মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, সমুদ্র সৈকত, নদ-নদী, পাহাড়, বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ। আয়তনে তুলনামূলক ছোট হলেও দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পর্যটন আকর্ষণের বৈচিত্র্য বেশ সমৃদ্ধ। কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত ও সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদ, সিলেটের চা-বাগান, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ ও কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত-প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো অসংখ্য স্থান রয়েছে। একই সঙ্গে মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাও দেশের পর্যটনভাণ্ডারকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে এসব গন্তব্যে। তবে বিপুল সম্ভাবনারও পরও বাংলাদেশ কেন তা কাজে লাগাতে পারছে না সেটা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
বাংলাদেশে পর্যটনের বিকাশের পথে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ব্যয় ও নিরাপত্তার ঘাটতিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে পর্যটনসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর অনেক স্থানে যাতায়াতের সড়ক, পরিবহন ও অন্যান্য অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। এসব সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। উন্নত সড়ক ও গণপরিবহনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত আবাসন, নিরাপদ বিনোদনব্যবস্থা এবং আধুনিক পর্যটনসেবা সব পর্যটনকেন্দ্রে সমানভাবে গড়ে ওঠেনি।

দেশীয় পর্যটকদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে গেলেই শুরু হয় নানা ধরনের ভোগান্তি। যাতায়াতের দুর্বল ব্যবস্থা, দীর্ঘ সময়ের পথ, অতিরিক্ত ভাড়া এবং পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকায় অনেক সময় ভ্রমণ উপভোগের বদলে বিড়ম্বনাই বেশি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বান্দরবান, লামা, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের মতো জনপ্রিয় গন্তব্যে ভ্রমণে গিয়ে পর্যটকদের আবাসন, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াতে তুলনামূলক বেশি খরচ করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে এখনো মানসম্মত হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিশ্রামাগার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পর্যটনসুবিধা পর্যাপ্ত নয়। কোথাও আবাসনের সংকট, কোথাও খাবারের সীমিত ব্যবস্থা, আবার কোথাও স্পটগুলোতে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। অনেক পর্যটন এলাকায় উন্নত সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় পর্যটকদের সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি বেড়ে যায় ভ্রমণের খরচও। ফলে পর্যটনের আকর্ষণ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবার অভাবে অনেকেই এসব গন্তব্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে আগ্রহী হন না।
প্রায় আট বছর ধরে দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে দেশীয় পর্যটকদের নিয়ে কাজ করছেন ট্যুর গাইড জাকির হোসেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থারও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, অনেক পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের উপস্থিতি প্রয়োজনের তুলনায় কম। পাশাপাশি দুর্গম এলাকাগুলোতে জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারকারী দল ও দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে কোনো পর্যটক দুর্ঘটনা বা বিপদের মুখে পড়লে তাকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া কিংবা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এ সমস্যা আরও প্রকট। নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার স্বস্তি নিয়ে এসব এলাকায় ভ্রমণে যেতে চান না।
আরও পড়ুন
‘হালাল ট্যুরিজমে’ কতটা সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ?
৭ বছরেও শেষ হয়নি পর্যটন বিকাশের মাস্টার প্ল্যান
দেশীয় পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতার অভাব একটি বড় সমস্যা। প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বল। এ কারণে অনেক প্রাকৃতিক স্থান পরিবেশগত ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপও কিছু এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এসব ছাড়াও দেশের পর্যটন খাতের ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। যা পর্যটন সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করেন। দেশের ট্যুর অপারেটরা জানিয়েছেন, বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভাষাজ্ঞান, আতিথেয়তা, নিরাপত্তা ও পেশাগত দক্ষতা প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রের তথ্য, নির্দেশনা ও ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থাও আরও উন্নত করা দরকার।

তাদের মতে, আরেকটি বড় সমস্যা পর্যটনস্থানের যথাযথ প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের অনেক আকর্ষণীয় স্থান থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে সেই তথ্য পৌঁছায় না। ফলে দেশের পর্যটন সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারে প্রায় দুই যুগ ধরে গাইড হিসেবে কাজ করেন ইসমাইল। তিনি সম্প্রতি জানিয়েছেন, গাইড পেশা হিসেবেই তার জীবিকা নির্বাহ হয়। সেই অভিজ্ঞতায় তিনি মনে করেন, কক্সাবাজারের রাস্তাঘাট উন্নতকরণ, হোটেল মোটেলগুলোতে বিদেশিদের বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের খরচ সহনীয় পর্যায়ে আনা হলে সেখানে পর্যটক আরও বাড়ানো সম্ভব।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এর সাবেক প্রেসিডেন্ট শিবলুল আযম কোরেশী বলেন, বাংলাদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এজন্য শুধু দরকার সমন্বিত উদ্যোগ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা।
তার মতে, পর্যটনের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও বিনোদন সুবিধা উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।
আরও পড়ুন
১৪৯৮ স্পট নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা, লক্ষ্য বিশ্বমানের পর্যটন
পর্যটনের অপার সম্ভাবনা, তবু বিদেশি পর্যটকে ভাটা
ট্যুর অপারেটররা বলছেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জীববৈচিত্র্য ও অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। সিলেটের পাহাড়, ঝরনা ও চা-বাগান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি অ্যাডভেঞ্চার ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং ঢাকার পুরান শহরের বিভিন্ন স্থাপনা দেশটির সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। এসব স্থানের যথাযথ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার করা গেলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।

এ ছাড়াও নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদী, হাওর, বিল ও গ্রামীণ জীবনকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ও নদীভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলা যেতে পারে। খাবার, লোকসংগীত, কারুশিল্প, উৎসব ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করলে পর্যটকদের জন্য আরও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা তৈরি হবে। পর্যটন খাতের সম্প্রসারণের ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
ট্যুরিজম ডেভলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিডাব) সদস্য সুমন আহমেদ বলেন, দক্ষ পর্যটনকর্মী তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, ডিজিটাল মাধ্যমে পর্যটন প্রচারণা জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরা জরুরি। স্থানীয় জনগণকে পর্যটন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করলে তাদের আয় বাড়ার পাশাপাশি পর্যটনসম্পদ সংরক্ষণেও আগ্রহ সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ঢাকা মেইলকে বলেন, পর্যটনের বিকাশে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। তবে সেগুলো সামনে রেখেই কাজ করা হচ্ছে। আমাদের
পর্যটন স্পটগুলোকে আকর্ষণীয় ও যাতায়াত ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগুলোকে উন্নত করতে পারলে পর্যটক আকর্ষণ বাড়বে। একটি স্পটকে আকর্ষণীয় করার জন্য যেসব অবকাঠামো দরকার সরকার তা করছে।
তাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, এছাড়াও একজন পর্যটক যেন কোনো স্পটে গিয়ে ভালো বোধ করেন সেই জন্য আমরা সেই অঞ্চলের একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার কাজ করছি। তারা শুধু অংশেই নেবে না সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোও করবে। সেখানেও তাদের পার্টিসিপেশন থাকবে। আর যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সেটি হলো ডেস্টিনেশনগুলোকে চিহ্নিত করা। সেটি আমরা করেছি। যেগুলো ইতোমধ্যেই দেশে গুরুত্ব পেয়েছে ডেস্টিনেশন হিসেবে। সরকার ট্যুরিস্ট এলাকাগুলোতে পর্যটকদের সহায়তায় দক্ষ গাইড তৈরিতেও কাজ করছে। এই তালিকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ রয়েছে। আমাদের পর্যটনের সাথে যারা সম্পৃক্ত আছে সব মিলিয়ে একটি কম্বাইনড একটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আমরা চালু করতে চাই। প্রতিটি স্পটকে ডিজিটালাইজেশনের সুবিধাগুলো বাড়ানো এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যে সুবিধা পাওয়া দরকার সেটাকে এচিভ করা। সেই প্রাথমিক চিন্তাটাই আমরা করছি। বিশেষ করে চ্যালেঞ্জগুলো কমিয়ে নিয়ে আসা বা ফেস করার।
এমআইকে/জেবি