ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্তুগালকে আমরা সাধারণত সমুদ্রযাত্রা, আবিষ্কারের যুগ এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসের জন্য চিনি। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি বিস্ময়কর ইতিহাস, যেখানে প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে ইসলামি সভ্যতা এই ভূখণ্ডের সমাজ, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও ভাষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আজও সেই ইতিহাসের অসংখ্য চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে লিসবনের সরু গলি থেকে শুরু করে আলগার্ভের উপকূল পর্যন্ত।
গার্ব আল-আন্দালুস: পর্তুগালে ইসলামি শাসনের সূচনা
খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের শুরুতে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম বাহিনী আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করে। ৭১১ সালের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান পর্তুগালের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। এই অঞ্চল পরিচিত ছিল গার্ব আল-আন্দালুস নামে, যার অর্থ ‘আন্দালুসের পশ্চিমাঞ্চল’। বর্তমান আলগার্ভ (Algarve) নামটিও সেই আরবি শব্দ আল-গার্ব থেকেই এসেছে।
মুসলিম শাসনামলে লিসবন (তৎকালীন আল-উশবুনা), সিলভেস, বেজা, ফারো ও মের্তোলা ছিল প্রশাসন, শিক্ষা, কৃষি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চল ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হয়ে ওঠে।
আল-উশবুনা: ইসলামি লিসবনের উত্থান
আজকের প্রাণচঞ্চল রাজধানী লিসবন একসময় ছিল ইসলামি সভ্যতার একটি সমৃদ্ধ নগর। মুসলিম যুগে এর নাম ছিল আল-উশবুনা (Al-Ushbuna)। প্রায় চার শতাব্দী ধরে এই শহর ছিল বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনের অন্যতম কেন্দ্র।
শহরের পরিকল্পনায় ছিল ইসলামি নগরায়ণের সুস্পষ্ট প্রভাব। সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা, অভ্যন্তরমুখী বাড়ি, উন্মুক্ত আঙিনা এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী স্থাপত্য শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল।
আলফামা: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
লিসবনের সবচেয়ে পুরোনো অঞ্চল আলফামা (Alfama) আজও সেই ইসলামি অতীতের জীবন্ত স্মারক। এর নাম এসেছে আরবি আল-হাম্মা (Al-Hamma) শব্দ থেকে, যার অর্থ উষ্ণ প্রস্রবণ বা গরম পানির ঝরনা। ধারণা করা হয়, মুসলিম যুগে এখানে একটি হাম্মাম বা গণস্নানাগার ছিল, যা স্থানীয় মানুষের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
আলফামার সরু গলি, পাহাড়ি সিঁড়ি, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং পাথরের প্রাচীর আজও মধ্যযুগীয় ইসলামি নগর পরিকল্পনার ছাপ বহন করে। একসময় এখানকার মসজিদে আজান ধ্বনিত হতো, বাজারে জমজমাট বাণিজ্য চলত, মাদরাসায় ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রদান করা হতো।
দুর্গ, মসজিদ ও স্থাপত্যের উত্তরাধিকার
লিসবনের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত Castelo de São Jorge মুসলিম শাসকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ছিল। এখান থেকে পুরো শহর ও টাগুস নদী পর্যবেক্ষণ করা যেত। দুর্গের প্রাচীরের অনেক অংশ আজও মুরিশ স্থাপত্যশৈলীর স্মৃতি বহন করছে।
১১৪৭ সালে খ্রিস্টান বাহিনী লিসবন পুনর্দখলের পর প্রধান জামে মসজিদের স্থানে নির্মিত হয় Sé de Lisboa (Lisbon Cathedral)। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়, বর্তমান ক্যাথেড্রালের নিচে ইসলামি আমলের কিছু স্থাপত্যভিত্তি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়া Palácio Belmonte-এর নিচে আবিষ্কৃত আরবি অলংকরণ, জ্যামিতিক নকশা এবং প্রাচীন দেয়াল মধ্যযুগীয় ইসলামি শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
মের্তোলা: প্রত্নতত্ত্বে সংরক্ষিত ইতিহাস
দক্ষিণ পর্তুগালের ছোট্ট শহর মের্তোলা আজ ইসলামি ইতিহাস গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে আবিষ্কৃত প্রাচীন দুর্গ, আবাসন, মুদ্রা, সিরামিক এবং ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ প্রমাণ করে যে শহরটি একসময় একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো একটি প্রাচীন মসজিদ, যা পরবর্তীকালে গির্জায় রূপান্তরিত হলেও এর মিহরাব আজও সংরক্ষিত রয়েছে। এই নিদর্শন শুধু ধর্মীয় ইতিহাস নয়, বরং পর্তুগালের বহুসাংস্কৃতিক অতীতেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
ভাষা, কৃষি ও সংস্কৃতিতে ইসলামি প্রভাব
মুসলিম শাসনের অবসান হলেও তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি।
আজও পর্তুগিজ ভাষায় শত শত আরবি উৎসের শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন azeite (জলপাই তেল), almofada (বালিশ), alfazema (ল্যাভেন্ডার) ইত্যাদি।
কৃষিক্ষেত্রেও মুসলিমদের অবদান ছিল অসাধারণ। উন্নত সেচব্যবস্থা, জলাধার নির্মাণ, ফল ও শস্যচাষের নতুন কৌশল এবং নগর পরিকল্পনার বিভিন্ন ধারণা পরবর্তীকালেও পর্তুগিজ সমাজে ব্যবহৃত হতে থাকে।

স্থাপত্যে মুদেজার শৈলী, জ্যামিতিক অলংকরণ, খিলান এবং টাইলসের নকশায় ইসলামি শিল্পরীতির প্রভাব এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
রিকনকুইস্তা: রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা
খ্রিস্টীয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে রিকনকুইস্তার মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১১৪৭ সালে লিসবন এবং পরবর্তীতে সমগ্র পর্তুগাল খ্রিস্টান শাসনের অধীনে চলে আসে।
অনেক মুসলিম অঞ্চল ত্যাগ করলেও অনেকে থেকে যান। তাদের একটি অংশ ‘মুদেজার’ নামে পরিচিত ছিল। কারুশিল্প, নির্মাণকৌশল, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাদের অবদান পর্তুগিজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়।
আধুনিক পর্তুগালে মুসলিম সমাজ
বর্তমান পর্তুগাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও সমাজে তাদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
লিসবনের Central Mosque of Lisbon, যা ১৯৮৫ সালে উদ্বোধন করা হয়, বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামি কেন্দ্র। এখানে ধর্মীয় শিক্ষা, আরবি ভাষা শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং রমজানে বৃহৎ পরিসরের ইফতার আয়োজন করা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মরক্কো, গিনি-বিসাউ, মোজাম্বিক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত মুসলিম অভিবাসীরা আজ পর্তুগালের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, লিসবন বর্তমানে ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
ইতিহাসের পদচিহ্ন আজও জীবন্ত
পর্তুগালের ইসলামি ইতিহাস শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়, বরং আজও জীবন্ত এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আলফামার সরু গলি, সাঁও জর্জ দুর্গের প্রাচীর, মের্তোলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা আলগার্ভ নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে, নগরের রূপও পাল্টেছে। কিন্তু ভাষা, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতিতে ইসলামি সভ্যতার ছাপ আজও অম্লান।
পর্তুগাল তাই শুধু নাবিকদের দেশ নয়, এটি এমন এক ভূখণ্ড যেখানে ইউরোপীয় ও ইসলামি সভ্যতা শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। সেই মিলনের ইতিহাসই আজ পর্তুগালকে দিয়েছে এক অনন্য, বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (পিবিসিসিআই); সম্পাদক, ইউরোবাংলা




