রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‎ইসিবি চত্বরে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট: নেপথ্যে সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনী

একে সালমান
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‎ইসিবি চত্বরে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট: নেপথ্যে সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনী
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি: সংগৃহীত
  • সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট
  • নির্মাণশ্রমিকদের পিস্তল দেখিয়ে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
  • শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের হয়ে ফোর স্টার গ্রুপের মামুন ও মাসুম হামলা চালান বলে দাবি

রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার মানিকদি নামাপাড়া এলাকার নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা আশপাশের বিভিন্ন ভবন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে গুলি ও ভাঙচুর চালিয়ে ল্যাপটপ, ক্যামেরা, টেলিভিশন, যন্ত্রপাতি ও নগদ টাকা লুট করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে রডসহ বিভিন্ন মালামাল এবং নির্মাণশ্রমিকদের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় মিরপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, শাহাদাতের হয়ে ফোর স্টার গ্রুপের মামুন ও মাসুম ওরফে ভাইগ্না মাসুম এ হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মানিকদি নামাপাড়ার নিউ গিনি প্রোপার্টিজ এলাকা ঘুরে বিভিন্ন ভবনের জানালার থাই গ্লাস ভাঙা, মূল ফটকসহ বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন দেখা গেছে।

এ ঘটনায় নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

একাধিক স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, মিরপুরের সন্ত্রাসী মামুন ও তার সহযোগী মাসুম ওরফে ভাইগ্না মাসুম এ ঘটনায় জড়িত। তারা ফোর স্টার গ্রুপের হয়ে কাজ করেন বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। কয়েক দিন আগে কিবরিয়া হত্যা মামলায় জামিনে বের হয়ে মাসুম তার সহযোগীদের নিয়ে এ হামলা চালান বলেও সূত্রগুলোর দাবি। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা মাসুমের লোক বলে জানা গেছে।

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিনকে সোহেল পরিচয়ে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই মুঠোফোন নম্বরের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, নম্বরটি মিরপুর ১ নম্বর এলাকার সোহেল ওরফে ড্যান্সার সোহেল ব্যবহার করেন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী লেলিন ও শাহাদাতের হয়ে কাজ করেন এবং ফোর স্টার গ্রুপের সক্রিয় সদস্য বলে সূত্রগুলোর দাবি।

image

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সোহেলের মুঠোফোন নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির পাশে তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। তার পাশে সাদা পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় রয়েছেন ফোর স্টার গ্রুপের আরেক সদস্য কবির ওরফে টাকলা কবির। রাড্ডা হাসপাতাল ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গেও তারা জড়িত বলে সূত্রের দাবি। মানিকদি নিউ গিনি প্রোপার্টিজ এলাকায় গুলি, হামলা ও লুটপাটের সঙ্গেও এই গ্রুপের সদস্যরা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঘটনাস্থলে যা দেখা গেল

সরেজমিনে দেখা যায়, নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মূল ফটকে ৩০ থেকে ৪০টির মতো গুলির চিহ্ন রয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন ভবনের জানালার থাই গ্লাসও ভাঙা।

ভেতরে ঢুকে হাতের বাম পাশে সাইনবোর্ডবিহীন একটি টিনশেড প্লট দেখা যায়। এর সামনের অংশে রয়েছে একটি গোডাউন। গোডাউনের পরেই সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। নিউ গিনি প্রোপার্টিজের নিজস্ব ওই গোডাউনে কয়েক কোটি টাকার মালামাল ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। হামলাকারীরা সেখানে গুলি ও ভাঙচুর চালিয়ে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন: ভাঙচুরের ঘটনায় সালমান মুক্তাদির ন্যায়বিচার পাবেন: রাশেদ খাঁন

পাশের সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। স্টুডিওর প্রতিটি কক্ষে গুলির চিহ্ন রয়েছে। ল্যাপটপ, ক্যামেরা, টেলিভিশন, যন্ত্রপাতি ও প্রায় ৯০ লাখ টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে বলে স্টুডিও-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দরজা-জানালাসহ স্টুডিওর বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে।

image

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের স্বত্বাধিকারী মো. নাজিম উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছিলেন। তার দাবি, গতকালকের হামলায় শাহাদাতের লোকজন জড়িত। হামলায় সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে গুলি করেছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন আহত হয়েছেন।

নাজিম উদ্দিন বলেন, মূলত তার জায়গা দখল করতেই এ হামলা চালানো হয়েছে। এর আগেও কয়েক দফা সন্ত্রাসীদের দিয়ে তার ওপর এবং প্রোপার্টিজের কার্যালয়ে হামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করেও কোনো ফল পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, দুই বছর আগে সালমান মুক্তাদিরকে জায়গাটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তিনি তার ভাড়াটিয়া। শনিবার রাতে কয়েক শ সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গুলি চালিয়ে হামলা করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়।

যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা

মানিকদি নামাপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা গতকাল রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাত সাড়ে ১০টার পর হঠাৎ মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা ছোটাছুটি শুরু করেন।

তাদের ভাষ্য, পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিপুলসংখ্যক লোক এলাকায় ঢুকে বিভিন্ন বাড়ির জানালা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

মো. উজ্জল হোসেন নামে এক চা দোকানি ঢাকা মেইলকে বলেন, রাতে দোকান বন্ধ করে ইসিবি চত্বরে মালামাল আনতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে বাসায় ফেরার পরপরই প্রায় আড়াই থেকে তিন শ লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে। তারা বিভিন্ন বাড়ির জানালা ও দরজায় গুলি করতে থাকে। গুলির শব্দে তারা খাটের নিচে আশ্রয় নেন।

উজ্জল হোসেন বলেন, হামলা শুরুর প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ গুলি ছুড়লে হামলাকারীরাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা গোলাগুলি হয়। গভীর রাতে গোলাগুলি বন্ধ হলেও আতঙ্কে বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হননি।

তিনি আরও বলেন, ইসিবি চত্বরের পাশে মূল সড়কে আট থেকে ১০টি পিকআপ দাঁড় করানো ছিল। হামলাকারীরা নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে রড ও অন্যান্য মালামাল লুট করে সেগুলো পিকআপে তুলে নিয়ে যায়।

image

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আবু হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, তারা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে সেখানে কাজ করেন। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মূল ফটকের পাশে থাকার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। চারটি কক্ষে ১৫ জন শ্রমিক ছিলেন।

আবু হাসান বলেন, হঠাৎ কয়েকজন পিস্তল হাতে এসে তাদের দিকে অস্ত্র তাক করে মারধর করেন। পরে আটটি মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যান। এ সময় কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়। কয়েকজনকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। জীবন বাঁচাতে খাটের নিচে আশ্রয় নিলেও সেখান থেকে বের করে তাদের মারধর করা হয়। পরে গোলাগুলির শব্দ শুনে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সবুজ উদ্দিন বলেন, কয়েকজন লম্বা-চওড়া ব্যক্তি অস্ত্র তাক করে তাদের আটকে রাখেন। সবার মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। তারা মুঠোফোনগুলো দিয়ে দিতে বলেন। মোবাইল ফোন থাকলে ভিডিও করা হবে—এই কথা বলে সেগুলো নিয়ে যান।

সবুজ উদ্দিন বলেন, মোবাইল নেওয়ার পরপরই নিউ গিনির প্রবেশপথে কয়েকটি গুলি করা হয়। এরপর কয়েক শ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। তারা জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে ছাদে উঠে যান। সেখান থেকে নিচে তাকিয়ে তিন থেকে চার শ লোককে অস্ত্র নিয়ে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করতে দেখেন বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, পুরো এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনা ছিল। বিভিন্ন গলিতে অস্ত্র হাতে লোকজন দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ এলাকায় ঢুকতে বা বের হতে পারছিলেন না।

স্টুডিও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ব্রাউন ফিশের ব্যবস্থাপক ইফাজ আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে স্টুডিওটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শনিবার রাত ১০টার দিকে দুই কর্মীকে স্টুডিওতে রেখে তিনি বাসায় চলে যান। ওই দুই কর্মী স্টুডিওতেই থাকেন।

image

ইফাজ আহমেদ বলেন, সকালে তিনি জানতে পারেন, রাতে হামলাকারীরা স্টুডিওর ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে কর্মীদের মুঠোফোন নিয়ে যায়। এরপর স্টুডিওতে ভাঙচুর চালিয়ে আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে। সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলার পাশাপাশি ক্যামেরার ডিভিআরও নিয়ে যায়। মুঠোফোন নিয়ে যাওয়ায় কর্মীরা তাকে বিষয়টি জানাতে পারেননি।

নিউ গিনি প্রোপার্টিজের ব্যবস্থাপক মাহফুজ ঢাকা মেইলকে বলেন, হামলাকারীরা আবাসন কোম্পানির দুটি ফটক দিয়ে প্রবেশ করে। তাদের সংখ্যা প্রায় দুই থেকে আড়াই শ ছিল। সবার হাতেই অস্ত্র ছিল। তারা বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

মাহফুজ আরও বলেন, ৪ নম্বর ফটকের পাশে এক চিকিৎসক দম্পতির বাসায় ঢুকে হামলার পর লুটপাট করা হয়। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তদন্ত করছে পুলিশ

ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গিয়াস উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় গতকাল তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলি, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সাইফুল ইসলাম ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। মামলায় আরও দেড় থেকে দুই শ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

ওসি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হবে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।

একেএস/এআর 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর