বোরহান উদ্দিন
২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
• মাঠ দখলে এনসিপি, শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা
• ব্যবসায়িক সংকটে রফিকুলের রাজনীতি
• অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে ইলিয়াস কাঞ্চনের দল
• নতুন নেতৃত্ব তৈরির চেষ্টা আমজনতা দলের
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গণে নতুন নতুন দল গঠনের তৎপরতা দেখা দেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনীতির মাঠে বসন্তের কোকিলের মতো সামনের সারিতে আসেন নবীন-প্রবীণ রাজনীতিক, ব্যবসায়ীরা। কেউ আবার রাজনীতিতে ছিলেন একদমই নতুন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) ছাড়াও নতুন দলগুলোর নেতারা রাজপথে তখন বড় বড় ব্যানার আর রঙিন ফেস্টুনে ঢেকে দিয়েছিলেন। তখন ইনডোর-আউটডোর তৎপরতায় দেশে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ হতে পারে এমন আলোচনাও ছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পেরোতেই সেই ‘বসন্তের কোকিলদের’ বেশিরভাগই অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা তরুণদের হাতে গড়া এনসিপি ছাড়া বাকি দলগুলোর কোথাও কোনো ধরণের তৎপরতাই নেই।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের আনুকূল্যে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা দলগুলোর কেউ কেউ দ্রুত নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পান। আবার বিরাগভাজন হওয়ায় কিছু দল নিবন্ধন বঞ্চিতও হয়েছে।
মাঠের রাজনীতির হালচাল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যখন ছয়জন সংসদ সদস্য নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে সুসময় পার করছে, তখন আম তারেক, রফিকুল আমীন কিংবা জনতা দলগুলোর প্রদীপ যেন নিভনিভু করছে। যাদের কার্যক্রম এখন কেবল ড্রয়িংরুমের আড্ডা কিংবা প্যাড-সর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি। ভোটের ডামাডোল থামার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা ‘ব্যাঙের ছাতার’ মতো গজিয়ে ওঠা দলগুলোর জৌলুসও ফিকে হয়ে গেছে।

চমক দেখিয়েছে এনসিপি
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়ে বর্তমানে সংসদে বিরোধী দলের আসনে এনসিপির ছয় জন সংসদ সদস্য। সরকারের তীব্র সমালোচনায় মুখর দলটির তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদের ভিতরে-বাইরে নিজেদের আলোচনায় রেখেছেন।
পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও মাঠে জাতীয় পার্টির অবর্তমানে অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন এনসিপি নেতারা। নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নেতৃত্বাধীন দলটি শুরুর দিকে তরুণ প্রজন্মসহ মানুষের আস্থা অর্জনে অনেকটা সক্ষম হলেও সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যাত্রা শুরু করা দলগুলোর মধ্যে এনসিপি একমাত্র গত নির্বাচনে আসন পেয়েছে। ৬টি আসন জয় করে সংসদে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে দলটি। তরুণদের হাতে গড়া দলটির নির্বাচনের এই সাফল্য কেবল চমক ছিল না, বরং সাংগঠনিক শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করেছে। বর্তমানে দলটি ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে তাদের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করছে। সম্প্রতি যুবদলের সাবেক নেতা ইসহাক সরকারের মতো নেতাদের দলে ভিড়িয়ে তারা রাজপথে নিজেদের বড় শক্তি হিসেবে জানান দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

নিবন্ধন পেলেও জনপ্রিয়তা মেলেনি আম জনতার
রাজনীতিতে আলোচিত নাম সাবেক গণঅধিকার পরিষদের নেতা তারেক রহমান। পরবর্তীতে তিনি আম তারেক নামেও পরিচিতি পান। নির্বাচনের আগে নিজের গড়া দল ‘আমজনতা দল’-এর নিবন্ধনের দাবিতে আগারগাঁওয়ে ইসি কার্যালয়ের সামনে স্যালাইন হাতে তারেক রহমানের অনশনের দৃশ্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক হয়েছে। নিবন্ধনের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর তার দল ‘আমজনতার দল’ চূড়ান্ত নিবন্ধন লাভ করে।
এদিকে নিবন্ধন পাওয়ার পর দলটি অনেক প্রত্যাশা করলেও নির্বাচনের লড়াইয়ে একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি। দলটির সাংগঠনিক কাঠামো মূলত ব্যক্তি তারেক-কেন্দ্রিক হওয়ায় ভোটের পর আর মাঠের রাজনীতিতে তাদের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। নিবন্ধিত দল হিসেবে ইসির তালিকায় নাম থাকলেও ‘আমজনতা’র ব্যানারে রাজপথে এখন আর কোনো বড় কর্মসূচি চোখে পড়ে না। তবে নিয়মিত ফেসবুকে নানা ইস্যু নিয়ে সরব থাকেন তরুণ এই রাজনীতিক।
অবশ্য দলের কার্যক্রম নেই এমনটা মানতে নারাজ এই তরুণ রাজনীতিক। একইসাথে দেশে এখন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নেই বলেও মনে করেন তিনি।
ঢাকা মেইলকে আমজনতার দলের সাধারণ সম্পাদক তারেক রহমান বলেন, আমরা যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ছিলাম না। ফলে আমাদের কোনো কিছুতে ছাড় দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তারপরও আমাদের ১৮ জন অংশ নেয় নির্বাচনে। ভোটের পর আগের মতো নির্বাচনের দাবি, সরকার পতনের আন্দোলনের কর্মসূচি নেই। কারণ মানুষ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। সবাই সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে। সাধারণ মানুষের মতো আমরাও সরকারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলছি। কখনো কখনো সরকারের পক্ষেও কথা বলছি। ইনডোর কর্মসূচি পালন করছি।
>> আরও পড়ুন
সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সারাদেশে ৪৩টি কমিটি আছে। কমিটিগুলো আমরা নতুন করে করছি। কারণ ভোটের আগে অনেকে হয়তো যোগ দিয়েছিল, কিন্তু এখন কাজ করছে না। আবার অনেকে কাজ করতে আগ্রহী। এভাবে করেই আমাদের কার্যক্রম চালাচ্ছি।

কোথাও নেই রফিকুল আমীনের ‘আমজনগণ পার্টি’
আলোচিত ডেসটিনি গ্রুপের এমডি মোহাম্মদ রফিকুল আমীন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন। প্রথমে ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’ এবং পরে নাম বদলে ‘বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি’ গঠন করেন তিনি।
ভোটের আগে কয়েকশ সদস্যের বিশাল কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেও সাধারণ ভোটারদের আকর্ষণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দলটি। নির্বাচনের সময় রফিকুল আমীনের দলটির কোনো প্রভাব ছিল না। বর্তমানে দলটির প্রধান কার্যালয় অনেকটাই জনশূন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রফিকুল আমীন এখন রাজনীতির চেয়ে নিজের হারানো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের কৌশলে বেশি ব্যস্ত।
দলটির সদস্য সচিব ফাতিমা তাসনিম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের নিবন্ধন দেওয়া নিয়ে গত সরকারের সময় অনেক সমস্যা করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। ফলে শুরুতেই বাধার মুখে পড়েছি। তারমধ্যে আমরা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে কাজ করছি।

অস্তিত্ব সংকটে জনতা পার্টি বাংলাদেশ
চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’-এর। সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম সারওয়ার মিলনকে সামনে রেখে তারা এক নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার মিলন মারা গেছেন রোববার (২৬ এপ্রিল)। ইলিয়াস কাঞ্চন নিজে বিদেশে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। অন্যদিকে দলের মহাসচিব সিনিয়র সাংবাদিক শওকত মাহমুদ অনেকদিন ধরে কারাগারে। এমন পরিস্থিতি দলটিকে এক বড় ধরনের নেতৃত্বের শূন্যতায় পড়েছে। এর আগে নির্বাচনেও তেমন কিছুই করতে না পারা দলটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। কারণ ইলিয়াস কাঞ্চনের ব্যক্তিগত ইমেজ ব্যবহার করেও তারা ভোটের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এখন চলছে নেতৃত্বের সংকট।
তথ্য অনুযায়ী, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলের একবছরের মধ্যে ৩০টির কাছাকাছি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই নামসর্বস্ব দল। কোনো কোনো দলের কার্যালয়েরও ঠিক নেই।
ওই সময়ে নিউক্লিয়াস পার্টি, জনপ্রিয় পার্টি, জাগ্রত পার্টি, আমজনতার দল, আমজনতা পার্টি এমন দলের যাত্রা শুরু হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল গঠনের যে সংস্কৃতি, তা মূলত ‘কিংস পার্টি’ বা ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’র অংশ। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল আদর্শিক ভিত্তি ও জনগণের সম্পৃক্ততা থাকা দলগুলোই টিকে থাকতে পেরেছে।
তারা বলছেন, মূল ধারার দলগুলোর বাইরে যারা ব্যক্তি-ইমেজ বা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে দল গড়েছেন তারা নিবন্ধন পেলেও জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ভোটের আগে নতুন নতুন দলের যাত্রার ইতিহাস বেশ পুরানো। কখনো কখনো কিংস পার্টি হিসেবেও অনেক দল পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দলগুলো খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। কিছু কিছু দল নিজে থেকেই বিলীন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে এনসিপি যেহেতু একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামনের সারিতে এসেছে সে কারণে অন্যদের চেয়ে এই দলটি ভালো করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আগামীর রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে তাদের সঠিকভাবে পথ চলতে হবে।
বিইউ/এএস