মাহফুজুর রহমান
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। ইতোমধ্যে সারাদেশে জমে উঠেছে প্রচারণা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটছে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের। ভোটারদের মন জয় করতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। বাদ যায়নি ঢাকা-১৮ আসনও।
ঢাকা মহানগর উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি এবার স্পষ্টভাবে ত্রিমুখী লড়াইয়ের দিকেই এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনি মাঠে না থাকায় এবার তিন দলের প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে বিএনপি, জামায়াত-এনসিপি জোট এবং নাগরিক ঐক্যের প্রার্থীরা প্রতিযোগিতার কেন্দ্র আছেন বলে মনে করছেন ভোটাররা।
মাঠের বাস্তবতায় বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, জামায়াত-জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব, এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না-এই তিনজনই আছেন আলোচনার কেন্দ্রে।
বিএনপির প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন সংগঠনভিত্তিক শক্তিতে এগিয়ে রয়েছেন। উত্তরখান, দক্ষিণখান, তুরাগ, খিলক্ষেত ও উত্তরা এলাকায় দলীয় কাঠামো ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতি তার প্রচারণাকে গতি দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তা, নিয়মিত গণসংযোগ এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফ্রন্টলাইনে রেখেছে।
জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত জোটের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিব নতুন ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন। তরুণ ভোটার ও পরিবর্তনমুখী অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে তিনি মাঠে নেমেছেন। তবে জোটসমর্থনের পাশাপাশি মধ্যপন্থী ভোটারদের আস্থা অর্জন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনি প্রচারণার সময়ে উত্তেজনা ও বাধার অভিযোগও আসছে, যা আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা নির্দেশ করছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা-৯ আসনে ভোটযুদ্ধে ত্রিমুখী সমীকরণ
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এই আসনে পরিচিত ও আলোচিত নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ‘ক্লিন ইমেজ’ তাকে আলাদা করে রেখেছে। দলীয় সংগঠন তুলনামূলক দুর্বল হলেও নগর এলাকার শিক্ষিত ও সচেতন ভোটাররা তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। মূলত তাকে সম্মানজনক ভোটের প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঢাকা–১৮ আসনের এবারের নির্বাচন কেবল তিন প্রার্থীর লড়াই নয়। এটি সংগঠনভিত্তিক রাজনীতি, জোটের শক্তি এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সম্মিলিত পরীক্ষা।
উত্তরা, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও মোল্লারটেক নিয়ে ঢাকা-১৮ আসনটি গঠিত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১, ১৭, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এই আসনের মধ্যে পড়েছে। এই আসনের মোট ভোটার ৬ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার এবং নারী ভোটার প্রায় ৩ লাখ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১০ প্রার্থী।
তারা হলেন- ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, কেটলি প্রতীকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, শাপলা কলি প্রতীকে এনসিপির আরিফুল ইসলাম আদিব, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আনোয়ার হোসেন, লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মো. জাকির হোসেন, রেল ইঞ্জিন প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার, মই প্রতীকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সৈয়দ হারুন-অর রশীদ, আম প্রতীকে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মিসেস সামিনা জাবেদ, মোমবাতি প্রতীকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. জসিম উদ্দিন ও হরিণ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইসমাইল হোসেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রশীদ বলেন, ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচন এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। দীর্ঘদিন রাজত্ব করা আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটাররা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে ভাবার সুযোগ পাচ্ছেন। বিএনপির প্রার্থী সাংগঠনিক দিক থেকে শক্ত হলেও নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলা প্রার্থীরাও আলোচনায় এসেছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা আগের মতো শুধু দল দেখে নয়, প্রার্থীর বক্তব্য কাজের ইচ্ছা ও আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এই আসনে ভোটার উপস্থিতি ভালো হলে ফলাফল চমকপ্রদ হতে পারে।’
মোরশেদুর রহমান নামে এক তরুণ বলেন, “আমার দৃষ্টিতে ঢাকা–১৮ আসনে মূল লড়াই হচ্ছে সংগঠন বনাম ব্যক্তিত্বের। বিএনপি এখানে পুরোনো নেটওয়ার্কের সুবিধা পাচ্ছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ১১ দলীয় জোটের সমর্থনে এনসিপি প্রার্থী যে ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছেন, তা শহুরে ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করছে। এই আসনে শিক্ষিত ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে হিসাব বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।’
রায়হান উদ্দিন বলেন, ঢাকা-১৮ আসনের নির্বাচন প্রমাণ করছে, রাজনীতিতে বিকল্প শক্তির জায়গা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো পরিচিত মুখের উপস্থিতি নির্বাচনে ভারসাম্য এনেছে। তিনি জয়ের দৌড়ে এগিয়ে না থাকলেও তার অংশগ্রহণ ভোটের মান ও আলোচনার পরিসর বাড়িয়েছে। ভোটারদের সামনে এবার কেবল দুই দল নয়, ভিন্ন মত ও ভিন্ন রাজনীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাগর চৌধুরী নামে একজন বলেন, ‘আমার মনে হয় ঢাকা-১৮ আসনে ভোটের ফল নির্ভর করবে শেষ সপ্তাহের প্রচারণার ওপর। বিএনপি যদি তাদের সমর্থকদের পুরোপুরি ভোটকেন্দ্রে আনতে পারে, তাহলে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। অন্যদিকে ১১ দলীয় প্রার্থী যদি নিরপেক্ষ ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তারাও কিছু একটা ঘটাতে পারে। এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
এম/এমআর