দেশের পর্যটন খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বমানের শিল্পে রূপ দিতে বড় পরিসরে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের এক হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের অবদান জাতীয় অর্থনীতিতে বাড়াতে জিডিপিতে এ খাতের বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেওয়া পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও পর্যটন খাতের মহাপরিকল্পনা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও জিডিপিতে অবদান বাড়ানোর লক্ষ্যের কথা জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, সরকার পর্যটন খাতকে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রত্যেক জেলার পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পর্যটন শুধু অবকাশযাপনের সুযোগ নয়; কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও বিশ্বমানের শিল্পে উন্নীত করা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার।

তিনি জানান, জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালার আধুনিকায়ন এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ৩০টিরও বেশি জেলায় পর্যটন ক্লাস্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি, ইকো, গ্রামীণ, কুলিনারি, নদী ও উপকূলীয় পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আধুনিক হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও পর্যটন আকর্ষণ গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের পর্যটন ব্যবসা এবং নতুন পর্যটন উদ্যোগের জন্য নীতিগত সহায়তা ও ঋণসুবিধা বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
কক্সবাজার, সিলেট ও খুলনাসহ গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও পর্যটনসুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। কক্সবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগের কথা সরকার আগেই জানিয়েছে।
অন্যদিকে, পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান ও সম্ভাবনা নিরূপণে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি দূর করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আওতায় ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এবং জিডিপিতে এ খাতের প্রকৃত অবদান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যাবে।
সচিব জানান, পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদের কাজ চলছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার প্রত্যাশা রয়েছে। এর ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এক হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্পট চিহ্নিত করে সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে উন্নয়নের আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
পর্যটন: সেকাল, একাল এবং ভবিষৎকাল
পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি খাতটিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই মধ্যে এক হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্পটের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ রূপান্তরে গুরুত্ব পাচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্যও ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। সরকারের পরিকল্পনায় অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যসেবার মাধ্যমে পর্যটনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও আধুনিক করার কথা বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বড় তথ্যভান্ডার ও স্মার্ট প্রযুক্তি পর্যটনসেবা আরও সহজ, নিরাপদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে উপকূলীয় ও প্রাকৃতিক পর্যটনে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
সরকারের পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্প্রসারণে ২০৩৪ সালের মধ্যে বিস্তৃত জাতীয় বিমান যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিমান চলাচল কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যও রয়েছে। উন্নত যোগাযোগ, আবাসন, বিনোদন ও পর্যটনসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। র্যালি, সাইকেল র্যালি, সিটি ট্যুর, পর্যটন অংশীজন ও কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রদর্শনী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পর্যটনবিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন রয়েছে। ৩ অক্টোবর মূল অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ১৩টি ক্যাটাগরিতে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’ দেওয়ারও কথা রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য—দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করা। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জেবি




