিয়ে পৃথক গবেষণা করা যেতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের বাস্তব চাহিদা ও আইনি কাঠামো বিবেচনায় নিয়েই উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই থাকা প্রয়োজন:
১. সরকারিভাবে যাচাইকৃত চাকরির চাহিদা ও নিয়োগদাতার পরিচয় নিশ্চিত করা।
২. কর্মীদের বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি ও আবাসনের শর্ত স্পষ্ট করা।
৩. কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতার পারস্পরিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা।
৪. নিয়োগব্যয় ও মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখা।
৫. কর্মীদের শ্রম অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
৬. চাকরি হারানো বা চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখা।
এ ধরনের চুক্তি শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে না, বরং অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। ইউরোপে চাকরি, ভিসা কিংবা স্থায়ী বসবাসের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
কেউ জমি বিক্রি করছেন, কেউ ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চিত অর্থ তুলে দিচ্ছেন ইউরোপে যাওয়ার আশায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ভুয়া চাকরির চুক্তি, জাল ভিসা এবং অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা তাদের জীবনকে বিপন্ন করছে।
এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে সরকারকে একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ইউরোপীয় নিয়োগদাতারা সরাসরি বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতার তথ্য দেখতে পারবেন এবং যাচাইকৃত কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন, এমন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের Overseas Employment Platform এবং Talent Partnership-এর সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের আওতায় ইউরোপীয় নিয়োগদাতা ও বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে দক্ষতাভিত্তিক যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক কর্মীর চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগদাতার পরিচয়, ভিসার ধরন এবং চুক্তিপত্র যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইউরোপে কাজ করতে গেলে শুধু পেশাগত দক্ষতা থাকলেই হয় না। ভাষাজ্ঞানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মী যদি সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষায় কথা বলতে পারেন, তাহলে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ, নিরাপত্তা, দৈনন্দিন জীবন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি অনেক সহজ হয়।
উদাহরণ হিসেবে পর্তুগালের কথা বলা যায়। এখানে কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন, আতিথেয়তা, পরিচর্যা ও বিভিন্ন সেবাখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্তুগিজ ভাষায় দক্ষতা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একইভাবে জার্মানিতে জার্মান ভাষা, ফ্রান্সে ফরাসি ভাষা এবং স্পেনে স্প্যানিশ ভাষার গুরুত্ব রয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সব পেশায় তা যথেষ্ট নয়।
তাই বাংলাদেশে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য দেশভিত্তিক ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
শুধু সার্টিফিকেট বিতরণ নয়, বাস্তবে একজন কর্মী কতটা কাজ জানেন, সেটিই হতে হবে যোগ্যতা নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি।
ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পেশা, ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাঁদের একটি অংশ স্থানীয় ভাষা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শ্রমবাজার এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী সংগঠন, পেশাজীবী এবং কমিউনিটি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রবাসী ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ অনুসন্ধান, নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন অনুমোদন ছাড়া চাকরি কিংবা ভিসার নিশ্চয়তা দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করে তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে জাতীয় উন্নয়নের সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই অভিবাসননীতির একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে কতটা নিরাপদে কাজ করছেন, তাঁর বেতন নিয়মিত পাচ্ছেন কি না, কর্মঘণ্টা ও ছুটির অধিকার পাচ্ছেন কি না এবং কোনো সমস্যায় পড়লে আইনি সহায়তা পাচ্ছেন কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
প্রবাসীর সন্তানরা কি বাংলাদেশ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
পর্তুগালের বুকে ইসলামি সভ্যতার অমলিন উত্তরাধিকার
অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীরা ভাষাগত দুর্বলতা, আইনি অজ্ঞতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে নিয়োগদাতার অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতে পারেন না। ফলে তাদের শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর যেকোনো শ্রম সহযোগিতা চুক্তিতে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। দূতাবাসগুলোকে শ্রমিকদের অভিযোগ গ্রহণ, প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হতে হবে।
একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় আইনি নির্দেশিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে আগের মতো অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর নির্ভরশীল থাকা। অন্যদিকে রয়েছে দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে ইউরোপের শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।
দ্বিতীয় পথটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, এনএসডিএ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Talent Partnership প্রকল্পকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
একই সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে পৃথক শ্রমবাজার চুক্তি, কর্মীদের দক্ষতার স্বীকৃতি, নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান ও সুযোগ পেলে তাঁরা ইউরোপের শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। কিন্তু তাদের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানোর উপকরণ নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখন সময় এসেছে বিচ্ছিন্নভাবে কর্মী পাঠানোর পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে ইউরোপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করার। বাংলাদেশ-ইউরোপ শ্রমবাজার চুক্তি তাই শুধু সময়ের দাবি নয়, এটি নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষ জনশক্তি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
প্রবাসীর শ্রমের মর্যাদা, কর্মীর অধিকার এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখেই গড়ে উঠুক বাংলাদেশ-ইউরোপের নতুন শ্রমবাজার অংশীদারত্ব।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি; সম্পাদক, ইউরোবাংলা