নিজস্ব প্রতিবেদক
০২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম
গোপনে অননুমোদিত শুল্কমুক্ত মদ মজুত রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’ এর চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে।
শেখ নূর ইসলামের দেশে-বিদেশে নিয়মবহির্ভূত বিভিন্ন ব্যবসা ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকায় সালমানের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে তিনি ফেসবুক লাইভে আসার পর তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যেই সালমানের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম, তার পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কানাডায় এক দশকের আর্থিক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধানের তথ্য সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য জানায়। ওইদিন (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ অভিযান চলে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউসটির কার্যক্রমে গুরুতর অসংগতি শনাক্ত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি মোট চারটি ওয়্যারহাউসে পণ্য মজুত রেখেছে। অর্থাৎ অনুমোদিত ওয়্যারহাউসের বাইরে আরও দুটি অননুমোদিত ওয়্যারহাউসেও পণ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এই অভিযান পরিচালনা করে। প্রাথমিকভাবে ‘গুরুতর অসংগতি’ পাওয়ায় ‘অধিকতর যাচাইয়ের জন্য’ ওয়্যারহাউজগুলো সিলগালা করা হয়েছে।
এ ছাড়াও, অননুমোদিত ওয়্যারহাউসে বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত শুল্কমুক্ত পণ্য স্থানান্তর বা অপসারণ রোধ এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট চারটি ওয়্যারহাউসই সিলগালা করা হয়েছে। কোম্পানিটির ‘অনুমোদিত’ বা ‘ঘোষিত’ গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু অভিযানে দেখা গেছে, সেখানে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুত করে রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউজ’ থেকে কেবল বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের শুল্কমুক্ত মদ কেনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু টস বন্ডের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠায় তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই অনুসন্ধান চলছিল।
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে নূর ইসলাম পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন হিসাবে ৫০ লাখ কানাডিয়ান ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে ওই সময়ে ১৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন, দুটি সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টার তথ্য, ১১৮টি বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন, ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের প্রতিবেদন এবং দুটি আন্তঃদেশীয় মুদ্রা লেনদেনের তথ্য থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব লেনদেনে কানাডিয়ান ডলারের পাশাপাশি মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, সিঙ্গাপুর ডলার ও থাই বাথ ব্যবহারের তথ্যও রয়েছে।

তবে কর কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কানাডায় নূর ইসলাম পরিবারের লেনদেনের অনুসন্ধানের সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক স্টুডিওতে হামলার ঘটনার কোনো যোগসূত্র নেই। তাদের দাবি, সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের আগেই নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।
এক বছরে ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স
নূর ইসলামের আয়কর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিনি রেমিট্যান্স হিসেবে ৯৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা দেশে আনার তথ্য দেখিয়েছেন। একই সময়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত আয়কর ছিল ৬৯ লাখ টাকা।
এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণে বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
কর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নূর ইসলামের আয়কর নথিতে বিদেশি নাগরিকত্ব, কানাডায় থাকা সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করা হয়েছে কিনা, তা নিয়েও তদন্ত করা হচ্ছে।
দেশে একাধিক ব্যবসা
আয়কর নথি অনুযায়ী, শেখ নূর ইসলাম বাংলাদেশে একাধিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি প্রায় ১৪টি কোম্পানির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডমিনোজ পিজা, ফুওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস, এসআই ট্রাভেলস অ্যান্ড কার্গো সার্ভিসেস, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, টাভার্স সাপ্লায়ার্স, রেডিও মাসালা, পল বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, ডমিনাস অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি, স্পাইস টেলিভিশন, কয়লা পাব, স্টারবার ক্যাফে, ফুওয়াং ডমিনোজ প্রোপার্টিজ, স্পাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও টিম হর্টনস।
কৃষি খাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকার একটি কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সঙ্গেও তার নাম জড়িত। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের নামও রয়েছে।
কানাডাতেও ব্যবসা
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কানাডাতেও নূর ইসলামের ব্যবসা রয়েছে। সেখানে তিনি ‘জুম জুম পিজা’র সঙ্গে যুক্ত এবং ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তার নাম পাওয়া গেছে।
তার স্ত্রী শীলা ইসলাম কানাডায় ডমিনোজ পিজা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মেয়ে দিশা ইসলাম সান লাইফের বিনিয়োগ পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। অন্য মেয়ে তাসনিম ইসলামও কানাডার নাগরিক এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নূর ইসলাম, শীলা ইসলাম, দিশা ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের নামে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে একক ও যৌথ হিসাব থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংক, ব্যাংক অব মন্ট্রিয়েল ও টিডি ব্যাংকের হিসাব রয়েছে। শীলা ইসলামের নামে একটি মর্টগেজ হিসাবের তথ্যও নথিতে এসেছে।
সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নূর ইসলামের কানাডায় থাকা নাগরিকত্ব, ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য বাংলাদেশের কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের দলিলও কর নথিতে সংযুক্ত করা হয়নি বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন।
কর কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের কর আইনে বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে বিদেশে থাকা সম্পদ বা আয় গোপন করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পর ফেসবুক লাইভে এসে সালমান হামলার জন্য বিএনপির লোকজনকে দায়ী করেন। পরে তার ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়ে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বিএফআইইউ।
তবে সালমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে শেখ নূর ইসলাম পরিবারের কানাডার লেনদেনের অনুসন্ধানের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য, নূর ইসলাম ও তার পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল আগেই এবং এটি কর ফাঁকি, বিদেশি সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নিয়মিত গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ।
একেএস/এফএ