মানুষ কেন নিজের দেশ ছেড়ে ইউরোপে আসে? এর পেছনে থাকে ভালো থাকার স্বপ্ন। কেউ বেশি আয় করতে চান, কেউ সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চান, আবার কেউ চান একটু নিরাপদ ও স্বস্তির জীবন। অনেকের কাছে ইউরোপ মানেই উন্নত জীবন, ভালো বেতন, সুন্দর পরিবেশ ও আর্থিক সচ্ছলতা।
কিন্তু ইউরোপে আসার পর অনেকের জীবনের হিসাব বদলে যায়। যে মানুষটি দেশে ভালোভাবে সংসার চালিয়েছেন, নিজের বাড়িতে থেকেছেন, এমনকি ঘরের কাজের জন্য দুই-তিনজন গৃহকর্মী রেখেছেন, তাঁকেও বিদেশের মাটিতে অন্যের অধীনে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।
পর্তুগালে বসবাসরত অনেক প্রবাসীর জীবন দেখলে এই পরিবর্তন বোঝা যায়। দেশে যাঁরা আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন, তাদের কেউ আজ রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন, কেউ দোকানে, কেউ শপিং মলে, আবার কেউ নির্মাণক্ষেত্র কিংবা পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হয়েছেন।
এতে লজ্জার কিছু নেই। সৎ উপার্জনের জন্য কোনো কাজই ছোট নয়। বরং নিজের পরিশ্রমে জীবিকা অর্জন সম্মানের। তবে প্রশ্ন হলো, যে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ দেশ ছাড়েন, বাস্তবে তাঁরা কতটা সেই জীবন পান?
নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যের বাসায়
দেশে থাকতে অনেকের নিজের বাড়ি ছিল। পরিবারের সবাই আলাদা ঘরে থাকতেন। নিজের বাড়িতে ইচ্ছামতো চলাফেরা করা যেত। কিন্তু ইউরোপে এসে তাদের অনেককে অন্যের বাসায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে।
বিশেষ করে পর্তুগালে বাসাভাড়ার চাপে অনেক পরিবারকে সীমিত জায়গায় থাকতে হয়। কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটি ছোট ঘরে থাকেন। কেউ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে রান্নাঘর ও বাথরুম ভাগাভাগি করেন। একই বাসায় একাধিক পরিবার থাকার ঘটনাও দেখা যায়।
একসময় যিনি নিজের বাড়িতে স্বাধীনভাবে জীবন কাটিয়েছেন, বিদেশে এসে তাঁকেই অন্যের বাসার নিয়ম মেনে চলতে হয়। কখনো রান্নার সময় ভাগ করে নিতে হয়, কখনো বাথরুম ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ছোট সন্তানদের স্বাভাবিক চলাফেরাও অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, অনেকে সাময়িকভাবে এভাবে থাকার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু খরচের চাপ ও সীমিত আয়ের কারণে সেই সাময়িক ব্যবস্থা বছরের পর বছর চলতে থাকে।
মানুষ বিদেশে আসেন জীবনকে আরও সুন্দর করতে। অথচ কখনো কখনো তাঁর নিজের জায়গা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পারিবারিক স্বস্তি কমে যায়।
ব্যাচেলর প্রবাসীদের জীবন আরও কঠিন
পরিবার নিয়ে থাকা প্রবাসীদের যেমন নানা সমস্যা রয়েছে, তেমনি একা থাকা মানুষের জীবনেও রয়েছে আলাদা কষ্ট।
একটি ছোট ঘরে কয়েকজন মিলে থাকা, কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, আবার পরদিন সকালে কাজে ছুটে যাওয়া। অনেকের প্রতিদিনের জীবন এভাবেই কাটে।
কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করেন, কেউ নির্মাণক্ষেত্রে, কেউ দোকানে, আবার কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। দিনের পর দিন শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি তাদের সহ্য করতে হয় নিঃসঙ্গতা ও পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট।
