বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দিল্লিনির্ভরতা নয়, ঢাকাতেই চাই ইউরোপের ভিসা সেবা

আবদুল আহাদ সালমান
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

দিল্লিনির্ভরতা নয়, ঢাকাতেই চাই ইউরোপের ভিসা সেবা
আবদুল আহাদ সালমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভিবাসী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দেশ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা তাঁদের শ্রম, মেধা, উদ্যোক্তা-সত্তা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষ করে ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন না, তাঁরা ব্যবসা করছেন, কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, বিনিয়োগ করছেন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করছেন।

Portugal Bangladesh Chamber of Commerce and Industry (PBCCI)-এর প্রেসিডেন্ট এবং EuroBangla-এর সম্পাদক হিসেবে ইউরোপপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করি: ইউরোপে বৈধভাবে আসতে আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা এখন একটি বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন বাংলাদেশি নাগরিককে দিল্লির পথে যেতে হবে?

ইউরোপের কোনো কোনো দেশের ভিসা আবেদন বাংলাদেশে সরাসরি গ্রহণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাংলাদেশি নাগরিককে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। বিশেষ করে ভারতের দিল্লিকেন্দ্রিক কিছু ভিসা প্রক্রিয়া বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

একজন শিক্ষার্থী ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ভিসার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন। একজন ব্যবসায়ী নির্ধারিত ব্যবসায়িক বৈঠকে যেতে পারছেন না। একজন কর্মপ্রার্থী চাকরির সুযোগ পেয়েও সময়মতো ভিসা না পাওয়ায় সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় থাকছেন। একজন পরিবারের সদস্য স্বজনের কাছে যেতে চেয়েও দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বিমানভাড়া, হোটেল, পরিবহন, ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং অন্যান্য অতিরিক্ত ব্যয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের বৈধ ইউরোপযাত্রার জন্য কেন একটি তৃতীয় দেশের ওপর এতটা নির্ভরশীল হতে হবে?

ভিসা শুধু একটি কাগজ নয়

ভিসা একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে।

আরও পড়ুন

পর্তুগাল-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স গঠন

একজন আবেদনকারী যখন মাসের পর মাস একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষায় থাকেন, তখন শুধু তাঁর সময় নষ্ট হয় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, একটি ব্যবসায়িক সুযোগ পিছিয়ে যায়, একটি চাকরির সুযোগ অনিশ্চিত হয়, একটি পরিবারের পরিকল্পনা থেমে যায়।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশের নাগরিকদের জন্য আধুনিক, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য ভিসা অবকাঠামো এখন সময়ের প্রয়োজন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে হবে

২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লিতে থাকা ইউরোপীয় ভিসা সেন্টারগুলো ঢাকায় অথবা বাংলাদেশের নিকটবর্তী কোনো দেশে স্থানান্তরের আহ্বান জানিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশি ভিসাপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছিলেন। এই উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখন প্রয়োজন সেই আহ্বানকে আরও এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি Visa Facilitation Dialogue প্রতিষ্ঠা করা।

প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রবাসীদের প্রত্যাশা

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ইউরোপপ্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে আমাদের বিনীত আবেদন:

বাংলাদেশের নাগরিকদের ইউরোপে যাওয়ার বৈধ পথকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সরাসরি করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা হোক।

যেসব ইউরোপীয় দেশের ভিসা আবেদন বর্তমানে বাংলাদেশে পর্যাপ্তভাবে গ্রহণ করা হয় না, তাদের ক্ষেত্রে ঢাকায় Visa Application Centre, Consular Service অথবা অনুমোদিত Visa Processing Facility স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

যেখানে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়, সেখানে সম্ভব হলে সেই প্রক্রিয়া ঢাকায় স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হোক।

প্রবাসীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ: দালাল ও ভিসা-বাণিজ্য

ভিসা প্রক্রিয়া যত জটিল হয়, ততই একটি অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির সুযোগ তৈরি হয়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, ভুয়া প্রতিশ্রুতি, অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ, ভুয়া কাগজপত্র এবং নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করা উচিত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এসব অভিযোগকে উপেক্ষাও করা যায় না।

বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষের উচিত প্রয়োজনে যৌথভাবে অভিযোগ তদন্ত, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অনুমোদিত ফি প্রকাশ নিশ্চিত করা। সরকারি ও অনুমোদিত ভিসা ব্যবস্থাকে যত সহজ ও স্বচ্ছ করা যাবে, অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ তত কমবে।

এটি শুধু প্রবাসীদের দাবি নয়

ইউরোপে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য করেন। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পণ্য রপ্তানি, ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, শিক্ষার্থী যাতায়াত, ব্যবসায়িক সফর এবং পারিবারিক যোগাযোগ প্রতিদিন বাড়ছে। সুতরাং সহজ ভিসা ব্যবস্থা শুধু একজন পর্যটক বা শিক্ষার্থীর সুবিধা নয়।

এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

europe2

বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে হলে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসা ব্যবস্থা অপরিহার্য।

আমরা কী চাই?

PBCCI এবং ইউরোপপ্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের বৃহত্তর স্বার্থের আলোকে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য আমরা প্রস্তাব করছি:

১. ইউরোপীয় দেশগুলোর ভিসা আবেদন বাংলাদেশে সরাসরি গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো।

২. দিল্লিনির্ভর যেসব ভিসা প্রক্রিয়া সম্ভব, সেগুলো পর্যায়ক্রমে ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া।

৩. বাংলাদেশে আরও ইউরোপীয় Embassy/Consular Service ও অনুমোদিত Visa Application Centre স্থাপনে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া।

৪. শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, কর্মী ও পরিবারভিত্তিক আবেদনকারীদের জন্য পৃথক ও কার্যকর সেবা কাঠামো তৈরি করা।

৫. ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাণিজ্য ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

আরও পড়ুন

পর্তুগাল-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের উদ্বোধন

৬. অনুমোদিত ভিসা ফি ও সার্ভিস চার্জ প্রকাশ্যে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা।

৭. বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নিয়মিত Visa Facilitation Dialogue চালু করা।

৮. ইউরোপে বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য একটি বিশেষ Business Visa Facilitation Framework নিয়ে আলোচনা করা।

ইউরোপের দরজা বন্ধ নয়, পথটি সহজ হোক

আমরা ইউরোপের কাছে কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা চাই না নিয়ম শিথিল করে অযোগ্য কাউকে ভিসা দেওয়া হোক। আমরা শুধু চাই, একজন যোগ্য বাংলাদেশি নাগরিক যেন তাঁর নিজের দেশ থেকেই স্বচ্ছ, নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক ও সম্মানজনকভাবে ইউরোপের ভিসার আবেদন করতে পারেন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে। ইউরোপের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের বৈধ আন্তর্জাতিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় তৃতীয়-দেশ নির্ভরতা কমানোও একটি যৌক্তিক রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীর মর্যাদা বাংলাদেশের মাটিতেই নিশ্চিত হোক।

আজ ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিরা শুধু প্রবাসী নন। তাঁরা ব্যবসায়ী। তাঁরা উদ্যোক্তা। তাঁরা শ্রমিক। তাঁরা শিক্ষার্থী। তাঁরা বিনিয়োগকারী। তাঁরা বাংলাদেশের পরিবারের সদস্য। তাঁরা বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে একেকটি জীবন্ত সেতু।

তাই তাদের ভিসা-সংক্রান্ত কষ্টকে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা, নাগরিকসেবা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে পারে।

ঢাকায় ইউরোপের ভিসা সেবা বাড়ুক। দিল্লিনির্ভরতা কমুক। দালালচক্রের সুযোগ বন্ধ হোক। বাংলাদেশি নাগরিকের সময় ও অর্থ সুরক্ষিত হোক। বাংলাদেশ ও ইউরোপের সম্পর্ক আরও সরাসরি ও শক্তিশালী হোক। এটাই আজ ইউরোপপ্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় প্রত্যাশা। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি নাগরিকসেবা, বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্মিলিত স্বার্থের একটি বাস্তব দাবি।

লেখক: পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (পিবিসিসিআিই); সম্পাদক, ইউরোবাংলা

 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর