সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

বিএনপির এমপি হতে ‘অচেনা’ মুখের দাপট, কোণঠাসা ত্যাগীরা

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১০ এএম

শেয়ার করুন:

বিএনপির এমপি হতে ‘অচেনা’ মুখের দাপট, কোণঠাসা ত্যাগীরা

# ৯শ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৭শ’ই অচেনা, চেনেন না মহিলা দলের শীর্ষ নেতারাও

# এমপি হওয়ার মিছিলে মন্ত্রী-এমপি, সচিবদের স্ত্রী-স্বজনরা, পরিচয় দিচ্ছেন জুলাইযোদ্ধা 


বিজ্ঞাপন


# লবিংয়ের মূল্যায়িত না হওয়ার শঙ্কায় ত্যাগীরা

# যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থী বের করতে হিমশিম খাচ্ছে হাইকমান্ড

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির মনোনয়নের দৌড়ে এবার তারাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিএনপির ৩৬টি নারী আসনের বিপরীতে প্রায় সাড়ে নয় শ প্রার্থীর ভিড়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দলের মনোনয়ন বোর্ডকে।

অভিযোগ রয়েছে, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সিংহভাগই বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের সময় ছিলেন ‘নিখোঁজ’। অথচ এখন তারা ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদকে পুঁজি করে সংসদ সদস্য হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ফলে একদিকে রাজপথে সক্রিয় ও ত্যাগী নারী নেত্রীরা যথাযথ মূল্যায়নের প্রত্যাশায় রয়েছেন, অন্যদিকে সুপারিশ ও লবিংয়ের চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষাৎকার বোর্ডে অংশ নেওয়া প্রায় ৭ শতাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধেই বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

bnp-4মনোনয়ন বোর্ডের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিস্ময় প্রকাশ করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সাক্ষাৎকারে যাদের দেখলাম, তাদের বড় অংশই দলের শীর্ষ নেতা, সাবেক মন্ত্রী বা এমপিদের নিকটাত্মীয়। অথচ গত ১৭ বছরে দলের দুঃসময়ে তাদের রাজপথে দেখা মেলেনি। বিষয়টি আমাদের জন্য যেমন বিব্রতকর, তেমনি দলের ত্যাগী কর্মীদের জন্য হতাশাজনক।’

এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন উঠেছে-সুসময়ে হঠাৎ করে এমপি হওয়ার দৌড়ে নামা ও লবিং-তদবিরে ব্যস্ত থাকা এসব প্রার্থীর ভিড়ে রাজপথে পরীক্ষিত ও নির্যাতিত নারী নেত্রীদের কতটা মূল্যায়ন করতে পারবে বিএনপি?

অন্যদিকে লবিং-তদবিরের চাপের কারণে ছিটকে যান কিনা সেই শঙ্কায় আছেন রাজপথে সক্রিয় থেকে আন্দোলন করা অনেক এমপি হতে আগ্রহী নেত্রীদের মধ্যে।

অবশ্য বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিপরীতে আন্দোলনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নারীদের অবদান অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি সংসদে কথা বলা ও আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শিক্ষাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সবকিছু বিবেচনা করেই মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, বিএনপি ৩৬ নারী এমপিকে প্রায় চূড়ান্ত করেছে, এখন আনুষ্ঠানিকতাসহ তাদের নাম ঘোষণার বাকি। শিগগিরই প্রত্যেকের নাম ঘোষণা করবে দলটি। 

অষ্টম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বিএনপির অঙ্গসংগঠনে পরিচিত মুখ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আবারও প্রতিনিধিত্ব করতে চান আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় এই নেত্রী। দলের মনোনয়ন পেতে তিনি শনিবার মনোনয়ন বোর্ডের মুখোমুখি হন। সেখানে অনেক প্রার্থীকে চিনতেই পারেননি এই নেত্রী।

জানা গেছে, মনোনয়ন বোর্ডের সামনে অনেকে পরিচয় দিয়েছেন সাবেক সচিব বা আমলার স্ত্রী হিসেবে। আবার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবীও ছিলেন। কমবেশি সবাই নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এভাবে প্রায় ৯০০ নারী এবার সংরক্ষিত আসনে সংসদে যেতে চান। অথচ বিএনপির জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৩৬টি আসন। 

