Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠন না হওয়ায় দেশে মবতন্ত্র কায়েম হয়েছে: জেডিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও, মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও আশুলিয়ার তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদরাসায় মব সন্ত্রাস ও লুটপাট, জাসদ কার্যালয়ে প্রশ্নবিদ্ধভাবে কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে যুবদলকে মব করার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে দায়ী করেছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)।

দলটির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ বলেছেন, জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না করায় পুলিশকে নৈতিকভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে পুলিশও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে দেশে ‘মবতন্ত্র’ কায়েম হয়েছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনে জেডিপি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাঈম আহমাদ।

নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এ লক্ষ্যেই পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। পরে জুলাই সনদের ৬৯ নম্বর দফায় স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়। কোনো দল এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে নাঈম আহমাদ বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভাবমূর্তি দেখে আমাদের শঙ্কা হয়, তিনিও পুলিশকে আওয়ামী লীগ আমলের মতো দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ব্যবহার করতে চান নাকি। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা এভাবে আর ব্যবহৃত হতে চান না। তারা পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের একটি বাহিনীর অংশ হতে চান। পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই বলেছেন, তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে আর নিন্দিত হতে চান না।

তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুলিশ সদস্যদের আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার না করে উল্টো তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের নাকের ডগায় যুবদলকে মব করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা পুলিশের জন্য অসম্মানজনক। কার্যত এটি প্রমাণ করে যে, মব সন্ত্রাস প্রতিহত করতে পুলিশ এককভাবে সক্ষম নয়, ফলে যুবদলকে মাঠে নামাতে হয়েছে। এসব কারণে পুলিশ সদস্যরা নৈতিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন না। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি হচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে তার অন্যতম প্রধান সহযোগী জাসদ নিষিদ্ধ নয় কেন— এমন প্রশ্ন তুলে নাঈম আহমাদ বলেন, পুলিশ কেন জাসদকে কর্মসূচি পালনের লিখিত অনুমতি দিল, সেটিই বড় আশ্চর্যের বিষয়। লিখিত অনুমতি দেওয়ার পর সেখানে অভিযান চালানো ন্যায্য নয়।

পুলিশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাঈম আহমাদ বলেন, বাংলাদেশের পুলিশব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর শিকড় ঔপনিবেশিক আমলের। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর ব্রিটিশ সরকার ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ভিত্তিতে এ অঞ্চলে পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলে। সেই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়, বরং শোষণ ও ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা।

তিনি আরও বলেন, ১৮৬১ সালের সেই পুলিশ আইন আজও বহাল রয়েছে। কিছু সংশোধন হয়েছে, কিন্তু মূল দর্শন ও কাঠামোর বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে পুলিশ জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়ে গেছে।

নাঈম আহমাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন, পদোন্নতি ও পুরস্কারের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে।

তিনি বলেন, অতীতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি অনুগত ছিলেন, বিনা প্রশ্নে সরকারি নির্দেশ পালন করতেন এবং গুরুতর অপরাধের অভিযোগের মুখেও পড়েছেন, তাদের অনেকেই BPM/PPM পদক, দ্রুত পদোন্নতি ও পছন্দের পোস্টিং পেয়েছেন। বিপরীতে যারা বিবেকের তাড়নায় এসব অপরাধ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন, তাদের শাস্তিমূলক পোস্টিং দেওয়া হয়েছে কিংবা পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দেশ পালন করলে পুরস্কার, না করলে শাস্তি— এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকারীদের একজন আদালতের রায়ের পর বলেছে, ‘আমি শুধু সরকারের নির্দেশ পালন করেছি।’ এই ধরনের জাস্টিফিকেশন একটি কাঠামো থেকেই আসে, যেখানে অন্ধভাবে সরকারি নির্দেশ পালন করাকেই পেশাদারত্ব হিসেবে শেখানো হয়।

পুলিশ সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করে জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, ২০০৭ সালে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাবসহ একটি নতুন পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও পুলিশ সংস্কারের সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আবারও পুলিশ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। তবে অধ্যাদেশটি পরবর্তী সময়ে কার্যকর আইনে পরিণত না হওয়ায় এর কার্যকারিতা লোপ পায়।

নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের দাবি উঠল, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ হলো; কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকারও সেটি কার্যকর আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করল না। অর্থাৎ পুলিশ সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের পদাঙ্কই অনুসরণ করেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও পুলিশ সংস্কার বিষয়ক সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। বরং বিষয়টি কার্যত গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই অদৃশ্য কারণে বিষয়টি নিয়ে কোনো পক্ষই তেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখছে না।

নাঈম আহমাদ বলেন, আমরা ধারণা করি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো না কোনোভাবে পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বিষয়ে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছেন। কারণ একটি কার্যকর স্বাধীন পুলিশ কমিশন থাকলে পুলিশকে নিজের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ কমে যাবে। ফলে দেশ এখন মবের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই পরিস্থিতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই আমরা দায়ী মনে করি। কার্যত তিনিই এই মবতন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দাবি, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ কোনো সংশোধন ছাড়াই আইন হিসেবে পাস করতে হবে এবং পুলিশের আইনি দর্শনে ও কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

জেডিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে পুলিশ কমিশন গঠনের আইন পাসের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমরা সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। অন্যথায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি সরকারের দিকেও জনগণের আঙুল উঠবে।

সংবাদ সম্মেলনে জেডিপির পক্ষ থেকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশকে ভিত্তি করে আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জেডিপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম, প্রধান সংগঠক মো. আহছান উল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক মুত্তাকী বিন মনির, যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বির, ইয়াসিন আরাফাত রাজ, মো. মুহিব্বুল্লাহ, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ প্রমুখ।

এমআর/এফএ