মাস শেষে বেতন পাওয়ার পর বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। দেশে টাকা পাঠানোর দায়িত্ব থাকলে সঞ্চয় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাইরে থেকে তাদের দেখে মনে হতে পারে, তাঁরা ইউরোপে আছেন, নিশ্চয়ই ভালো আছেন। কিন্তু তাঁদের ঘরের ভেতরের জীবন, মানসিক চাপ ও প্রতিদিনের সংগ্রামের খবর খুব কম মানুষই রাখেন।
দেশে একজনের আয়েই চলত সংসার, বিদেশে দুজনকেই কাজ করতে হয়
প্রবাসজীবনে অনেক পরিবারের আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে স্বামী-স্ত্রীর কর্মজীবনে।
দেশে অনেক পরিবারে স্বামী একাই উপার্জন করে সংসার চালাতেন। স্ত্রীকে চাকরি করতে হতো না। তিনি সন্তানদের দেখাশোনা করতেন এবং পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতেন। আর্থিকভাবে সচ্ছল কিছু পরিবারে রান্নাবান্না ও ঘরের কাজের জন্য গৃহকর্মীও থাকতেন।
কিন্তু ইউরোপে আসার পর অনেক পরিবারের সেই চিত্র বদলে যায়।
একজনের আয়ে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, যাতায়াত ও সন্তানদের অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজ খুঁজতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরও উপার্জনের চেষ্টা করতে হয়।
সকালে স্বামী একদিকে কাজে যান, স্ত্রী অন্যদিকে। কাজের সময়ের সঙ্গে সন্তানদের স্কুলের সময় মেলানো কঠিন হয়। ছোট সন্তানদের দেখাশোনা নিয়েও তৈরি হয় নানা সমস্যা।
পরিবারের সবাই ভালো থাকার জন্য পরিশ্রম করেন। কিন্তু অনেক সময় একসঙ্গে বসে কথা বলার সুযোগও কমে যায়। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা একে অন্যকে সময় দিতে পারেন না।
অর্থাৎ, যে পরিবার দেশে তুলনামূলক স্বস্তিতে জীবন কাটিয়েছে, বিদেশে এসে সেই পরিবারকেই অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
দেশে যাঁর ঘরে দুই-তিনজন গৃহকর্মী ছিলেন প্রবাসজীবনের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে তাদের ক্ষেত্রে, যাঁরা দেশে থাকতে আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন।
দেশে তাদের ঘরের কাজের জন্য একাধিক গৃহকর্মী ছিলেন। নিজেরা হয়তো ব্যবসা বা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত ছিলেন। দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজ অন্যের সহযোগিতায় সহজে সম্পন্ন হতো।
কিন্তু ইউরোপে এসে সেই মানুষটিকেই কখনো রেস্তোরাঁয় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে, কখনো দোকানে মালামাল বহন করতে হচ্ছে, আবার কখনো পরিচ্ছন্নতা কিংবা নির্মাণকাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।
এটি জীবনের এক বড় পরিবর্তন
তবে এখানে একটি কথা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন, শ্রমের কোনো অসম্মান নেই। দেশে যিনি ব্যবসা করেছেন, বিদেশে এসে যিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন, দুজনের শ্রমেরই মর্যাদা রয়েছে। মানুষের সম্মান তাঁর পেশা দিয়ে নয়, তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ ও আচরণ দিয়ে বিচার করা উচিত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষ যখন নিজের দেশ ছাড়েন, তখন তাঁর মনে থাকে উন্নত জীবনের আশা। তিনি ভাবেন, বিদেশে গিয়ে হয়তো আরও ভালো থাকবেন, পরিবারের জন্য বেশি কিছু করতে পারবেন। অথচ অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখতেই তাঁকে দিনরাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা মানুষকে শেখায়, অর্থনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক পরিচিতি সব সময় এক রকম থাকে না। পরিবেশ বদলালে জীবনের হিসাবও বদলে যায়।
ইউরোপে এলেই কি জীবন উন্নত হয়?
ইউরোপে আসা মানেই সবার জীবন খারাপ হয়ে যায়, এমন নয়। আবার ইউরোপে বসবাস করলেই সবার জীবন সুন্দর হয়ে যায়, সেটিও সত্য নয়।
অনেক প্রবাসী কঠোর পরিশ্রম করে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ব্যবসা গড়েছেন, বাড়ি কিনেছেন, সন্তানদের ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন এবং পরিবারের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করেছেন। তাঁদের সাফল্যও বাস্তব।
অন্যদিকে, অনেকে বছরের পর বছর কাজ করেও আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেননি। মাসের আয় দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়।
ধরা যাক, একজন প্রবাসী মাসে ভালো বেতন পান। কিন্তু বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত, বিল ও পরিবারের অন্যান্য খরচ মেটানোর পর তাঁর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। দেশে টাকা পাঠানোর দায়িত্ব থাকলে সঞ্চয়ের সুযোগ আরও কমে যায়।
এ অবস্থায় শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দেখে তাঁর জীবনকে সফল বলা যায় না। দেখতে হবে, সেই আয় দিয়ে তিনি কেমন জীবন কাটাচ্ছেন, কতটা সঞ্চয় করতে পারছেন এবং পরিবারের জন্য কী করতে পারছেন।
দেশে হয়তো তাঁর আয় কম ছিল, কিন্তু নিজের বাড়ি ছিল, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ ছিল এবং পরিচিত পরিবেশে জীবনযাপন করতেন। বিদেশে আয় বাড়লেও যদি সারাক্ষণ খরচের চিন্তা ও কাজের চাপে থাকতে হয়, তাহলে জীবনের প্রকৃত উন্নতি কতটা হলো, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
অবশ্য এই তুলনার পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথাও বিবেচনা করতে হবে।
সমস্যার দায় শুধু প্রবাসীর নয়
প্রবাসীদের কষ্ট দেখেই তাঁদের ব্যর্থ বলা উচিত নয়। একজন মানুষ নতুন দেশে এসে ভাষা শেখেন, কাজ খোঁজেন, সংসার চালান এবং পরিবারকে ভালো রাখার চেষ্টা করেন। এই সংগ্রাম সহজ নয়।
বিশেষ করে নতুন অভিবাসীদের জন্য উপযুক্ত বাসা পাওয়া, ভালো কাজ খুঁজে নেওয়া, ভাষা শেখা এবং নতুন সমাজের সঙ্গে মানিয়ে চলা বড় চ্যালেঞ্জ।
একজন মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেও যদি তাঁর আয় দিয়ে পরিবারের উপযুক্ত বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে না পারেন, তাহলে সমস্যাটিকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলা যায় না।
এ ক্ষেত্রে আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য, সাশ্রয়ী আবাসন, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মজীবী পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বিদেশে আসার আগে মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে হবে। শুধু বেশি বেতনের গল্প শুনে কিংবা অন্যের জীবন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সম্ভাব্য আয়, বাসাভাড়া, খাবারের খরচ, কাজের সুযোগ, ভাষাগত দক্ষতা এবং পরিবার নিয়ে বসবাসের ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
কারণ বিদেশে আসার সিদ্ধান্ত শুধু একজন মানুষের নয়, অনেক সময় পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
দেশে যাঁর নিজের বাড়ি ছিল, ইউরোপে এসে তাঁকে অন্যের বাসায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে। দেশে যাঁর ঘরের কাজের জন্য একাধিক গৃহকর্মী ছিলেন, বিদেশে এসে তাঁকেই দীর্ঘ সময় শারীরিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে। দেশে যাঁর স্ত্রীকে চাকরি করার প্রয়োজন হয়নি, বিদেশে এসে তাঁকেও সংসারের খরচ মেটাতে কাজ খুঁজতে হচ্ছে।
এগুলো অনেক প্রবাসীর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। সৎ শ্রম সম্মানের, আর পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন মানুষের মর্যাদার পরিচয়।
তবে প্রশ্ন হলো, এত পরিশ্রমের পরও মানুষ কতটা ভালো থাকতে পারছেন? কতটা সঞ্চয় করতে পারছেন? সন্তানদের কতটা সময় দিতে পারছেন? পরিবার নিয়ে নিরাপদ ও স্বস্তির জীবন কাটানোর সুযোগ কতটা পাচ্ছেন?
উন্নত জীবনের অর্থ শুধু ইউরোপে বসবাস করা কিংবা বেশি ইউরো আয় করা নয়। উন্নত জীবন হলো এমন একটি জীবন, যেখানে মানুষ সৎভাবে উপার্জন করে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারেন, নিরাপদ বাসস্থানে থাকতে পারেন, সন্তানদের সময় দিতে পারেন এবং দুশ্চিন্তামুক্তভাবে কিছুটা শান্তিতে বাঁচতে পারেন।
তাই বিদেশে আসার আগে যেমন স্বপ্ন দেখতে হবে, তেমনি বাস্তবতাও বুঝতে হবে। শুধু ইউরোপের ভালো দিকগুলো জানলেই চলবে না, এখানকার জীবনযাত্রার খরচ, কাজের ধরন, আবাসনসংকট এবং পারিবারিক জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোও জানতে হবে।
কারণ প্রবাসজীবনের সাফল্য শুধু কত ইউরো আয় করলাম, তার হিসাব নয়। বরং সেই আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের জন্য কতটা নিরাপদ, সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারলাম, সেটিই সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অপ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (PBCCI); সম্পাদক, ইউরোবাংলা




