- মন্ত্রিসভায় ব্যস্ত নেতারা, অভিভাবকহীন নয়াপল্টন
- সরকার ও সংগঠনের ‘ব্যালেন্স’ খুঁজছে বিএনপি
- স্থবিরতা কাটাতে দল ঢেলে সাজানোর চিন্তা
- চলতি বছরই কাউন্সিলের চিন্তা বিএনপির
প্রায় দেড় যুগ ধরে কখনো বিরোধী দল, কখনো সংসদের বাইরে কেটেছে বিএনপির। একই সঙ্গে আন্দোলন-কর্মসূচি আর জেল-জুলুমের মধ্য দিয়ে পার করেছেন নেতাকর্মীরা। প্রায় ২০ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও যেন স্বস্তি নেই। কারণ দল পরিচালনায় থাকা নেতারা এখন সামলাচ্ছেন দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। ফলে নেতারা যখন সরকার পরিচালনায় তখন দলীয় রাজনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে তৃণমূল কিংবা গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় কোথাও নেই আগের মতো নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড়। যা দৃষ্টিগোচর হয়েছে দলীয় প্রধান তারেক রহমানেরও। সম্প্রতি দলীয় প্রধানের নির্দেশনায় নয়াপল্টনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সময় দিয়েছেন। নেতাকর্মী ও অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খোঁজখবর নিয়েছেন।
এমন এক প্রেক্ষাপটে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া দল ও অঙ্গ সংগঠনকে চাঙা করতে ‘বিশেষ মিশনে’ নামছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় সূত্র বলছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সারাদেশে দলের সর্বস্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এছাড়া নতুন করে দলের কাউন্সিল করার চিন্তাও আছে বিএনপির হাইকমান্ডের। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এমনটা জানিয়েছেন।
>> আরও পড়ুন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলোর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়। স্বাভাবিকভাবেই সরকার পরিচালনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় সংগঠনে প্রভাব পড়ে। তাই দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র সর্বত্র ত্যাগী নেতাদের দিয়ে সংগঠন পুনর্গঠন জরুরি।
বিজ্ঞাপন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তারা আবার দলের সঙ্গেও আছেন। তারা এতদিন অত্যাচার- নির্যাতনের মুখে দলের সঙ্গে ছিলেন। যে কারণে সংগঠনের ওপর চাপ পড়া স্বাভাবিক। এর মধ্যেও সংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। কিন্তু গতি কম। আরও সচল রাখার জন্য দলের প্রধান তারেক রহমান নিজে নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন, নতুন কমিটি দেওয়ার কথাও চলছে। আরও গিয়ারআপ করতে হবে। আরও গভীরভাবে ভেবেচিন্তে সাংগঠনিকভাবে দলকে চাঙা রাখতে পরীক্ষিত, ত্যাগী লোকদের দায়িত্ব দেওয়া গেলে ভালো হবে।’
সচিবালয়মুখী নেতা-কর্মীরা, প্রাণহীন কার্যালয়
নির্বাচন শেষে এক মাস আগে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদীয় কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের। ফলে তাদের বেশির ভাগ সময় কাটছে নিজ নিজ দফতরের কাজ সামলাতে। অথচ একটা সময় তাদের দিনের বেশির সময় দলীয় কার্যালয় ও কর্মসূচি পালনে কাটত। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ডে এক ধরনের মন্থরতা তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মনে চাপা অভিমান কাজ করছে।
তারা বলছেন, শীর্ষ নেতৃত্ব সরকার নিয়ে অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সাংগঠনিক তদারকি কমেছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কার্যালয়গুলোও আগের মতো সরগরম নেই। বড় কোনো দলীয় কর্মসূচি না থাকায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাঝে যেন ছুটির আমেজ বিরাজ করছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংগঠনের একজন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দল সরকারে আসার পর থেকে সেইভাবে সাংগঠনিক ব্যস্ততা নেই। দলেও কেমন যেন গুরুত্ব কমে গেছে। এমনটা চলতে থাকলে তো সবাই পুরোপুরি ঝিমিয়ে পড়বে। নীতিনির্ধারকদের এদিকে নজর দেওয়া উচিত।’
সাংগঠনিক জড়তা কাটাতে নজর দিচ্ছে হাইকমান্ড
এদিকে দলের সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে বিএনপি প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নজর রাখছেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। যেখানে সরকারের সাফল্যে যেমন ভাগীদার হতে হবে, তেমনি দলকেও সমানতালে শক্তিশালী রাখার ভাবনার কথা তিনি বলেছেন। এরই অংশ হিসেবে কয়েক মাসের মধ্যে সারাদেশের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
>> আরও পড়ুন
বিএনপির পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো ভ্যানগার্ড সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রদবদল। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর দলটির হাল ধরা তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। গুঞ্জন রয়েছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অথবা স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মধ্য থেকে কেউ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে পারেন। যদি এমনটি হয়, তবে মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হবে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার দলীয় পদটিও শূন্য হয়েছে। সব মিলিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা স্থায়ী কমিটিতে বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
জানা গেছে, ‘নবীন-প্রবীণ’ ফর্মুলায় একটি স্মার্ট ও আধুনিক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনই এখন হাইকমান্ডের মূল লক্ষ্য।
ঈদের পরেই শুরু হচ্ছে মাঠের কাজ
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠন দুর্বল হলে নেতিবাচক প্রভাব প্রশাসনে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা আছে দলের ভেতরে। তাই ঈদুল ফিতরের পরপরই মাঠে নামতে চায় বিএনপি। সাংগঠনিক বিভাগগুলোর কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে তদারকি করার জন্য আলাদা কমিটি করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
>> আরও পড়ুন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রীয় নানা ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে সংসদীয় কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পর আমাদের অগ্রাধিকার হবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। শিগগির সেদিকে নজর দেওয়া হবে।’
চলতি বছরই কাউন্সিলের চিন্তা
এদিকে দলের কার্যক্রমে গতি আনতে চলতি বছর জাতীয় কাউন্সিল করতে চায় বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একথা বলেছেন।
গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই। এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করেনি। কিন্তু আমার মনে হয় শিগগিরই হবে কাউন্সিল।’
বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিলো ২০১৬ সালে। বিএনপি মহাসচিবের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল- সরকার গঠনের পর সরকার ও দল এক হয়ে গেছে। দলের কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হবে।
জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দলের (বিএনপির) কার্যক্রম তো চলছে, ছোটখাটোভাবে তো চলেছে। এক মাসে সরকার গঠন করতে তো সময় লেগেছে। দলের লোক বেশির ভাগই সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলোতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।’

চ্যালেঞ্জ যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন
জাতীয় নির্বাচনের বৈতরণী পার করা বিএনপির সামনেই রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল রেখে এই নির্বাচনে গেলে প্রতিপক্ষ দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। দীর্ঘ আন্দোলনে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন অথচ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, তাদের এবার সাংগঠনিক নেতৃত্বে এনে পুরস্কৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার যেমন জনগণের আস্থা জয় করবে, তেমনি দলকেও আমরা একটি গতিশীল ও সুসংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করব। খুব শিগগিরই মাঠ পর্যায়ে এর দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাবে।’
সার্বিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকারের এক মাস হয়েছে। তারা ভোটের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাতে হাত দিয়েছে। অতীতে সরকার সংবর্ধনা, ফুলের মালা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কিছু ইতিবাচক কাজ দেখলাম। প্রধানমন্ত্রীর অফিস সময় নির্ধারণ, প্রটোকল কমিয়ে দেওয়া, রাজনীতিবিদদের বাসায় গিয়ে সরকারের পাশে থাকার সহযোগিতা চাওয়া, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছে সরকার। এসব করতে গিয়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছৃটা প্রভাব পড়েছে। যা অস্বীকারের সুযোগ নেই।’
সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও নির্বাচন প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিতে হবে বলে মত এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।
বিইউ/জেবি