আগ্রহীদের সিংহভাগই প্রভাবশালী নেতা-সমর্থকদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের পরিচয়ে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন, সেই বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করেছে বিএনপি। আগ্রহীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুক্রবার শুরু হয়।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে প্রথম দিন রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগের চার শতাধিক প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। শনিবার বেলা ৩টা থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ বিভাগের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শুরু হয়। দুদিনে প্রায় ৯০০ জনের সাক্ষাৎকার নেয় মনোনয়ন বোর্ড। হিসাব অনুযায়ী একটি আসনের জন্য প্রায় ২৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মনোনয়ন বোর্ড গঠিত হয় এবং এতে স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। 

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ সাংবাদিকদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক, অথচ বেশিরভাগ প্রার্থীকে চিনি না। অনেকে এসে বলেন ‘সুলতানা আপা, আপনার সঙ্গে বিশ বছর পর দেখা হলো’। তারা নিজেদের পরিচয় দেন- কেউ সচিবের স্ত্রী, কেউ কোনো নেতার আত্মীয়।’

সুলতানা আহমেদ বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবাই সংসদে যেতে চাইছেন। তারা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, অথচ মাঠে তাদের দেখা যায়নি। কয়েকজন প্রার্থী মহিলা দলের পরিচয় দিচ্ছেন, অথচ আমাকে চেনেন না।’

bnp-2ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নাম ও পরিচয়ের বাইরে কিছু বলার সুযোগ হয়নি। এত মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া সময়সাপেক্ষ। সবার সিভি বোর্ডের কাছে আছে। আশা করি ত্যাগী ও রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। অনেকেই এখন মৌসুমি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।’ 

তিনি আরো জানান, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন আমরা সবাইকে চিনি। আপনাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত আছি। যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে। আমরা সবাইকে মনোনয়ন দিতে পারব না, মাত্র ৩৬টি আসন। যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তাকে সবাই মেনে নিতে হবে।

সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বলেন, আমরা এক মিনিট করে রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। বাকি তথ্য সিভিতে রয়েছে। আশা করি ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। 

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় নেতা আসমা আজিজ ঢাকা মেইলকে বলেন, সাক্ষাৎকারে শুধু নাম-পরিচয় দিয়েছি। আমার নিজের জেলার তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশীকেও আমি চিনি না। আশা করি দল আমাদের কাজের মূল্যায়ন করবে।

কেন্দ্রীয় নেত্রী নিলুফা ইয়াসমিন নিলু ঢাকা মেইলকে বলেন, নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে কিছু বলার সুযোগ হয়নি। প্রার্থী বেশি, সময় কম। তবে বোর্ডের একাধিক সিনিয়র নেতা আমাকে রাজপথের ফাইটার হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এটাই বড় প্রাপ্তি।

bnp-1এবার সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন দৌড়ে বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা, দিলরুবা খান, রিজিয়া পারভীন, দিঠি আনোয়ার, রিনা খানসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজন তারকাও অংশ নিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ছোটপর্দার অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক। কুষ্টিয়া থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাক্ষাৎকার দেন তিনি।

সাক্ষাৎকার শেষে চমক বলেন, মনোনয়ন বোর্ড তার ব্যক্তিগত নম্বর রেখেছে। তিনি বিএনপি তথা দেশের জন্য কাজ করতে চান।

সাংস্কৃতিক কর্মী ও সমাজসেবী ফারজানা বুবলি বলেন, আমরা এক মিনিট করে নাম ও পরিচয় দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমি জানিয়েছি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলাম এবং জনগণের জন্য কাজ করতে চাই।

নারী আসনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছরের আন্দোলনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নারীদের অবদান অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি সংসদে কথা বলা ও আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও শিক্ষাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সবকিছু বিবেচনা করেই মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, নারী আসনের মনোনয়ন দাখিল শেষ হবে ২১ এপ্রিল। বাছাই অনুষ্ঠিত হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল, নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ হবে ১২ মে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট পাবে ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা পাবে একটি আসন।

বিইউ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর